
X
বিশ্বখ্যাত কূটনীতিক এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব ড. হেনরি কিসিঞ্জারের কিছু মন্তব্য এখনও অন্যরকমভাবে আলোচিত। তিনি কূটনীতির দূরদর্শী একজন ‘খলনায়ক’ এমন আলোচনা-সমালোচনাও চায়ের টেবিলে কখনও কখনও ঝড় তোলে। ফিরে তাকাই পেছনে কিংবা ইতিহাসের পাতায়। ১৯৭১ সালের ১৫ জুলাই। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেদিন অপরাহ্ণে মার্কিন জনগণ ও বিশ্ববাসীকে অবগত করেন গণচীনের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক স্বাভাবিক করবেন। তার বক্তব্য ছিল ৭৫০ মিলিয়ন জনগণকে বাদ দিয়ে বিশ্বে শান্তি আসতে পারে না। এ কারণে আলাপ-আলোচনার জন্য ড. কিসিঞ্জার ৯ থেকে ১১ জুলাই চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাইয়ের আলাপ-আলোচনা করেন। ওই আলোচনা ছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন ভ্রমণকে কেন্দ্র করে। তখন বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল অন্যরকমভাবে।
ওই ভ্রমণটি অত্যন্ত গোপনে আয়োজন করা হয়েছিল। এর মূল আয়োজক ছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া। লাহোরের চাকলালা বিমানবন্দরের সামরিক বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছিল। চীনে যাওয়ার সাধারণ বিমানপথ ব্যবহার করা হয়নি। কারাকোরাম উপত্যকা দিয়ে কিসিঞ্জারের বিমান যাওয়া-আসা করে এবং চীন নেভিগেটর যাত্রায় সাহায্য করে। একজন নকল হেনরি কিসিঞ্জার সাজিয়ে তাকে পাকিস্তানের নাথিয়াগলি শহরে রেখে বিশ্বকে দেখানো হয় যে ড. কিসিঞ্জার সেখানে বিশ্রাম করছেন, এও ইতিহাসের দৃষ্টান্ত। তিনি চৌএনলাইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন যে, বিশ্বের যত নেতার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তার ভেতর প্রথম তিন-চারজনের অন্যতম চৌএনলাই। তিনি অমায়িক, কথা কম বলেন, তীক্ষèবুদ্ধিসম্পন্ন ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৫৪ সালে জেনেভায় ইন্দোচীন নিয়ে যখন সম্মেলন হচ্ছিল, তখন করিডোরে চৌএনলাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জন ফস্টার ডালেসকে আসতে দেখে চৌএনলাই হ্যান্ডসেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে ডালেস উপেক্ষা করে চলে যান। অবশ্য এ রকম শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ আমরা দেখলাম সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিনিধি পরিষদের চেয়ারম্যান ন্যান্সি পোলানির মধ্যেও। একজন হ্যান্ডসেক করলেন না, অন্যজন প্রেসিডেন্টের দেওয়া কাগজ সর্বসমক্ষে ছিঁড়ে ফেললেন।
আমরা অনেকেই তখন নিশ্চিত হই যে, ইয়াহিয়ার ওই পরিষেবার জন্য নিক্সন বাংলাদেশে পাকিস্তানের গণহত্যাকে আমলে নেননি। বাংলাদেশে অবস্থিত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের বন্ধু সিস্ট রিপোর্ট তিনি গ্রহণ করেন না। বরঞ্চ ব্লাডকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল নিম্নপদে পদায়নের মাধ্যমে। নিক্সনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের জন্য ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হয়েছেন এবং চার লাখ মা বোন ইজ্জত দিয়েছেন এমনটি বললে অত্যুক্তি হবে না। চীনে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তখন পর্যন্ত এই দুই দেশের তিক্ত সম্পর্ক বিরাজ করছিল, তবে কোনো যুদ্ধাবস্তা হয়নি। সত্য বটে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে রাশিয়া ভারতের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এসব খেলা চলছিল, কিন্তু মার্কিন জনগণের জন্য এমন আশু কোনো বিপদ ছিল না যে নিক্সন এহেন একটি গণহত্যাকে সমর্থন দিতে হবে। এটা একজন উচ্চাভিলাষী, বিবেকহীন ও নিষ্ঠুর রাজনীতিকের পক্ষে সম্ভব ছিল। চৌএনলাই ও কিসিঞ্জারের ভেতর আলোচনার সময় তাইওয়ানের কথা আসে। চৌএনলাই পরিষ্কার বলেছেন যে, তারা দুই চীনের পক্ষে মোটেই নন। এমনকি ওই সভায় চৌএনলাই এ কথা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন জাতিসংঘের বাইরে রয়েছি, দরকার হলে আরও অপেক্ষা করব। কিন্তু আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল। সেদিন মার্কিন প্রতিনিধি তাতে সম্মত ছিলেন।
অবশ্য রাজনীতিতে নাকি চূড়ান্ত কথা বলে কিছু নেই। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বদলে যায় প্রেক্ষাপট বা বদলাতে হয়, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বোধহয় তা প্রযোজ্য নয়। সময় বলে দেবে কি করা বাঞ্ছনীয়। চীনে একদলীয় তথা এক ব্যক্তির শাসন। সেক্ষেত্রে চীনের প্রধানকে ডিক্টেটর বলা রুচিসম্মত নয়। এক্ষেত্রে কূটনীতি বিজ্ঞান বিষয়টি সমর্থন করে না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের কথা। আমরা এতদিন জানতাম বিশ্বের প্রথম সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য কূটনীতিক শাস্ত্রে অত্যন্ত বিজ্ঞ। কিন্তু সে ভুল ভাঙল। কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন বেশ একটু গরম মেজাজ দেখালেন চীনকে, সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠলেন সুনাক। তিনি বললেন, চীনের সঙ্গে প্রাণখুলে কথা বলার সময় শেষ হয়েছে। এটা কি কোনো কূটনীতির ভাষা হতে পারে। তবে দুই বছর ধরে বিলাতের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে যে ধরনের খেলা চলছে, তাতে কোনো অর্বাচীনের আগমন অস্বাভাবিক নয়। বর্তমানে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নাকি এক নতুন সম্ভাবনাময় ও গৌরবময় অধ্যায় শুরু হয়েছে। আর্থিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে সম্পর্ক শিখরে উঠানোর জন্য বড় উলম্ফন দেওয়া হয়েছে। ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র। অতএব তার যত উন্নতি অগ্রগতি হবে, তাতে আমরা আনন্দিত হব বৈকি।
আবার ফিরে আসি বাইডেন সাহেবের কথায়। তিনি বলেছেন, শি চিন পিং একজন ডিক্টেটর। তাহলে এত ডিক্টেটরের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে কীভাবে কাজ করে আসছে। কীভাবে ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তর ও মিসরের শাসকদের সঙ্গে কাজ করছেন। আবার অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করে পরে আবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে। যেমনÑ ইরাকের শাহকে নিজের দেশে স্থান দেওয়া হয়নি। প্রথম পর্যায়ে সাদ্দামকে ঘিরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করানো, আর যখন কোনো অপরাধ পাওয়া গেল না, তখন তাকে ফাঁসি দেওয়া হলো। সময়মতো চীনের ডিক্টেটর পিনাচেটকে সমর্থন দিয়ে পরে প্রত্যাহার করা হলো। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে ডিক্টেটর কিংবা ডেমোক্র্যাট বলে কথা নয়, কথা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কতটুকু প্রয়োজন। হেনরি কিসিঞ্জারেরই একটা কথা দিয়েই শেষ করি, ‘কোনো রাষ্ট্র যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর শত্রু হয়, তাহলে সে বিপদে পড়তে পারে, কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি বন্ধু হয়, তাহলে তার ধ্বংস অনিবার্য।’ ইতিহাস কি সেই পুরানো অধ্যায়ই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে? আমরা আরও কিছু নাটকীয়তা দেখার অপেক্ষায় থাকব?
লেখক : মুজিবনগর সরকারের সাবেক কর্মকর্তা
বাবু/এ.এস