
X
পথশিশু শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাস্তায় ফুটপাতে জীবনযাপন করা শিশুদের চিত্র। পথশিশুদের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রের,সমাজের এবং ব্যক্তি মানুষের। কারণ একটি শিশু কেন পথেই জন্ম নেয় এবং বড় হয়ে ওঠে তার দায় তো সেই শিশুর না। দায় আমাদের।
বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দেখা মেলে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল,স্বল্পন্নোত বা অনুন্নত দেশগুলোতে এদের দেখা বেশি মেলে। আমাদের দেশেও এধরনের শিশুর দেখা মেলে। এই শিশুরা অত্যন্ত অবহেলা-অযত্নে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। এদের নিয়ে অনেক সংগঠন ও সংস্থা কাজ করে। কিন্তু তাদের জীবনমান খুব বেশি উন্নত হয় না। রাস্তা-ফুটপাত যাদের ঠিকানা। বড়লোকের আহ্লাদে বড় হয়ে ওঠা শিশুদের পাশাপাশি এরাও বড় হয়। অভাব যাদের জীবনে নিত্যসঙ্গী। খোলা আকাশ যাদের মাথার ওপর ছাদ হয়ে থাকে। জন্মের পরপরই তারা পৃথিবীর এক অন্যরকম চিত্র দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠে। ধনী-গরিবের ব্যাবধান তারা জন্মের পরেই দেখতে পায়। এসব ভাগ্য-পরিচয়হীন শিশুদের আমরা কখনো টোকাই, কখনো পথকলি, ছিন্নমূল বা পথশিশু বলে ডাকি। যাদের জন্য সমাজের, রাষ্ট্রের, সুশীল সমাজের আমাদের সবার দায় রয়েছে। এসব পথশিশুরা বঞ্চিত হয় রাষ্ট্র প্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে।
‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ শীর্ষক জরিপের তথে জানা যায়, পথশিশুদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশই দারিদ্র্য বা ক্ষুধার কারণে ঘর ছেড়েছে। ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ ঘর ছেড়েছে মা-বাবা শহরে আসার কারণে। আর কাজের জন্য ঘর ছেড়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ শিশু। এই শিশুদের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে দুইজনই একা একা শহরে এসেছে। ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে এ তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশের পথশিশুদের ৮২ শতাংশই ছেলে, বাকি ১৮ শতাংশ মেয়ে। এদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ৫৪ শতাংশ পথশিশু ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী। ১৫ থেকে ১৭ বছরের পথশিশু রয়েছে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ৫ থেকে ৯ বছরের পথশিশু ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। এসব পথশিশুর অনেকেই ক্ষুধার কারণে ঘর ছেড়েছে। ৪৮.৫ শতাংশ পথশিশু ঢাকায় বসবাস করে। ৬৪ শতাংশ পথশিশু ঘরে ফিরতে চায় না।
এসব অধিকার বঞ্চিত শিশুকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তুলতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ। সঠিক পরিবেশ আর অযত্ন অবহেলায় যেন তারা শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়ে যুগোপযুগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে যেসব ভাসমান শিশুদের অবস্থান তাদের জন্য সমন্বিতভাবে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
রাজধানী ঢাকায় পথশিশুর সংখ্যা বেশি। এবং এসব পথশিশুর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যাবহার করছে সুযোগসন্ধানী মানুষ। একটু ভালো থাকার আশায় না বুঝেই সেসব অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে এসব পথশিশুর অনেকেই। তাদের সামনে তো ভালো থাকার বিকল্পও নেই। এভাবে ছোট ছোট অপরাধ থেকে বড় কোন অপরাধে জড়িয়ে পরাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে এসব পথশিশুকে বেছে নিচ্ছে মাদক কেনা বেচায়। আমাদের বুঝতে হবে প্রতিটি শিশুই তার মেধাশক্তি নিয়ে জন্ম নেয়। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে প্রতিভা। তারাই হবে দেশ ও জাতির কাণ্ডারি।
পরিচয়-ঠিকানাবিহীন শিশুদেরও আশ্রয় হচ্ছে পথে। বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে এসব শিশু পেটের ক্ষুধা মেটাতে নানারকম কাজ বেছে নেয়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে হকার, শ্রমিক, রিকশাচালক, ফুলবিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুননকর্মী, কুলি, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যা আমরা আমাদের চারদিকে তাকালেই এর বাস্তবতা টের পাই। কেবল পেটের ক্ষুধা মেটানোই এদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এদের মধ্যে অনেকেই তাই একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় না বুঝেই অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পরে। আমরা যদি তাদের জন্য ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ রাখি তারা নিশ্চয় অপরাধীদের কথায় প্রভাবিত হবে না।
পথশিশুদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের ও নির্মম। সমাজের নিষ্ঠুর সত্যের সাথে এরা বাস করে। আরাম-আয়েশের ঠিক উল্টো দিকে এদের বসবাস। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খাওয়া ও এরকম স্থানে ঘুমানোর কারণে তারা প্রায়ই নানা রোগে আক্রান্ত থাকে। অথচ চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে। মেয়ে শিশুরা দালালচক্রের খপ্পরে পরে যৌনকাজে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা নানা রকম যৌন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। একসময় এরা ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। অথচ সমাজে এদেরও একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন ছিল। অনেক পথশিশু জড়াচ্ছে অপরাধে।
বাংলাদেশে পথশিশু সংখ্যা যাই হোক না কেন তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নের অন্তরায়। একটা বিরাট অংশ যদি অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে ওঠে তাহলে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি ধীর গতির হবে। এসব পথশিশুদের সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। যখন আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি তখন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাদের এই বিপুল পথশিশুকে অবশ্যই আর দশটা শিশুর মতোই বড় করে দেশের কাজে লাগাতে হবে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট
বাবু/এ.এস