ফেনী নদীর পানি উত্তোলনে উভয়ের স্বার্থ রক্ষা জরুরি

শর্মিলী মাহজাবিন

মতামত

২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ফেনী নদী থেকে ভারতের পানি উত্তোলনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা

2023-07-10T15:47:13+00:00
2023-07-11T15:08:26+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ফেনী নদীর পানি উত্তোলনে উভয়ের স্বার্থ রক্ষা জরুরি
শর্মিলী মাহজাবিন
প্রকাশ: সোমবার, ১০ জুলাই, ২০২৩, ৩:৪৭ পিএম  আপডেট: ১১.০৭.২০২৩ ৩:০৮ পিএম  (ভিজিট : ৩১৩)
X


২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ফেনী নদী থেকে ভারতের পানি উত্তোলনের ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুম শহরের বাসিন্দাদের পানির সংকট মোকাবেলার জন্য ফেনী নদী থেকে পাম্পের মাধ্যমে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন করতে পারবে ভারত। তবে এখনো ভারত সেখান থেকে পানি প্রত্যাহার শুরু করেনি।

জুন মাসে নদী থেকে পানি উত্তোলনের জায়গা নির্ধারণ করা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পানি উত্তোলনের জন্য পাম্প বসানোর স্থান নির্ধারণ করতে পারিনি দুই দেশের টেকনিক্যাল কমিটি। ভারত চেয়েছে নদীর গভীরে কূপ খনন করে পাম্প বসাতে, অন্যদিকে বাংলাদেশ নদীর পাড়ে পাম্প বসিয়ে পানি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। পাল্টাপাল্টি মতে অটল থাকায় আপাতত পাম্প বসানোর ব্যাপারটি স্থগিত আছে।

ভাটির দেশ হওয়ায় অনেকগুলো আন্তর্জাতিক নদী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এরকম আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৭ টি। এর মধ্যে ভারতের সাথে ৫৪টি ও মায়ানমারের সাথে ৩টি যৌথ নদী রয়েছে। ভারতের সাথে থাকা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত তিস্তার পানিচুক্তি। তিস্তা নদীর উজানে ভারতীয় অংশে বাঁধ নির্মাণের ফলে দীর্ঘদিন যাবত শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে কৃষিকাজ ব্যহত হচ্ছে। পাশাপাশি পানির প্রবাহ কমে আসায় তিস্তাও মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে বন্যার কবলে তলিয়ে যাচ্ছে এ অঞ্চলের জনপদগুলো। দীর্ঘদিনের আলাপ আলোচনার পর সর্বশেষ ২০১১ সালে দুই দেশ যখন চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হয় তখনই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে আসে ভারতের কংগ্রেস সরকার।

তবে প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ভারত সফরে আন্তঃসীমান্ত নদী কুশিয়ারা থেকে বাংলাদেশের পানি প্রত্যাহারের ব্যাপারে ভারতের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী কুশিয়ারা থেকে উৎপত্তি হওয়া রহিমপুর খালের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৫২ কিউসেক পানি উত্তোলন করতে পারবে। বাংলাদেশের সিলেট জেলার ৩টি উপজেলার কৃষির জন্য কুশিয়ারার এই পানি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পানি বন্টন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ শীঘ্রই কুশিয়ারা থেকে পানি উত্তোলন শুরু করবে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনায় ভারত যেমন বাংলাদেশকে পানি উত্তোলনের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশও ভারতের প্রয়োজন বিবেচনায় ফেনী নদীর পানি ভারতকে দিতে সম্মত হয়েছে। নদী থেকে উত্তোলিত এ পানি ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের বাসিন্দাদের খাবার পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যবহার করা হবে। বৈদ্যুতিক পাম্পের সাহায্যে ১.৮২ কিউসেক অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৫২ লিটার এবং দিনে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার পানি প্রত্যাহার করা হবে। এই পানি না পেলে ত্রিপুরার ওই শহরের বাসিন্দারা খাবার পানির সংকটে পড়বে। ফলে মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ভারতকে এই পানি উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ফেনী নদীতে বর্ষা মৌসুমে ৮-১০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু শুকনো মৌসুম অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে এ প্রবাহ কমে ৪৭ থেকে ৫০ কিউসেক-এ দাঁড়ায়। ফেনী নদীর পানির উপর কৃষিকাজের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমি নির্ভরশীল। বাংলাদেশের অন্যতম সেচপ্রকল্প মুহূরী সেচ প্রকল্পটি ফেনী নদীর পানির উপর নির্ভরশীল। ফলে অনেকেরই ধারণা, ফেনী নদী থেকে ভারত পানি উত্তোলন করলে তাতে বাংলাদেশের জন্য পানির ঘাটতি দেখা দেবে এবং নদীর নাব্যতা হ্রাস পাবে। এ নিয়ে চুক্তিটি সইয়ের পরপরই বাংলাদেশের সরকার বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে।
তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ ১০৯ কিউসেক। সেখান থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি দিলে তা হবে মোট প্রবাহের ০.২৩ শতাংশ। এই পানি দিয়ে সাব্রুম শহরের বাসিন্দাদের পানীয় জলের সংকট দূর হবে। এটি মানবতার দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে এই সামান্য পরিমাণ পানিতে নদীর নাব্যতার কোনো ক্ষতি না হলেও ভারতীয় ভূখণ্ডের শূন্য রেখায় অবস্থিত কৃষিজমিগুলোতে সেচের জন্য নদী থেকে অবৈধভাবে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলনের ফলে নদীর নাব্যতা কমে গিয়েছে বলে নদী বিশেষজ্ঞদের মত। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে এ ধরনের পাম্পের সংখ্যা প্রায় ৪০টি বলে দাবি করা হয়েছে। ২ কিউসেক পানি উত্তোলনে সক্ষম এসব পাম্পগুলো সরাসরি পাইপের মাধ্যমে নদী থেকে পানি তুলছে। ফলে নাব্যতা কমে আসায় সীমান্তবর্তী এ নদীটি সংকুচিত হয়ে এসেছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে মহুরী সেচ প্রকল্পের কার্যক্রম। 
এমতাবস্থায় নদীর গভীরে পাম্প স্থাপন করলে নদীর পাড়ে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়ে নদীর গতিপথ পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের টেকনিক্যাল কমিটি। তারা খাল খনন করে সেখানে পাম্প স্থাপন করে পানি উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে উভয় দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন করলে উভয় পক্ষই তা থেকে লাভবান হবে। দ্রুত পানি উত্তোলন করলে তাতে পাশ্ববর্তী সাব্রুম শহরের বাসিন্দাদের পানির সংকটের সমাধান ত্বরান্বিত হবে।

আসাম-ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এবং ভূবেষ্ঠিত হওয়ায় এ অঞ্চলটি তুলনামূলক অনুন্নত। এ অঞ্চলের সহজ ও দ্রুত উন্নয়নের জন্য ভারত বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। এখান থেকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা আদায়ের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ তা নেয়নি। বরং এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সড়ক, রেলপথ ও নদীপথে সহজ সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারতের। এমনকি ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহারের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে তার অদূরেই ২০২১ সালে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ নির্মিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সীমান্তের দু’দিকের লোকজনের মধ্যে ব্যাবসায়িক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নদী থেকে পানি উত্তোলনের মাধ্যমে একটি শহরের পানীয় জলের বন্দোবস্ত হলে এটি সেই প্রচেষ্টাকে আরো একধাপ এগিয়ে দেবে। 

লেখক : গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy