
X
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ, আমাদের অহংকার। ’৭১ আমাদের চেতনার অগ্নিশিখা। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাতিঘর আর ৭ মার্চ হলো মূলমন্ত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো বাঙালির বুকের ভেতর সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল আগুন জাগানো এক বিপ্লবী স্লোগানÑ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে লাখো বাঙালি সেদিন হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শত্রুর মোকাবিলায়। তাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশÑ বাংলাদেশ, নদীমাতৃক বাংলাদেশ। সেই রক্তধারা আজও বহমান পদ্মা-মেঘনা-যমুনায়। একদিনে স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। ৩০ লাখ প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর কত কত নাম জানা, না-জানা বাঙালির কত কত ত্যাগ-তিতিক্ষা শোক ও কষ্টের পরে এই নব সূর্যোদয়Ñ আমাদের এই লাল-সবুজের পতাকা। এই অহংকার, এই গৌরব ও অমূল্য সম্পদ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হবে।
মুক্তিযুদ্ধে নদীগুলোর অবদান রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি নদীগুলোও শামিল হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে, আশ্রয়ে, যোগাযোগে এবং গেরিলা যুদ্ধে নদীও পাশে থেকে সাহায্য করেছে। নদী ছিল বলেই শত্রুপক্ষকে পরাজিত করা সহজ হয়েছে। নদীকে অবহেলা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘নদীর নাব্য কমে গেছে, এর প্রবাহ ধরে রাখতে হবে।’ নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন। সেই সাতটি ড্রেজার থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজার বহরে আটটি ড্রেজার হয়নি। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর নদীর দখল ও দূষণ নিয়ে ভাবা হয়নি। ২০০৪ সালে লঞ্চডুবির ঘটনা দুর্ঘটনা নয়; এটা অবহেলা। আবহাওয়া বার্তা দেওয়া হয়নি। তৎকালীন সরকার নৌ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অবহেলা করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়; আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই, গ্রেনেড হামলা, অস্ত্রোপচারের গল্প শুনিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ক্ষমতায় থেকে বাংলার মানুষের প্রতি অবহেলা করেছে। বাংলার মানুষের ওপর রোলার চালিয়ে অর্থোপার্জনের চেষ্টা করেছে।
মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আমরা গর্ব ও অহংকার করে বলতে পারি, বাংলাদেশ এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একসময় একটি রাস্তা, ছোট সেতু বা কালভার্ট নির্মাণের জন্য বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন পড়ত। সেই বাংলাদেশ আজ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা করছে। একদা যে পদ্মা সেতু নিয়ে খালেদা-ইউনূস ষড়যন্ত্র করেছিল, সেই পদ্মা সেতু আজ মানুষের চোখে দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল মর্যাদাবান এক দেশের নাম। বাংলাদেশকে সমুন্নত অবস্থানে নিয়ে যেতে যার অবদান অপরিসীম, তিনি মাননীয় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা।
দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। নিজস্ব অর্থায়নে সরকার গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করছে। দেশের জনগণ আজ গর্বভরে বলেন, আমাদের টাকায় পদ্মা সেতু হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক ক্লাবে যুক্ত হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে প্রথম বারের মতো যোগ হতে চলেছে বঙ্গবন্ধু টানেল। আগে মহাসড়ক ছিল না; এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেস-ওয়ে, মেট্রোরেলসহ ব্যাপক আধুনিকায়নের মাধ্যমে নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা পালটে দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত একটানা রেললাইন স্থাপন হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সুদক্ষ ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের ফলে আমরা পেতে যাচ্ছি একটি যুগোপযোগী উন্নত বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড শুধু দেশে নয়; সমগ্র বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি এখন বিশ্বের ‘রোল মডেল’। তার নেতৃত্বেই বংলাদেশ ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে পদার্পণ করবেÑ এই আশা আমাদের সবার।
দেশের নৌ ও সমুদ্র সীমানায় আছে উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা। সেসব সম্ভাবনাকে সুদক্ষ হাতে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। পদ্মা সেতু ও পায়রা বন্দরের কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী বিস্তৃত হবে, দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এর সুফল পাবে। সুনীল সমুদ্রসম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হতে সমুদ্রসম্পদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশকে যা দিয়েছিলেন, তারপর আমরা আর কিছু পাইনি। বাংলাদেশ কেবল উলটো পথে চলেছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে ১৯টি জাহাজ নিয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১০ সাল পর্যন্ত জাহাজ ছিল দুইটি। অথচ জাহাজ হওয়ার কথা ছিল কয়েক শত। উলটো পথে চলছে বলেই ১৯টি থেকে মাত্র দুইটি হয়ে গেছে। দেশরত্নের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর ছিল না, আজকে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হচ্ছে। পায়রা বন্দর আজকে দৃশ্যমান। মোংলা বন্দরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাহাজ আসছে। এভাবে সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে।
আমরা মুজিববর্ষে আছি এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলার মানুষকে সাহসী করে তুলেছেন। বিশ্বে বাংলাদেশকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। শুধু সমুদ্রসীমা নয়, আমরা সমগ্র পৃথিবীকে হাতের কাছে আনার চেষ্টা করছি। সে পথযাত্রা আরো দীর্ঘ হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেরিটাইম সেক্টরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৌপরিবহন খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, মৎস্য সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম বিবেচনায় নিয়ে নদী রক্ষায় সার্বিক ও সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সার্বিক নির্দেশনায় নৌ-সেক্টর দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বিভিন্ন নদীবন্দরের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন করা হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির চাহিদা মেটাতে একবিংশ শতাব্দীর যুগোপযোগী, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পটুয়াখালীতে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা বন্দর নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী ২০২৩ সালে পায়রা বন্দরকে বিশ্বমানের একটি আধুনিক বন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
নৌপথ খননে ৩৪টি ড্রেজার সংগ্রহ ও সুষ্ঠু ফেরি পারাপারের লক্ষ্যে ১৭টি ফেরি নির্মাণ করা হয়েছে। নৌপথ খননে আরো বেশি ড্রেজার সংগ্রহ এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের কার্যক্রম, নদীর তীর দখলমুক্ত করা এবং নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং দখল ও দূষণরোধে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’ গঠন করা হয়েছে। পানগাঁওয়ে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের গতিশীলতা আনয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং চট্টগ্রাম বন্দরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মেরিটাইম সেক্টরে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং সিলেট, রংপুর, বরিশাল ও পাবনায় চারটি নতুন মেরিন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে; আরো ছয়টি জাহাজ সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে। বিদেশি জাহাজে কর্মরত নাবিকদের জন্য মেশিন রিডেবল পরিচয়পত্র ‘আইডি কার্ড’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দরসহ নতুন দশটি স্থলবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রতিটি দেশের অগ্রগতির পেছনে রাজনীতি আছে। সেই রাজনীতি যদি সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দেশপ্রেমের জন্য হয়, তাহলে দেশ কখনো পিছিয়ে থাকতে পারে না। বঙ্গবন্ধু ২৪ বছর লড়াই সংগ্রাম করেছেন, একটা সৎ এবং সঠিক লক্ষ্য নিয়ে। সেজন্যই তিনি একটি দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন।
জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এমনকি আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র চলছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এবং বিশ্বশান্তির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। অথচ সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য আজ গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ একটা অবাধ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সম্মানের জায়গায় চলে গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন একটি গর্ব করার মতো বিষয়, তখন এই বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা চলছে। এসব দেশবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক : প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বাবু/এ.এস