নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংবেদনশীল মানুষ চাই

সেলিনা হোসেন

মতামত

পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনাকে গণমাধ্যমের খবর হতে দেখা যায়। নানা ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি

2023-07-09T16:15:03+00:00
2023-07-09T16:15:03+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংবেদনশীল মানুষ চাই
সেলিনা হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ৯ জুলাই, ২০২৩, ৪:১৫ পিএম   (ভিজিট : ১৪৪)
X


পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনাকে গণমাধ্যমের খবর হতে দেখা যায়। নানা ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি সত্ত্বেও নারীর প্রতি মনোভাব এখনো পিছিয়ে পড়া সমাজের কথাই মনে করিয়ে দেয়। নারীকে সহজে হেনস্তা করা যায় এবং পার পাওয়া যায়- এমন ধারণা অপরাধীদের মধ্যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখে। ১৮৬৮ সালে কার্ল মার্ক্স লিডউইক কুগেলম্যানকে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘ইতিহাস সম্পর্কে যার কোনো ধারণা আছে তিনিই জানেন যে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো বড় সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।’ সেক্ষেত্রে দেখা যাবে, ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিসংগ্রামসহ উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে নারীর বিশাল অবদান রয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যান থেকে আমরা জানতে পারছি, গত ছয় মাসে শারীরিক-মানসিকসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫২০ নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ২২৩ জন কন্যাশিশুসহ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২৬ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২১ কন্যাশিশুকে। শুধু সদ্যসমাপ্ত জুনে ২৬৫ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৩ জন কন্যাসহ ৫৩ জন। ৫ কন্যাসহ ১৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৮ হাজার ৭৯২ নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৯ হাজার ৮৫০ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু আমাদের দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ কিন্তু এর বাইরে আরও বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন হন, সে কথা বলার আর অপেক্ষা করে না।

অথচ আমাদের দেশে নারী ও কন্যাশিশুর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন বন্ধে দেশে ইতিবাচক আইন ও নীতিমালাও আছে। কিন্তু যথাযথ আইনের প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাবে এখনো দেশে শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। অথচ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবারে এবং অনলাইনে নারী নির্যাতন বেড়েছে।

পৃথিবীতে বসতি শুরু হয়েছিল নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টায়। সভ্যতার শুরুতেই নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক তফাত তৈরি হয়নি। মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার শ্রেয় বোধটি ছিল প্রধান। কিন্তু সময় এক রকম থাকেনি। গড়িয়েছে প্রবল ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। নারী ছিটকে পড়েছে মানুষ নামের বিশেষণ থেকে। শুরু হয়েছে পুরুষের একতরফা কর্তৃত্ব। তারা এ কর্তৃত্ব গড়ে তোলে দুটো ভিত্তির ওপর। ধর্ম আর অর্থনীতি। এ দুটো ক্ষেত্র নারীকে প্রবলভাবে কোণঠাসা করে রেখেছে। এ দুটো এ সংস্কৃতির মধ্যে নারীসংক্রান্ত ভাবনার মৌল সত্য। এর পাশাপাশি নানা ধরনের ভিন্নমুখী তরঙ্গ এসে আঘাত করতে শুরু করেছে।

গণিতবিদ পিথাগোরাস একটি ভ্রাতৃসংঘ গঠন করেছিলেন। এ সংঘের প্রধান কাজ ছিল গাণিতিক চিন্তাধারার তত্ত্বঘটিত অভিমত তৈরি করা। তারাই প্রথম আবিষ্কার করেন পৃথিবী চ্যাপ্টা নয়, গোলাকার। কোনো নারী এই ভ্রাতৃসংঘের সদস্য ছিল না। ড. কাজী মোতাহার হোসেন গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস বইতে উল্লেখ করেছেন, পিথাগোরিয়ানরা জোড়-বিজোড় সংখ্যার নামকরণ করেছিলেন। তারা জোড় সংখ্যাটি স্ত্রী আর বিজোড় সংখ্যাকে পুরুষ বলে মনে করতেন। তাদের ভ্রাতৃসংঘের সদস্য সবাই পুরুষ ছিল। এজন্য স্বভাবতই বিজোড় সংখ্যাকে স্বর্গীয় আর জোড় সংখ্যাকে পার্থিব বলে বিবেচনা করা হতো। তাদের জোড় সংখ্যা বা নারী জাতি এজন্য কোনো প্রতিবাদ করেনি। অন্তত বিজোড় সংখ্যা যে পয়মন্ত, তা স্বীকার করতে ওই যুগের নারী সমাজের দ্বিধা ছিল না।

বাংলার সংস্কৃতিতে জোড় সংখ্যা নারী বলে উল্লেখ পাওয়া যায় খনার বচনে। যেমন- ‘বাণের পৃষ্ঠে বাণ/পেটের ছেলে গনে আন/নামে মাসে করে এক/সাতে হরে সন্তান দেখ/এক তিন তাকে বাণ/তবে নারী পুত্রবান/দুই চারি ছয়/অবশ্য তার কন্যা হয়/থাকিলে তার শূন্য সাত/হবে নারীর গর্ভপাত।’ এই বচনে দেখা যাচ্ছে, জোড় সংখ্যা নারী। কিন্তু বিজোড় সংখ্যা পুরুষ দেখানো হলেও তা পয়মন্ত নয়। বলা হয়েছে, ‘থাকিলে তার শূন্য সাত হবে নারীর গর্ভপাত। খনা জ্যোতিষীর দৃষ্টিকোণ থেকে জোড়-বিজোড় সংখ্যার ভালোমন্দ বিচার করেছেন। কিন্তু পিথাগোরিয়ানরা ধারণা থেকে নিজেদের স্বর্গের প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং এককভাবে স্বর্গীয় সুখলাভের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন। গণিতের মতো জটিল শাস্ত্র যারা চর্চা করেছিলেন, তারা দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করেছিলেন যে পৃথিবী নারীর। নারীরা এটা সানন্দে স্বীকার করেছিল। এজন্য পিথাগোরিয়ানদের সময়ের নারীরা জোড় সংখ্যায় কোনো আপত্তি করেনি। আপত্তি করার যে কথা নয়, সে সময়কে নিয়ে যারা বিশ্নেষণ করেছিলেন, তারা নারীর মনোভাব বুঝতে চাননি। নারীদের বোঝার মতো পরিসর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ রাখেনি।
সাধারণত নারী ও কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন-সহিংসতা কিংবা ধর্ষণের মতো ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। তাছাড়া অপরাধীর সঙ্গে ক্ষমতাবানদের সখ্য হওয়ার কারণে নির্যাতিতের পরিবার সঠিক বিচার পায় না! কখনো কখনো নির্যাতক কোনো কোনো রাজনীতিকের আশীর্বাদও পেয়ে থাকে। অন্যদিকে আছে বাল্যবিবাহের কুফল। এতে শুধু ওই কন্যাশিশু একা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। যে শিশু তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হতে পারত, বাল্যবিবাহের ফলে তা ব্যাহত হচ্ছে। কাজেই শুধু শিশুদের জন্য নয়, রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সব ধরনের শিশু নির্যাতন বন্ধ করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি কোনো একক সত্তা নয়, ব্যক্তি সামাজিক সমষ্টির অংশ। তাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নারী ও শিশুদের যথাযথ অধিকার, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে সরকার জাতীয় শিশুনীতি ও নারী উন্নয়ননীতি প্রণয়ন করেছে। গৃহীত এসব পদক্ষেপের ফলে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও এখনো প্রত্যাশিত হারে কমেনি। তাই নারী ও শিশুদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং নিপীড়নমুক্ত সমাজব্যবস্থ্যা। সেই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি আপনজনসহ সবাইকে মানবিক আচরণ করতে হবে এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চার ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের দেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ ‘ভাগ্যবানের বউ মরে আর অভাগার গরু মরে।’ কোনো কোনো পুরুষ এই প্রবাদে উৎফুল্ল হয়। ভুলে যায়, কত কুৎসিত এর অন্তর্নিহিত অর্থ। এই প্রবাদে নারী গরুর চেয়েও কম মূল্যবান। কেননা অভাগার স্ত্রী মরলে কিছু যায় আসে না, কিন্তু গরু মরলেই সে সর্বস্বান্ত হয়। এখানেই নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রশ্ন। সম্পর্ক যেখানে শরীরের, তখন সেটা এমনই কদর্য। একই কারণে সুস্থ মননশীল মস্তিষ্ক বলে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। এর দ্বিতীয় পঙ্ক্তি- সেই সঙ্গে মনমতো পতি যদি মেলে। দেখা যায়, প্রথম পঙ্ক্তি প্রায়ই উচ্চারিত হয় দ্বিতীয় পঙ্ক্তি বাদ দিয়ে। এটাও সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ সম্পর্কের নেতিবাচক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে অনায়াসে নারীকে দাবিয়ে রাখার এক ধরনের মানসিক কৌশল। নারীকে সংসারের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি করে রাখার এমন নানা উপায় পুরুষ নিরন্তর খুঁজে ফিরছে।
তবে এখনকার বাংলাদেশের দিকে যখন তাকাই, দেখি রাষ্ট্রক্ষমতায় একজন নারী, তখন নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাওয়াটা কষ্টের। বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতার কথা মুখে মুখে না বলে তা সমাজে প্রতিফলিত হবে এটাই কাম্য।

লেখক : কথাশিল্পী ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy