চিন্তার বিকাশ দমনে ধর্মের অপব্যবহার

ইলিয়াজ হোসেন রানা

মতামত

মধ্যযুগে ইউরোপে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার উপর আঘাত এসেছে। কিন্তু সেসবের বাইরেও সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক

2023-07-27T16:39:52+00:00
2023-07-27T16:39:52+00:00
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬
   
চিন্তার বিকাশ দমনে ধর্মের অপব্যবহার
ইলিয়াজ হোসেন রানা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৩, ৪:৩৯ পিএম   (ভিজিট : ১৭৬)
X


মধ্যযুগে ইউরোপে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার উপর আঘাত এসেছে। কিন্তু সেসবের বাইরেও সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ওপরে। আর সেটা ঘটেছে খ্রিস্ট ধর্মের নামে। জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চাকারীদের ওপর তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন এবং এভাবে পুরো মানবসভ্যতার এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ নিত্যনতুন আবিষ্কার,  উদ্ভাবনকে এই পাদ্রীরা নিজেদের মূর্খতা, অজ্ঞতা ও অন্ধ ধর্মীয় গোড়ামির কারণে কঠোর হস্তে দমন করেছে। সমকালীন সমাজে জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞ ব্যক্তিদের তারা দেশদ্রোহী, সমাজবিরোধী,  ধর্মবিরোধী, উন্মাদ ইত্যাদি ভূষণে ভূষিত এবং প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। চার্চ ও যাজকশ্রেণি ছিল এ প্রহসনমূলক বিচারের মূল হোতা। তারাই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতেন কে অপরাধী আর কে অপরাধী নয়; কে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য,  আর কে মুক্তি পাওয়ার অধিকারী। তাদেরই নির্দেশে এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের সাথে এসব হত্যাকাণ্ড চালানো হতো, যার শিকার হতেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজের জ্ঞানী-গুণী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ রকম বর্বর ঘটনার মধ্যে হতে গুটিকয়েক ঘটনা পর্যালোচনা করলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রে তারা কতটা বাধার পাহাড় সৃষ্টি করেছিল।

জার্মানির কোলোন শহরে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে (১৪৭৫ খ্রি.) বই প্রকাশ শুরু হলে পোপের দুশ্চিন্তা শুরু হয়। তিনি ভাবলেন, ছাপার কাজ বা প্রিন্ট সহজ হয়ে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন বই রচিত হতে থাকলে তাদের খ্রিস্টবাদের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না আবার লেখা হয়। এই চিন্তায় বিভোর হয়ে পোপ ষষ্ঠ আলেক্সান্ডার ১৪৮৬ সালে কোলানের প্রধান পার্দ্রীকে নির্দেশ দেন কোলান বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত সকল বই এবং এর পাঠকদের ওপর নজর রাখতে। পার্দ্রীদের বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বক্তব্য, যুক্তি তা যতই সত্য ও প্রমাণিত বাস্তবতা হোক না কেন, প্রকাশ হতে দেওয়া হতো না; বরং প্রকাশ করার যেকোন প্রচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হতো। এ দমন চেষ্টা চলতো বিচারের নামে। অবশ্য এর জন্য গির্জা বা পুরোহিতরা নিজেদের ওপর দায় চাপানোর সুযোগে রাখেন নি। তারা যা-ই করেছেন, সেটা করেছেন বিচারের ওপর ভর করে। এজন্য তারা বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইতিহাসে সেটাই ইনকুইজিশন আদালত হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। ১১৮৪ সালে পোপ তৃতীয় লুসিয়াস কর্তৃক হলি ইনকুইজিশন প্রথার প্রবর্তন ঘটে। ইনকুইজিশনের পেছনে বাইবেলের একটি বাণীকে নৈতিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। বাইবেলে বর্ণিত সে নির্দেশকে (Deuteronomy ১৩:১২-১৬) একজন ইংলিশ লেখক উদ্ধৃত করেন তোমাদের ঈশ্বর বসবাস করার জন্য যেসব শহর জনপদকে তোমাদের অধীনে দিয়েছেন, তোমরা যদি দেখতে পাও সেসব শহরে এমন কোন কুলাঙ্গার বাস করছে, যে তোমার ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে না এবং শহরবাসীকে বিপথে পরিচালিত করে অন্য কোন ঈশ্বরের উপাসনায় নিয়োজিত রেখেছে। (তবে) তোমাদের দায়িত্ব হলো বিষয়টির দিকে মনোযোগ দেওয়া। খুব সাবধানতার সাথে তা যাচাই করে দেখবে। এর পরে যদি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রকৃতই তোমাদের মাঝে এরকম কোন ঘটনা ঘটেছে, তবে অবশ্যই সেই শহরের বাসিন্দাদের তোমরা তলোয়ারের মাধ্যমে হত্যা করবে। পুরো শহর ও তার মধ্যে বিরাজমান সকল কিছুই মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং শহরের সকল সম্পদ জড়ো করে ঈশ্বরের নামে জনসম্মুখে পুড়িয়ে দেবে। এ শহর চিরদিনের জন্যই এরকম ধ্বংসস্তূপ হিসেবেই রয়ে যাবে কখনোই তা পুননির্মাণ করা হবে না। খ্রিস্টবাদে অবিশ্বাসীদের শাস্তি দেয়ার জন্য এ আদালত প্রতিষ্ঠা হলেও সহসাই তা মুক্তচিন্তা, গবেষণা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তি বিশ্লেষণের জগতে তৎকালীন সমাজে যে একটা ধারা বিকাশমান ছিল, তা দমন করার কাজে ব্যবহৃত হতে থাকলো। এভাবে প্রতিদিনই জনসাধারণের সামনে প্রকাশ হতে থাকেÑ পুরোহিতদের মনগড়া, আজগুবি ও অদ্ভুত সব বোধ-বিশ্বাস, রসম-রেওয়াজ, নিয়মনীতি এবং জ্ঞানের কথা মোটেও প্রশ্নাতীত নয়।

বিকাশমান সামাজিক বাস্তবতায় স্বাধীন চিন্তা ও ভিন্নমত দমনে ধর্মের অপব্যবহার শুরু হয়ে যায়। বস্তুত এটা অপ্রত্যাশিত ছিল না, অমূলকও ছিল না। সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় নি, সেটাও নয়। কিন্তু সেটা হয়েছিল এই কারণেÑ চার্চ তার নিজ দর্শন, শিক্ষা ও অবস্থানে অটল থাকার চেষ্টা করেছে। যুক্তির সামনে সে শক্তি প্রয়োগ অথবা অন্ধবিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে গেছে। এর বিপরীতে সমাজের জ্ঞানী-গুণীরা তত্ত্ব, উপাত্ত ও যুক্তি দিয়ে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের অসারতা তুলে ধরতে লাগলো। ফলে গীর্জার যাজকরা অতি স্বাভাবিকভাবেই রুষ্ট হলো ও কঠোর হাতে দমনের সিদ্ধান্ত নিলো এবং এ কাজে তারা ধর্মকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলো। গীর্জার পুরোহিতরা সমাজের জ্ঞানী, চিন্তাশীল, গবেষক বিজ্ঞানীদের ধর্মবিরোধী আখ্যা দিতে থাকলো। তাদেরকে কেবল নাস্তিকই নয়, ধর্ম অবমাননাকারী খ্রিস্টবিরোধী বলে চিত্রিত করলো। অর্থাৎ অবস্থা এমন দাড়ালো যে, খ্রিস্টবাদ বিরোধিতা তো দূরে থাক, খ্রিস্টবাদের নামে কোন অবাস্তব রসম রেওয়াজ নিয়ে একজন খ্রিস্টান ব্যক্তির মনেও যদি কোন প্রশ্ন বা সংশয় জাগতো, তবে সে একই সাথে ধর্মবিরোধী, দেশদ্রোহী ও রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যেতো।

যা-ই হোক, বিজ্ঞানচর্চার নামে চার্চের প্রতি ক্রমবর্ধমান এ হুমকি পুরোহিতরা সর্বোচ্চ দ্রুততা ও গুরুত্বের সঙ্গে এবং এতটা নৃশংসতার সাথে মোকাবিলা করতে চাইলো-শাস্তির ভয়াবহতা দেখে যেন আর কেউ চার্চ বা পাদ্রীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ও দর্শনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস না পায়। এ লক্ষ্যে ১২২০ সালে রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিক এক নতুন আইন চালু করেন। যাতে বলা হয়, যারা অখ্রিস্টান তারা যদি খ্রিস্টান পাদ্রীদের মতের সাথে ঐকমত্য পোষণ করতে না পারে তবে তারা সমাজবিরোধী। খ্রিস্টান  না হওয়ার জন্য তারা যদি অনুতপ্ত হয় তবে তাদের বন্দি করা হবে মাত্র। আর যারা তাদের স্ব-স্ব ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হবে না, তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হবে। ১২২৩ সালে খ্রিস্টান প্রধান ধর্মযাজক নবম গ্রেগরি অখ্রিস্টানদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা শুরু করেন। দক্ষিণ ফ্রান্সের ধনী জমিদার কাউন্ট তুলোস নিজে ও তার প্রজাসাধারণ ছিল প্যাগান। ইনকুইজিশন অভিযানের আওতায় কাউন্ট তুলোস তার নিজ ধর্মবিশ্বাস পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী তার ওপর বিভৎস ও বর্বরোচিত আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে অখ্রিস্টান নর-নারী ও শিশুসহ সকল বয়সি জনগণকে জঘন্য নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কত আবালবৃদ্ধবনিতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল তার সঠিক হিসেব পাওয়া না গেলেও দেখা যায় একটি গোটা মহাদেশ থেকে প্যাগানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

মাইকেল সার্ভেটুস একজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন। তার সমসময়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে সবিশেষ পরিচিত। তার গবেষণালব্ধ তথ্য খ্রিস্টানদের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তাকে চার্চের রোষানলে পড়তে হয়। যাজকদের নির্দেশে তাকে ১৫৫৩ সালে বন্দি এবং ইনকুইজিশন আদালতের আওতায় বিচার সম্পন্ন হয়। প্রহসনমূলক বিচারে তথা ধর্ম অবমাননার অপরাধে শাস্তি হিসেবে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মাধ্যমে। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক জোরদানোকে একই কারণ ও একই ধর্মীয়গোষ্ঠির অপবাদের কারণে পুড়িয়ে মারা হয় ১৬০০ সালে। ১৬১৯ সালে আরেক বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী লুসিলিও ভানিনি ধর্মযাজকদের দৃষ্টিতে খ্রিস্টবাদে অবিশ্বাসী বলে বিবেচিত হন। অথচ তিনি প্রকৃতপক্ষে বয়োবৃদ্ধ একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। যাজকদের রোষানলে পড়ার কারণে তার জিহ্বা টেনে ছিড়ে ফেলা হয়। এর পরপরই তাকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় লোমহর্ষকভাবে। তৎকালীন ইউরোপীয় বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক মার্লো ওই একই যাজকগোষ্ঠীর বিচারে অপরাধী হওয়ার কারণে তাকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ফ্রান্সিস কেট একজন বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। কর্পাস ক্রিস্টির কারণে তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সেই তাকেও রানি এলিজাবেথের আমলে ধর্ম অবমাননার দায়ে যাজকদের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর একটা গবেষণা সূত্র প্রচলিত বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তাকে অভিযুক্ত করে ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য প্রাণদণ্ড দেয়া হয়। বেচারা গ্যালিলিও ভুল স্বীকার করে মূর্খ, গোড়া ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন যাজকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান। এর ছয় বছর পর গ্যালিলিও ডায়ালগস নামক একটি পুস্তক রচনা করেন। এটি একটি বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ ছিল। ধর্মবিরোধী অপবাদ তুলে এবারও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে পুনরায় তিনি ক্ষমা চেয়ে প্রাণ ভিক্ষা পেলেও আমরণ তাকে নির্বাসিত দেয়া হয়। রাজা অষ্টম হেনরির আমলে ১৫৩৬ সালে ব্রিটেনের উইলিয়াম টাইনডেল তার মাতৃভাষা ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদ করেন। এর ফলে গির্জার পাদ্রীরা খেপে যান। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কালবিলম্ব না করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাদ্রীদের রায় অনুযায়ী প্রথমে তাকে জনসম্মুখে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়, তারপরে তার লাশটাকেও প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এভাবে কুখ্যাত ইনকুইজিশন আদালতের বিচারে লক্ষ লক্ষ খ্যাত অখ্যাত লোককে জীবন দিতে হয়েছে পোপ ও যাজকদের রোষানলে পড়ে। প্লেটোর শিষ্য ও তার রচনাবলির ব্যাখ্যাকার গবেষক, বিখ্যাত নারী গণিতবিদ হাপতিয়াকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে। কেনেথ ওয়াকার স্বীকার করে বলেছেন- একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শুধু মাদ্রিদ শহরেই চার্চের কোপানলে পড়ে তথাকথিত ধর্মবিরোধীতার অজুহাত তুলে তিন লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। জন ড্রেপার বলেনÑ ইনকুইজিশন আদালতে মাধ্যমে ১৪৮১ সাল হতে ১৮০৮ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যারমধ্যে ৩২ হাজার জনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।

ধর্ম ও সমাজের  মধ্যে জন্ম নেয়া বিরোধিতার ফল সম্বন্ধে বিশ্ববিখ্যাত চিন্তাবিদরা বলেন একটা পর্যায়ে এসে জ্ঞানী-গুণীরা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। তাঁরা গীর্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। গীর্জার সাথে যা কিছু সংশ্লিষ্ট ছিল, সবকিছুই তার বর্জন করলেন। গীর্জার ধর্ম, বিশ্বাস, শিক্ষা, গীর্জার বিজ্ঞান অথবা নৈতিক মূল্যমান সব। খ্রিষ্টবাদের বিরুদ্ধে শত্রুতার মাধ্যমে এ কাজ শুরু হলেও পরে সব ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধেই এ বিদ্রোহ পরিচালিত হলো। ইউরোপে ইনকুইজিশন আদালতের মাধ্যমে ধর্মকে ভিত্তি করে অবিশ্বাসীদের বিচার করার নামে গীর্জা ও তার যাজকরা বুদ্ধিজীবী মহলের ওপর যে বর্বর নৃশংসতা চালিয়েছে  তার স্মৃতিও তাজা ছিল গণমানুষের মনে। দীর্ঘ দুইশত বছর ধরে চলে আসা গীর্জার এ নৃশংসতার বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে গণমানুষের মনে ক্ষোভ জমতে থাকে। তার প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপকতা লাভ করে গণআন্দোলন। গীর্জা যেমন তার শাসনক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত নয়, অপরদিকে জ্ঞানী-গুণী ও শিক্ষিত শ্রেণি এবং সমাজ সচেতন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গও গির্জার যাজকশ্রেণির হাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ গির্জার যাজকরা যেসব অদ্ভুত তত্ত্ব ধর্মের নামে চালিয়ে আসছিল, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সেসব তখন ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে অনিবার্যভাবেই সমগ্র ইউরোপজুড়ে ধর্ম ও বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা পরস্পর সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। সমাজের নানা সূক্ষ্ম ও জটিল সমীকরণ স্বত্তেও পুরো ইউরোপ ধর্মের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এভাবে খ্রিস্টবাদ নিয়ে প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে চলা পক্ষ-বিপক্ষ সংঘাতের দীর্ঘ পথপরিক্রমার একপর্যায়ে এসে উৎপত্তি ঘটে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের।

লেখক : প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy