
X
বাঙালি, বাঙালিত্বের নির্যাসে যুক্ত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অমোঘ উচ্চারণ ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।’ এই উচ্চারণের সঙ্গে তিনি বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় বাঙালিকে উজ্জীবিত করে বাঙালিত্বের গৌরবকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই সময়ে তাঁর মৃত্যু বিশ্বজোড়া বাঙালির সামনে শুধু শোকের দিন নয়, গৌরব এবং মর্যাদার জায়গা থেকে তিনি বাঙালির সামনে মৃত্যুহীন মানুষ।
শোকের মাস যেন একটি কালো গোলাপ। এই মাসকে নিয়েই সৌরভ এবং রঙের সঙ্গে এক হয় গৌরব ও বেদনার ধারণা। গৌরব স্বাধীনতার মতো বড় অর্জন। আর শোক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়া। জীবন-মৃত্যুর দুই গভীর জায়গায় তিনি আমাদের সামনে দাঁড়ানো অবিনাশী মানুষ। মৃত্যুর অবধারিত সত্য মেনে নিয়ে তিনি আমাদের সামনে অমরত্বের সাধনা।
এ দুটি সত্যকে এক করে আগস্ট মাস প্রবলভাবে অর্থবহ। তিনি ছিলেন বলে আমরা স্বাধীনতার মতো বড় অর্জন পেয়েছি। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে নিজ অবস্থান তৈরি করেছে। তাঁকে সামনে রেখে চলছে পথচলা। খুঁজে নেয়া হচ্ছে দিক-নির্দেশনা। তিনি আছেন সহায়ক শক্তি হিসেবে গণমানুষের চেতনায় প্রদীপ্ত আলো। গণমানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় জাগরণের গান।
ছড়িয়ে আছে তাঁর আদর্শ ও স্বপ্ন। দুঃখী মানুষের জীবন বদলানোর জন্য তাঁর অন্তহীন প্রেরণা, আজকের বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতির জন্য শোক কোনো শেষ কথা নয়। শোক যে শক্তির উৎস হয়, বাংলাদেশ তার প্রমাণ। এ দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। প্রত্যাশা করা যায় নিকট ভবিষ্যতে বাকি রায়ও কার্যকর হবে। তাঁর মৃত্যুর পর এ দেশে মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে। তারা চেয়েছিল দেশটিকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দিতে।
কিন্তু সেটা হয়নি। শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে দেশের মানুষ। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ মানুষের প্রকৃত আবাসস্থল হোক এটাই সবার প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার জয়গানে মুখরিত আজ শোকের মাস। তাঁর বক্তৃতার বাণী নিজেদের কণ্ঠে তুলে বলতে হবে, ‘বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন, তাঁরা সকলেই এ দেশের নাগরিক। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সমঅধিকার ভোগ করবেন।’
বঙ্গবন্ধুর এই বাণী পৌঁছে যাক প্রত্যেকের চেতনায়। যেন কোনো ভুল আচরণ লোক এবং শক্তির বাংলাদেশকে কলঙ্কিত না করে। মানুষের মর্যাদায় প্রদীপ্ত থাকুক তাঁর অবিনশ্বর চেতনা।
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতিসচেতন ব্যক্তিত্ব অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৯৬ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। হোটেল শেরাটনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে শাহরিয়ার ইকবাল এবং আরও দু-একজন প্রযোজক উপস্থিত ছিলেন। শাহরিয়ার আমাকে আকস্মিকভাবে বললেন, যাঁকে সাক্ষাৎকারটি নিতে বলেছিলাম তিনি নিতে পারছেন না। আপনি সাক্ষাৎকারটি নিন। আমি হতবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুশিও হলাম। যা হোক শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারটি আমার নিতে হলো। প্রসঙ্গ উঠল তাঁর বিখ্যাত এবং মুখে মুখে উচ্চারিত দুটি অমর পঙক্তি নিয়েÑ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান,/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন পরিপ্রেক্ষিতে আপনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন? তিনি বললেন, ‘কবিতাটি আমি একাত্তর সালে লিখি। সে সময় একবার গুজবের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল যে পাকিস্তানের কারাগারে মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে। খবরটা শোনার পর আমার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিক্রিয়াটি হয়। পরে তাঁর বেঁচে থাকার খবর পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।’ তারপর প্রায় এক শ বছর বয়সের কাছাকাছি সেই মানুষটি সরল অনাবিল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘মুজিবের মৃত্যু কি সহজ কথা?’ অন্নদাশঙ্কর রায় গভীর প্রত্যয় নিয়ে গাঢ় স্বরে এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন। এত বছর পরও তাঁর কণ্ঠ আমার কানে বাজে। না, শুধু আগস্ট মাস এলেই নয়, তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাই যখন-তখন। ভাবি, ঠিকই বলেছিলেন তিনি। মুজিবের মৃত্যু সহজ কথা নয়। পুরো কবিতাটি এমনÑ ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/রক্তগঙ্গা বহমান/তবু নাই ভয় হবে হবে জয়/জয় মুজিবুর রহমান।’
সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেমের একটি প্রবন্ধের নাম ‘শেখের সমসাময়িক’। প্রবন্ধটি তাঁর ‘অশ্লেষার রাক্ষসী বেলায় : স্মৃতিপটে শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখেছেনÑ “জীবদ্দশায় মুজিব বিশালদেহী কলোসাসের মতো আমাদের সঙ্কীর্ণ পৃথিবীজুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে। অপমৃত্যুর পর তাঁর অশান্ত আত্মা আমাদের মন ও মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, বিবেককে করছে বিচলিত। তাঁর পুণ্য রক্তের ঋণ, রক্ত দিয়েই শুধতে হবে, এর কোনো ব্যতিক্রম সম্ভব নয়। আত্মসম্মান-সম্পন্ন জাতির পক্ষে আর কোনো পথ খোলা নেই। কারণ, রফিক আজাদের ভাষায়, ‘স্বদেশের মানচিত্রজুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর’।” সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম এই প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এমন একটি বাক্য দিয়েÑ ‘সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, শেখ মুজিবের নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায়, সেই দরজা দিয়ে আমরা আমাদের নিয়তির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছি।’
যে মানুষের নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায়, সেই মৃত্যুহীন মানুষের সঙ্গেই তো আমরা ইতিহাসের দীর্ঘ সড়কে হেঁটে যাব। স্বদেশের মানচিত্রজুড়ে বিছিয়ে থাকা তাঁর বিশাল শরীর আমাদের জীবনে বটের ছায়া। এই ছায়া থেকে আমরা দূরে যেতে পারব না। শুধু আমরা চাই আমাদের পথের দুই পাশে অবিস্মরণীয় আলো থাকুক, যে আলোয় ফুটে থাকবে পথ, পথের ধারের উজ্জ্বল বুনোফুল এবং আমাদের ইতিহাসের খুলে যাওয়া নতুন দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে নতুন আলো। আমরাও গগণবিদারী কণ্ঠে চিৎকার করে বলব, মুজিবের মৃত্যু সহজ কথা হয়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
বাবু/এ.এস