স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির অন্তরায় দূর করতে হবে

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ

মতামত

সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়ে উঠলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত হতে বাধ্য। আমাদের দেশে কার্যত এখনও

2023-07-07T16:36:03+00:00
2023-07-07T16:36:03+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির অন্তরায় দূর করতে হবে
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ জুলাই, ২০২৩, ৪:৩৬ পিএম   (ভিজিট : ১৫৩)
X

সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়ে উঠলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত হতে বাধ্য। আমাদের দেশে কার্যত এখনও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী করা যায়নি। এ সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হয়তো হবে না। কিন্তু দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের সবাইকে দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ রেখেই রাজনীতি করতে হবে

রাজনীতির মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছে। রাজনীতিতে একই সঙ্গে চলছে জটিল মেরুকরণও। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরেকটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছে। তাদের উদ্দেশ্য ও চাওয়া কী, তা সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। অন্যদিকে বিএনপি এবং তাদের সমমনা দলগুলো এ মাসেই জোরদার আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। সব দিক বিবেচনায় বিদ্যমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক সংকট তো বটেই। কিন্তু সংকট নিরসনে মনোযোগী না হলে তা ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সংবাদমাধ্যমে এও বলা হয়েছে, অনেক দলই এজেন্ডাভিত্তিক সংলাপ চায়। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির অন্তরায় দূর করা যায়। মনে রাখতে হবে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে এর নিরসন জরুরি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের সমমনা দলগুলো বারবার নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। বিদ্যমান বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে সমাধানের সুষ্ঠু পথ বের করতে হবে ক্ষমতাসীনদের। তবে বিরোধীপক্ষেরও দায় কম নয়। সংকট সমাধানের সুফলভোগী হবে দেশের মানুষ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিদেশিদের ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রায়ই বিদেশিরা বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। তারা যে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর গভীর করেছে তা বোঝা কঠিন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় কি তারা এ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে? ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। প্রচলিত আইন অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ তিন মাস হলেও ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বরতরা নিয়মের বরখেলাপ করে তা দুই বছর বাড়িয়ে ফেলেন। পরে ২০০৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমরা দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচন প্রশ্নমুক্তই হয়েছে। আমার ধারণা, এ বিষয়টি আমলে রেখেই বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। এও হতে পারে, নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েই তারা এমন দাবি জানিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘জনগণের ভোট নিয়েই আমরা ক্ষমতায় আসতে চাই।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর পরও রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই জটিল রূপ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে তা আগেই বলেছি। কিন্তু আমি মনে করি, বিদ্যমান সংকট সমাধানে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব সর্বাধিক। মূলত এ জটিল পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন বিদেশিরা। হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে, ২০০৬ সালে যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারাও নানা তৎপরতার মাধ্যমে বিদেশিদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তবে এবার তারা যেহেতু বেশি তৎপর তাই রাজনৈতিক সংকট নিরসনে মনোযোগ গভীর করতে হবে সামগ্রিক প্রয়োজনেই।

জনমনে আরেকটি বিষয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কেনÑ এ প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতিতে তাদের পুনরাগমন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ অনুমানের ভিত্তিতে বলছেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে আগের মতোই জোটবদ্ধ হয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ছক কষছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকেই বেশি কৌশলী বলতে হবে। তবে অনেকের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। আমাদের রাজনীতিতে এমনটি বুমেরাং হয়েও উঠতে পারে। কোনো দলকে নির্বাচনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে দেয় নির্বাচন কমিশন। যখন কোনো দলকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয় তখন ওই দলের সক্রিয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর বড় রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগতভাবেই এ দলকে জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করবে। স্মরণে আছে, ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ আন্দোলন করেছে। পরে তারা জোট সরকারের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট হয়েছিল। জাতীয় পার্টি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো দলকে বড় রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় জোটবদ্ধ করার ইচ্ছা রাখবে এমনটাই স্বাভাবিক। একটি বড় জোট করা গেলে তা শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক দলেরই লাভ। জামায়াতে ইসলামী হোক, জাতীয় পার্টি হোক কিংবা অন্য যেকোনো দলই হোকÑ নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিলে তাদের সক্রিয় হতে বাধা নেই। আর অন্য দলগুলোও চাইবে যেকোনোভাবে এই সক্রিয় দলকে জোটবদ্ধ করতে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। এর পাশাপাশি এও সত্য, জামায়াতের ব্যাপারে অধিক সতর্কতার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ারও অবকাশ নেই।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কা ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে। অনেকেরই প্রশ্ন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। বিএনপি বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এর ঘোর বিরোধিতা করছে। পরিস্থিতি যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তাতে অনেকেই আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে সংলাপের প্রসঙ্গটি সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এজেন্ডাভিত্তিক সংলাপ ছাড়া তারা আলোচনার টেবিলে বসবেন না। এ দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। শান্তিপ্রিয়রা চান না রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়ুক। দেশের মানুষের এ চাওয়াকে শ্রদ্ধা জানাতেই রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে শান্তির পথ খুঁজতে। সংকটের বৃত্ত থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় সে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিশেষত বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে নজর গভীর করতে হবে। সংবিধান অনুসারে বিদ্যমান সংকটের সুরাহা করা সম্ভব। সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। জাতীয় সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন রয়েছে। তাই দলীয় সরকারের অধীনেও যদি নির্বাচন হয়, তাহলে সরকারকে অনেকাংশে নিরপেক্ষ অবস্থানে যেতে হয়। সরকার যদি রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নেয় তাহলে সমাধান দুরূহ নয় বলেই মনে করি। রাজনৈতিক দলের ভাবনায় থাকবে দেশের মানুষ ও জাতীয় স্বার্থ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সহিংসতা ছড়ালে দেশ ও মানুষের ক্ষতি হবে। এ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব অস্বস্তিকর। জনজীবনে দুর্ভোগ, শঙ্কা ও ত্রাস কীভাবে পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এও আমাদের অজানা নয়। বিগত এক দশকে আমাদের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। রাজনৈতিক সংকটের কারণে উন্নয়নের পথ বাধাপ্রাপ্ত হতে দেওয়া যাবে না। সরকার সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিলে ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনাই দেখি।

বিশ্বের অনেক দেশেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। অথচ আমাদের দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে নির্বাচন কমিশন ও সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অতীতেও প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এই স্তম্ভেই লিখেছি, দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান না থাকায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শুধু উন্নত বিশ্বই নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। অধিকাংশ রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনরাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা যেসব দেশ পর্যবেক্ষণ করি সেসব দেশে দেখা যায় সরকার ও বিরোধী দল যূথবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। যেহেতু সেসব রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, সেহেতু তাদের রাজনৈতিক পরিবেশও কলুষতামুক্ত। ভারতে টিএন সেশনকে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। টিএন সেশন দেশটির প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। এইচডি দেবগৌড়ার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পাওয়ার তিন মাসের মধ্যেই তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করেন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক তার দায়িত্ব পালনে কোনোই প্রভাব বিস্তার করেনি। সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়ে উঠলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত হতে বাধ্য। আমাদের দেশে কার্যত এখনও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী করা যায়নি। এ সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হয়তো হবে না। কিন্তু দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের সবাইকে দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ রেখেই রাজনীতি করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাবু/জেএম





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy