মার্কিন ভিসানীতি ও বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

মতামত

গত ৩ মে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রেও

2023-08-02T15:07:18+00:00
2023-08-02T15:07:18+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
মার্কিন ভিসানীতি ও বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
প্রকাশ: বুধবার, ২ আগস্ট, ২০২৩, ৩:০৭ পিএম   (ভিজিট : ১৭৫)
X


গত ৩ মে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এই নীতি অনুযায়ী, ভোটের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কোনো বাংলাদেশিকে ভিসা দেবে না দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বাংলাদেশের বিষয়ে নতুন এ ভিসানীতি ঘোষণা করেছিলেন। এতে বলা হয়েছিল, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের লক্ষ্যকে সমর্থন করার জন্য অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ধারা ২১২ (এ) (৩) (সি)এর অধীনে একটি নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এই নীতির অধীনে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করার জন্য কোনো ব্যক্তিকে দায়ী বা জড়িত মনে করলে ওই ব্যক্তির ভিসা প্রদান সীমিত করবে। এর মধ্যে বর্তমান ও প্রাক্তন বাংলাদেশি কর্মকর্তা, সরকার সমর্থক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ঘোষণায় আরও বলা হয়Ñ গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এমন কাজের মধ্যে রয়েছে ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো, সহিংসতা, লোকজনকে তাদের সংগঠনের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত রাখা এবং রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিরোধ করা বা গণমাধ্যমে তাদের মতামত প্রচারে বাধা প্রদান করা।

উক্ত ভিসানীতি ঘোষণার পর থেকে বিএনপি-জামায়াত এই ভিসানীতির অপব্যবহার করে মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি বিএনপি-জামায়াতের অনুকূলে কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসীন হতে পারবে মনে করে বিএনপি-জামায়াত প্রথমে অনেক খুশি হয়েছিল। কিন্তু যখনই তারা অনুধাবন করতে পারল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ভিসানীতি বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে গঠিত স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সংঘটনে অনেক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তখন থেকে বিএনপি-জামায়াত তাদের আসল রূপ দেখানো শুরু করে দিল জ্বালাও-পোড়াওর মাধ্যমে। কারণ তারা বুঝতে পারলÑ এই ভিসানীতি তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে কোনোভাবেই সহায়ক হবে না।

বিএনপি-জামায়াতরে অতীত ইতিহাসের রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশ্লেষণ কওে দেখা যায় ৬ মার্চ ২০১৩ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে দলীয় নেতাকর্মীরা পরপর ছয়টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এর প্রতিবাদে ৭ মার্চ সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল দলটি। পরে পুলিশ ওই ককটেল নিক্ষেপকারীদেও গ্রেপ্তার করে। তদন্তে দেখা যায়Ñ হরতালের ইস্যু সৃষ্টির জন্যই ওই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এরপরও দলের নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ১৮ ও ১৯ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালন করে ১৮ দলীয় জোট। ঠিক ওই বছর ফেব্রুয়ারির দিকে তাকালে দেখা যায়Ñ মানবতাবিরোধী অপরাধে রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল ২৮ তারিখ ফাঁসি দিলে ওইদিন সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে জামায়াত। সারাদেশে সহিংসতা চালায় জামায়াত-শিবির। একই সঙ্গে এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে ৩ ও ৪ মার্চ দেশে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডাকে দলটি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এর ঠিক পরের দিন ৫ মার্চ মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকেন। বিএনপির ডাকা হরতালে সমর্থন দেয় জামায়াত। এভাবে ২০১৩ সালেই ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১৫ দিন হরতালে কেটেছে। এর কোনোটা দেশব্যাপী, কোনোটা নির্দিষ্ট অঞ্চলজুড়ে।

প্রতিবেদনে এও বলা হয়Ñ বিরোধী দল বিএনপির যথেষ্ট জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও গত দীর্ঘদিন যাবৎ টানা অবরোধ বা পেট্রোলবোমা-হামলার জেওে সেই জনপ্রিয়তায় ধীরে ধীরে ভাটা পড়েছে। সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে ক্লান্ত, বিরক্ত হয়ে পড়েছেন বলেই তাদের ধারণা। উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী জোর করে কাউকে হরতাল পালনে বাধ্য করা, ভাঙচুর করা, মারামারি করা ইত্যাদি প্রচলিত আইনেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য রয়েছে। দণ্ড-বিধিসহ অন্যান্য আইনে ওইসব অপরাধের শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে বিএনপি হরতাল ডেকে মাঠে থাকুক বা না থাকুক। আড়াল থেকে জামায়াতের হরতালকে সফল করার জন্য চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে সরকার পতন ঘটাতে পারলেই যুদ্ধপরাধীদের বিচার বানচাল করা সম্ভব বলে মনে করছিল দলটি। এখন পর্যন্ত সহিংসতা সৃষ্টি করতে গিয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের  বেশিরভাগই জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মী। প্রকাশ্যে বিভিন্ন পন্থায় পেট্রোলবোমা তৈরি, বোমা তৈরি করার এবং নাশকতার জন্য বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করছে জামায়ত শিবিরের কর্মীরা। বিগত ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের হরতাল অবরোধের কারণগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে বিএনপি আন্দোলনের জন্য নতুন নতুন ইস্যু সৃষ্টি করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত নিজেদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে মার্কিন ভিসানীতিকে তোয়াক্কা না করে ইদানিং মানুষ হত্যা, বাস  পোড়ানো, গাড়ি ভাঙচুর, মারামারি এবং সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে ভয় দেখানো এবং  নির্বাচন প্রক্রিয়া বানচাল করতে কোমড় বেঁধে নেমেছে। মার্কিন ভিসানীতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সহিংসতা সৃষ্টিকারী এবং ভোটারদের মনে আতংক সৃষ্টিকারী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তা যে দলেরই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন ভিসানীতি কার্যকর হবে। বিএনপি এই ভিসানীতিতে উল্লেখিত সবধরনের নীতিকেই ভঙ্গ করে যাচ্ছে তাদের সহিংস কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত। গণতন্ত্র ও জনসমর্থনে বিশ্বাসী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার ও অবস্থানকে যাতে কেউ জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য মার্কিন সরকারের ভিসানীতি আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টাকে অনেক সাহায্য করবে বলে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তাতে ফাটল ধরিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের এমন জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন এবং সহিংসতা। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হতে বিএনপি-জামায়াতের এমন জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার ও জননেত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই স্বাধীনতার মহান শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে দীর্ঘ ১৪ বছরের ও অধিক সময় ধওে যে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তার ধারাবাহিকতা বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের দ্বারা কখনোই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।

এমতাবস্থায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সংঘটনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাদের ঘোষিত মার্কিন ভিসানীতির সঠিক বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ সরকারকে গণতন্ত্র চর্চাকে অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের উচিত জনদুর্ভোগ হবে এমন সকল কাজ থেকে বিরত থেকে জনসমর্থন আদায়ে মনোনিবেশ করা। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের উচিত সবধরনের জ্বালাও-পোড়াও হতে বিরত  থেকে গণতন্ত্রের চর্চা এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা।

লেখক : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy