পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

প্রদীপ সাহা

মতামত

উন্নত বিশ্বের পথ ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি কোনো বাছ-বিচার না করে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে থাকে, তাহলে উন্নত দেশগুলোকে

2023-07-07T16:44:51+00:00
2023-07-07T16:44:51+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
প্রদীপ সাহা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ জুলাই, ২০২৩, ৪:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ১২৯)
X

উন্নত বিশ্বের পথ ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি কোনো বাছ-বিচার না করে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে থাকে, তাহলে উন্নত দেশগুলোকে দোষ দেওয়ার কী আছে? এক্ষেত্রে তো আমরাই বেশি দোষী। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন হ্রাস নিয়ে এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক কিছু দেখা না গেলেও এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পরিবেশ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আর তাতে হয়তো কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে পরিবেশ কমবে সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলার পরিমাণ

সুমেরু বা উত্তর মেরু আর্কটিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত। এটি প্রায় সবসময় পানির ওপর বরফে আবৃত থাকে। এর বরফ প্রায় দুই থেকে তিন মিটার অর্থাৎ ৬ থেকে ১০ ফুট পুরু। উত্তর মেরুতে সমুদ্রের গভীরতা ৪ হাজার মিটারের বেশি। উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু থেকে অনেক বেশি উষ্ণ। কারণ এটি একটি নিম্ন উচ্চতায় (সমুদ্র সমতল) এবং মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত, যা অ্যান্টার্কটিকার বরফ আচ্ছাদিত মহাদেশের চেয়ে উষ্ণ। গ্রীষ্মকাল এখানে বছরের উষ্ণতম সময়। এখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ঠিক নিচে থাকে ‘শূন্য’ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আর্কটিকের চারপাশে সামুদ্রিক বরফ সাধারণত প্রতি মার্চ মাসে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার জুড়ে থাকে। গ্রীষ্মের শেষে এটি প্রায় ৭ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার সঙ্কুচিত হয়।

পৃথিবীর দুর্গম অঞ্চলগুলোর মধ্যে পরিগণিত হতো একসময় উত্তর মেরু। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কল্যাণে কিংবা অকল্যাণে এখন সেখানে বরফ গলে জাহাজ চলছে। ফলে নানা ধরনের বাণিজ্যিক বিচারে ফলপ্রসূ গতিবিধির পথ খুলে গেছে। জানা গেছে, প্রকৃতির খনিজ তেলের ভাণ্ডারের ১৩ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই উত্তর মেরু অঞ্চলে মজুদ আছে। যদিও এর পুরুটাই রয়েছে বরফের আস্তরণের তলভাগে। আর তাই তেল কো¤পানিগুলির নজর পড়েছে উত্তর মেরুর দিকে। অন্যদিকে, গ্রিনপিসের মতো পরিবেশ সংগঠনগুলো তেলের ড্রিলিং-এর ফলে উত্তর মেরু অঞ্চলের নাজুক পরিবেশের ওপর কী ধরনের কুপ্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ছে।  

আইসব্রেকার নামক অত্যন্ত বড় ও শক্তিশালী জাহাজগুলো প্রায়ই উত্তর মেরুর চারপাশে সমুদ্রে চলাচল করতে ব্যবহৃত হয়। আইসব্রেকাররা সমুদ্রের বরফের মধ্য দিয়ে কার্গো এবং সামরিক জাহাজের জন্য পথ তৈরি করে। আইসব্রেকারদের খুব শক্তিশালী ই¯পাত ধনুক থাকে, যা প্রায় ১০-২০ নট (ঘণ্টায় ১৯-৩৭ কিলোমিটার) হারে বরফ ভেদ করতে পারে। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত উত্তর মেরু অতিক্রমকারী সব আইসব্রেকারগুলো পারমাণবিক শক্তি দ্বারা চালিত ছিল। আর্কটিক সঙ্কুচিত হওয়া এবং সমুদ্রের বরফ হ্রাসের ফলে ডিজেল চালিত আইসব্রেকারগুলোকে উত্তর মেরুতে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আর্কটিক সংকোচনের কারণে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে উত্তর মেরু বরফমুক্ত হতে পারে।

পরিবেশ সংরক্ষণবাদীদের দুশ্চিন্তা, এ ধরনের একটি ¯পর্শকাতর এলাকায় তেল নিষ্কাশন কিংবা পরিবহনের সময় যদি তথাকথিত অয়েল স্পিল বা তেল বেরিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে ত্রাণ কিংবা উদ্ধারকারীদের সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হবে। তা উষ্ণায়নের ফলে বরফ যতই গলুক না কেন! সমস্যা হলো, পরিবেশটা বেশ কঠিন। বছরের অর্ধেক সময়ই এখানে অন্ধকার থাকে এবং তাপমাত্রা থাকে অতিনিম্ন। কাজেই এখানে ড্রিলিং খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ওয়েল স্পিল বা সেই ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যেসব জীবাণু সেই তেলের বিকিরণে সাহায্য করে, তারাও সেই ঠান্ডায় ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। কাজেই উত্তর মেরুতে তেল দুর্ঘটনার ফলশ্রুতি ভূমধ্যসাগর কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর ও ভয়াবহ হবে। এ প্রসঙ্গে অ্যালাস্কায় এক্সন ভালডেজ দুর্ঘটনা কিংবা মেক্সিকো উপসাগরে ডিপ ওয়াটার হরাইজন দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। গ্রিনপিসের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, দুর্ঘটনার দু’বছর পর আজও প্রতি সপ্তাহে মেক্সিকো উপসাগরে একটি করে মরা শুশুক ভেসে উঠছে।  

নাসার এক তথ্য থেকে জানা যায়, উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে গলতে এখন সর্বনিম্নে এসে ঠেকেছে। আর নাসার কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়ার পর পৃথিবীর ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। তারপরও পরিবেশবাদীরা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। বিগত ২০০৭ সালে উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সবচেয়ে ছোট আকার ধারণ করেছিলো। বর্তমানে সেটাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসার প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উত্তর মেরুর সমুদ্রে জমে থাকা বরফের আকার গত কয়েক বছরের মধ্যে এখন সবচেয়ে ছোট। এর অর্থ বরফ আরও গলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিশ্ব উষ্ণায়নের জোরালো লক্ষণ। নাসার আইস ডাটা সেন্টার থেকে বলা হয়েছে, উত্তর মেরুর বরফের সমুদ্রের আয়তন ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার (২০১২ সালের হিসাবে)। ২০০৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার বরফ গলে পানি হয়ে গেছে। আয়তনটা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। ভাবা যায় ব্যাপারটা! এত দ্রুত উত্তর মেরুর বরফ গলে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা হতবাক হয়ে গেছেন। জলবায়ু বিজ্ঞানের পরিভাষায়, সমুদ্রের বরফ এলাকার কভারেজ এক মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটারের কম হলে বরফ চলে গেছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বাকি আছে বিবেচনা করে, এটি বর্তমান আকারের প্রায় এক চতুর্থাংশে সঙ্কুচিত হতে হবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির আর্থ সিস্টেম সায়েন্স সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ই. ম্যান এ ব্যাপারে বলেন, ‘মনে হচ্ছে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে। কারণ এখন যা দেখা যাচ্ছে, হিসাব অনুযায়ী সেটি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ঘটার কথা ছিল না।’ উল্লেখ্য, প্রতি বছর উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফের আয়তন গড়ে এক লাখ ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার করে কমছে। আয়তনে এটি প্রায় বাংলাদেশের সমান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য এখনই জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে বিশ্ব উষ্ণায়নের এ ভয়াবহ চালচিত্র সত্ত্বেও কার্বন নির্গমন হ্রাসে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর চীন, ভারতসহ দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলো এই কার্বন নির্গমন বাড়িয়েই যাচ্ছে। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নের দায়ভার এখন তৃতীয় বিশ্বের ওপরও পড়ে।  

উন্নত বিশ্বের পথ ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি কোনো বাছ-বিচার না করে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে থাকে, তাহলে উন্নত দেশগুলোকে দোষ দেওয়ার কী আছে? এক্ষেত্রে তো আমরাই বেশি দোষী। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন হ্রাস নিয়ে এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক কিছু দেখা না গেলেও এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পরিবেশ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আর তাতে হয়তো কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে পরিবেশ, কমবে সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলার পরিমাণ। দিন দিন আমরা ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। তাই আসুন, বিশ্বের পরিবেশ আন্দোলন জোরদারের পাশাপাশি বিপন্ন এ পরিবেশকে বাঁচাতে আমরা নিজেরাই সচেতন হই এবং এগিয়ে আসি জোরালোভাবে।  
 
লেখক : কবি ও কলামিস্ট

বাবু/জেএম





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy