
X
ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে কোনো মানুষই বক্তব্য দিতে পারে না। দিলেও তা শতভাগ সত্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে অতীত ও বর্তমানকে বিবেচনায় নিয়ে কিছু কিছু বিষয়ে নিকট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিনিয়ত যেখানে ঘটনাপ্রবাহ পরিবর্তিত হয়, সেখানে তাও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রতিনিয়ত নানা ঘটনায় মোড় পরিবর্তন করছে। প্রায়ই সেই পরিবর্তন অনেক জটিল অলিগলি পথের ভেতর ঢুকে পড়ছে এবং এ থেকে ভালো কিছু আশা করাও কঠিন। এর কারণ যারা রাজনীতির নিয়ন্ত্রক তাদের কেউ কেউ কতটা দেশপ্রেম, সততা, প্রজ্ঞা এবং মানুষের কল্যাণার্থে চিন্তা করে কথা বলেন, সিদ্ধান্ত নেন, পথ রচনা করতে চান, এও বড় প্রশ্ন। সে জন্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে সুনিশ্চিত হয়ে রাজনীতি বিশেষজ্ঞদেরও কিছু অনুমান করার সুযোগ খুব কম। তবে একটি বিষয় বোধ হয় সচেতন প্রায় সবাই বলে দিতে পারেন যখন সব পক্ষই রাজনীতিকে রাজনীতির বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে শুধু সংকীর্ণ উদ্দেশ্য সাধনে তৎপর থাকেন তখন নির্ঘাত যা ঘটবে, তা হলো সংঘাত। এমন পরিস্থিতিতে হারজিত কার কিংবা দেশের কতটা লাভ হয় তা বলাও মুশকিল। এজন্যই ভবিষ্যৎ নিয়ে বলা আমাদের মতো অল্পদর্শীর পক্ষে সম্ভব নয়।
১২ জুলাই ঢাকায় বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ও সরকারি দলের যে সমাবেশ এমন প্রতিযোগিতামূলক হবে এই খবর খুব বেশি আগে জানা যায়নি। বিরোধী দল সমাবেশ করবে তা বলা হচ্ছিল। তবে নির্ধারিত তারিখ জানানো হয়নি। এরপর অনেকটা হুট করেই ১২ জুলাই ঢাকায় সমাবেশের কথা বলা হয়। বোঝাই যায় দুটি বিদেশি প্রতিনিধিদলের বিদ্যমান পরিস্থিতি কেন্দ্রিক উপলক্ষ্যে আমাদের দেশে অবস্থানই এর মূল কারণ। ইওনাউ দিমিত্রার নেতৃত্বে ছয় সদস্যবিশিষ্ট ইইউর প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল ৮ জুলাই ঢাকায় আসেন। প্রতিনিধিদলটির সদস্যরা এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন, সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তাদের জানতে চাওয়া বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করেছেন। অন্য দলটি হলো মার্কিন বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল। যে দলে আরও আছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার এশিয়া দপ্তরের উপসহকারী প্রশাসক অঞ্জলী কৌর। সাধারণত ঢাকায় জনসভা নির্ধারণে বড় দলগুলো শনিবারকেই বিবেচনায় নেয়। কিন্তু এবার বুধবার কর্মদিবস হওয়ায়, এমন রাজনৈতিক সমাবেশ করার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর উদ্দেশ্য সফররত প্রতিনিধিদলের দৃষ্টি আকর্ষণ। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনকারী আরও কয়েকটি নামসর্বস্ব দলও রয়েছে। তারাও ১২টি জায়গায় সমাবেশের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। যদিও দলগুলোর সমাবেশের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য ছিল না, তথাপি ঢাকা শহরে বিএনপিসহ ১৩টি জায়গায় একসঙ্গে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়তো প্রতিনিধিদলকে নিজেদের জনসমর্থন দেখানোরই উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে লক্ষণীয় বিষয়, জামায়াত কোনো কর্মসূচি দেয়নি।
জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ঘরে বসে থাকার কথা নয়, তারা কে কোন জনসভায় অংশ নিয়েছে, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবে। বিএনপির সমাবেশে ঢাকার বাইরে থেকে নেতাকর্মীরা আসবেনÑ তা আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল। বিএনপির সমাবেশস্থল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তা হওয়ার বিষয়টি ১০ ডিসেম্বরের আগেও সরকারের কাছে এক ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করে। নেতিবাচক কিছু ঘটার আলামতও ছিল। এবার তাই আওয়ামী লীগের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক ঠেকায় দলটি তড়িঘড়ি করে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে একটি শান্তি সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সমাবেশের কারণে গণপরিবহনণ বলতে গেলে সমাবেশ স্থলগুলোর আশপাশে কোথাও চলাচল করেনি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কর্মজীবী এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল কতটা কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা চিত্রই এর সাক্ষ্য বহন করে। পাশাপাশি দুটি দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও আশার কথা, তা ছিল শান্তিপূর্ণ। যদিও উভয় দলই তাদের সমাবেশ থেকে ঘোষণা দিয়েছে এক দফার। কেউ সরকার পতনের আবার কেউ এ সরকারের অধীনেই নির্বাচনের।
অনেকের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ করতে গেল কেন? আওয়ামী লীগের বক্তব্য, সফররত প্রতিনিধি দলকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি দেখানোর জন্য যে প্রস্তুতি বিএনপি নেয়, তা একতরফা হওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে। তা ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মের অভিজ্ঞতা থেকে রাজপথে বিএনপির সমাবেশ যে অন্যদিকে মোড় নেবে না সে নিশ্চয়তাও মেলেনি। এ কারণেই বিশেষ কোনো জনসভার স্থান ব্যতীত রাজপথে যখনই বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারী দলগুলো সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়, তখনই আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ নামে মাঠে থাকার কর্মসূচি দেয়। এমনটি অনেকের কাছে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টির অন্তর্নিহিত যৌক্তিক বাস্তবতা রাজনীতিবিদরাই ভালো বলতে পারেন। কার মনে কী আছে, সেটি আমজনতার বোঝার সাধ্য ২০১৩ সালের ৫ মে তেও ছিল না, আগে বা পরবর্তীকালের অনেক ঘটনার আগে-পরেও ছিল না। ১২ তারিখের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ সম্পর্কে মার্কিন ও ইইউ প্রতিনিধিদল কি বুঝল, কিংবা তাদের বুঝ কার জন্য কতটা কি বার্তা দেবে, সেটিও তারাই ভালো বলতে পারবেন।
সমাবেশে বিরোধী দল থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবি জানানো হয়েছে। তাদের এই এক দফায় আরও অনেক দফা রয়েছে। সেগুলো হলো বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত, নির্বাচন কমিশন বাতিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন ইত্যাদি। এতগুলো পরিবর্তন একসঙ্গে যদি দেশে ঘটানো হয়, তাহলে গোটা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংবিধান ও প্রশাসন সব কিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে। নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। যদি দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে এর পরিণতি জাতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেবে। ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হওয়ার পর ধর্মঘট এবং অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ সংসদকে মেনে নিয়েই সংবিধান সংশোধন হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু সেই সরকার প্রথমেই বড় ধরনের হোঁচট খায়। দ্বিতীয়বারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্বলতা ২০০১ সালে চরমভাবে উন্মোচিত হয় এবং ২০০৬ সালে সেটি বিএনপি-জামায়াতের রিমোট কন্ট্রোলে পরিচালিত হওয়ার দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতার কথা এখনও অনেকেই বলেন। ১/১১-এর সেনাসমর্থিত দুই বছরের সরকার ক্ষমতায় থেকে কলকাঠি নাড়ার পেছনেও বার্তা ছিল অনেক। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করার দাবি অনেকটাই জোর করে গিলিয়ে ১৯৯৬-এর প্রতিশোধ নেওয়ার মনোবৃত্তি মনে হতে পারে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে সহায়ক নয়, তা প্রমাণিত হওয়ার পরও এই দাবিতে আন্দোলন করলে দেশের একটি বড় অংশের মানুষই মনে করে ওই ব্যর্থ অভিজ্ঞতার পথে আবার যাওয়ার অর্থ দেশ-জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনা। প্রশ্ন জাগে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ কী? পথ অবশ্যই রাজনীতিবিদদের কাছে রয়েছে। সেজন্য তাদের এক টেবিলে বসতে হবেÑ এমনটি নাও হতে পারে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে কটি শর্ত নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং অংশীজনদের মেনে চলতে হবে, সেই অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতি সবার পক্ষ থেকে উচ্চারিত হওয়ার পর দেশ ও আন্তর্জাতিক সব পক্ষই তা নজরদারিতে রাখতে পারে। এর ব্যত্যয় ঘটলে জনগণ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মাধ্যমে তা ফয়সালা করতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের আগেই দেশে আবার তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে অস্থিরতা সৃষ্টি, নির্বাচন পণ্ড, বিতর্কিত করার চেষ্টা আগের মতো এখন হালে পানি না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন আর দেখতে চায় না। বিদেশিরাও তা দেখতে চান না। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার একমাত্র উপায় হবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, সম্মত থাকা এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কোনো পক্ষের দিক থেকে করতে না দেওয়া। কেউ যেন নির্বাচনকে বিতর্কিত করার সামান্য সুযোগও না পান, সেরকম নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা। এর বাইরে গিয়ে বিরোধী দল যে এক দফার দাবি করেছে, তা বাস্তবায়ন করার মতো জনসমর্থন তাদের নেইÑ এমনটিও অনেকেরই বক্তব্য।
দলের সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন আন্দোলনের মূল দল হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। অন্য দলের নেতারা মিডিয়ায় কথা বলতে পারেন, কিন্তু আন্দোলনের শক্তি তাদের নেই। সুতরাং এই অবস্থায় সেদিনের শান্তি সমাবেশে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচন করার যে কথা উচ্চারিত হয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে সেই সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সদ্যসদের নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করবে, এমন ভাবনাও আমলে নেওয়া যেতে পারে। মোটকথা সংঘাত-সহিংসতার পথ ছেড়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় চলতে হবে।
লেখক : ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
বাবু/এ.এস