
X
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড শুধু দেশীয় ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল না; এর সাথে জড়িত ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র; যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, বিশেষ করে হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বড় পরাজয়, ভুট্টো ও পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের জন্য চপেটাঘাত। তারা এ পরাজয়ের প্রতিশোধের অপেক্ষায় ছিলেন। তখন চলছিল স্নায়ুযুদ্ধ, বিশ্ব ছিল দুইভাগে বিভক্ত। একভাগে ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লক। আরেকভাগে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক। বাংলাদেশ ছিল জোটনিরপেক্ষ গ্রুপে, তবে সোভিয়েতঘেঁষা। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অনন্য। ভারতও ছিল সোভিয়েতঘেঁষা। দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বামদের একচ্ছত্র প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য ছিল না। এজন্য মার্কিন প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর ওপর ছিলো চরম ক্ষ্যাপা। বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করতে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীর মধ্যেও ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। তারা ১৯৭২ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান তাঁর ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন মেজর ফারুক, রশিদ ১৯৭২ সাল থেকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সাথে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের অগোচরে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে যান অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা করতে। ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই সরকারকে না জানিয়ে মেজর ফারুকের ভায়রা ভাই মেজর আবদুর রশিদ অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে যান। বিগ্রেডিয়ার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির পক্ষে সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয় নিয়ে কথা বলতে তাকে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ১৯৭৪ সালের ১৩ মে মেজর ফারুক মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে সরাসরি শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে উৎখাত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চান। একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বলে বেড়ায়, বাকশাল গঠন ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র। তাই যদি হয়, তাহলে ঘাতকরা ১৯৭২, ৭৩, ৭৪ সালে কেন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে তাদের সহযোগিতা প্রার্থনা করল? তখন তো বাকশাল ছিল না।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সিআইএ জড়িত ছিল। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর প্রণীত গ্রন্থ ‘Bangladesh : The Unfinished Revolution’ এ শেখ মুজিব হত্যায় সিআইএ এর জড়িত থাকার কথা বলেন। মার্কিন আরেক সাংবাদিক ক্রিস্টোফার এরিক হিচেন্স তাঁর ‘The Trial of Henry Kissinger’ গ্রন্থে লরেন্স লিফশুলজের বরাত দিয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডে সিআইএ এর জড়িত থাকার বিষয়টি সমর্থন করেন। তিনি তাঁর এ গ্রন্থে নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে বসেই ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাও (Go ahead) সিগনাল দেন। এছাড়া তিনি কিসিঞ্জারকে একজন অসাধারণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন এক বিচিত্র মিথ্যাবাদী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ২০০১ সালের মার্চে ‘হারপারস’ নামক এক ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ লিখেন। তাতে তিনি লিখেছেন, “বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, কিসিঞ্জার রাজনীতির বিষয়টাকে একটি নিতান্ত ‘ব্যক্তিগত’ ব্যাপার হিসেবে গ্রহণের প্রবণতা দেখিয়েছেন। তাঁর কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে। তাঁর জন্য অসুবিধাজনক কতিপয় ব্যক্তির কথাও আমরা জানি। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সালভাদর আলেন্দে, আর্চ বিশপ ম্যাকারিওস ও শেখ মুজিবুর রহমান।” হ্যারল্ড স্যান্ডার্স ছিলেন দূরপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট ওয়াশিংটনের সময় সন্ধ্যা ৬টা ১১ মিনিটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। স্যান্ডার্স কিসিঞ্জারকে বলেন, “ঢাকা থেকে একটা বার্তা পেলাম। ঢাকার মোশতাক সরকার আমাদের স্বীকৃতি ও নৈতিক সমর্থন চাইছে। আমরা কি একটা বন্ধুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারি?” জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, “আমরা মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পেরে ধন্য মনে করছি। বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে বার্তা পৌঁছে দাও, যাতে তারা ভরসা পায় যে, আমরা তাদের চাহিদার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকব।” কিসিঞ্জারের এ বক্তব্য হতে ধারণা করা যায় যে, মার্কিন প্রশাসন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল।
এছাড়া বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ থেকে যতটুকু জানা যায় তা থেকে বুঝা যায় যে, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ লে. কর্নেল আবু তাহের হত্যা মামলায় বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চে যে বিবৃতি দেন তাতে তিনি বলেন যে, শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের ‘Bangladesh : A Legacy of Blood’ গ্রন্থ থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, জিয়াউর রহমান আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখ্য ব্যক্তিদের অন্যতম। তিনি ইচ্ছা করলে অভ্যুত্থান বন্ধ করতে পারতেন। কারণ তিনি এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আগেই অবহিত ছিলেন। বিবিসির সৈয়দ মাহমুদ আলি তাঁর ‘ÔUnderstanding Bangladesh’ গ্রন্থে বলেন, “মূল ষড়যন্ত্রকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একমাত্র আর্মাড রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব কামনা করেন। জিয়া তাতে অসম্মত হন। কিন্তু মেজরদের প্রতিহত করার কথা বলেননি। তিনি তাঁর অধীনস্থ বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহারেও সচেষ্ট হননি। যদিও তিনি নিজে আগে থেকে বিষয়টি জানতেন।” জিয়াউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত। তার কাছে যখন দেশের একজন প্রেসিডেন্টকে হত্যার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করে, তখনই তার দায়িত্ব ছিল তাদেরকে গ্রেফতার করে পুলিশে সোর্পদ করা। তা না করা কি রাষ্ট্রদ্রোহী ও ফৌজদারি অপরাধ নয়? বরং তিনি তা না করে, তাদেরকে উৎসাহিত করেন। এ প্রসঙ্গে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের একটি লেখার অংশবিশেষ তুলে ধরছি। আর তা হলো, “শুরুতেই হত্যাকারীদের দু’জন মূল পাষণ্ড কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদ একটি বৃটিশ টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার প্রদান করে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন লন্ডনের ‘ÔDaily Observer’ পত্রিকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাস। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারকালে এ দু’জন ব্যক্ত করে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা পরিকল্পনাকালে তারা সে সময়ের উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের কাছে গিয়ে হত্যার পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করলে জিয়া তাদের এগিয়ে যেতে বলেন এবং তাদের উৎসাহিত করে বলেন, তারা সফল হলে জিয়া তাদের সঙ্গে থাকবেন। এ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ও বাইরে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ অনুষ্ঠানের ধারণকৃত ভিডিও হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়।” (এএইচএম শামসুদ্দিন চোধুরী মানিক, জিয়াই ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল হোতা, কলাম, চতুরঙ্গ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা, ১৫ আগস্ট, ২০১৮)। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের ৪৪ নং সাক্ষী হিসেবে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সাফায়েত জামিল বলেন, “বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত ইউনিফর্ম পরে মেজর হাফিজসহ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের দিকে রওয়ানা দেই। পথিমধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় যাই এবং তাকে শেভরত অবস্থায় পাই। আমার নিকট হতে ঘটনা শোনার পর তিনি (জিয়া) বললেন, So what? President is killed, Vice president is there, uphold the constitution (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, মোহাম্মদ শাহজাহান কর্তৃক অনূদিত, বাংলাদেশ : রক্তের ঋণ, হাক্কানী পাবলিশার্স, ঢাকা, সেপ্টেম্বর, ২০১৪ পৃ ৯৩ এবং এএইচএম শামসুদ্দিন চোধুরী মানিক, জিয়াই ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল হোতা, কলাম, চতুরঙ্গ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা, ১৫ আগস্ট, ২০১৮)। এরপর কর্নেল জামিল মেজর হাফিজকে নিয়ে জেনারেল শফিউল্লাহর কাছে যান এবং তাকে বলেন, Sir, don't trust your deputy, he is behind all these things (এ এইচ এম শামসুদ্দিন চোধুরী মানিক, জিয়াই ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূলহোতা, কলাম, চতুরঙ্গ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা, ১৫ আগস্ট, ২০১৮)। জিয়াউর রহমান সম্পর্কে ঘাতক কর্নেল রশিদ বলেন, “জেনারেল জিয়া আমাকে বলতেন, রশিদ ঘাবড়িও না। যদি কিছু ঘটে, তবে তা আমার মৃত দেহের উপর দিয়েই ঘটবে। আমার বিশ্বাস হয়, তিনি একজন কাপুরুষ অথবা অত্যন্ত চালাক লোক। তিনি ধারণা করে থাকতে পারেন যে, আমরা একে অন্যকে খতম করব, আর তিনি সেই সুবিধাটা ভোগ করবেন।” (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, মোহাম্মদ শাহজাহান কর্তৃক অনূদিত), বাংলাদেশ : রক্তের ঋণ, হাক্কানী পাবলিশার্স, ঢাকা, সেপ্টেম্বর, ২০১৪ পৃ ১২১)।
প্রবাদে আছে, অতিভক্তি চোরের লক্ষণ। খন্দকার মোস্তাক আহমদ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ১৯৭৫ সালের ৩০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে দাফন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বহু সামরিক-বেসামরিক অফিসার ও গণ্যমান্য ব্যক্তি লাশ দাফনের কাজে অংশ নিতে বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। খন্দকার মোস্তাক আহমদও সে কাজে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। কেননা, সে সময় তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটে বাণিজ্যমন্ত্রী। শেখ লুৎফর রহমানের লাশ দাফনের উদ্দেশ্যে যখন কবরে নামানো হয়, তখন খন্দকার মোস্তাক আহমদ কবরে নেমে এমন অঝোর ধারায় কান্নাকাটি শুরু করেন এবং বলতে থাকেন যে, তাকেও যেন শেখ লুৎফর রহমানের লাশের সাথে দাফন করা হয়। তিনি কবর থেকে আর উঠেন না। কারও অনুরোধেই যখন তিনি কবর থেকে উঠেন না, তখন বঙ্গবন্ধু তাকে ধমকের সুরে বলেন, “ঐ মোস্তাক, বাপ মরেছে আমার, তুই এমন পাগলামি করছিস কেন? কবর থেকে উঠ, দাফনের কাজ সম্পূর্ণ করতে দে।” (রেজাউল করিম, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অভিন্ন সত্তা, গ্রন্থকুটির প্রকাশনা।) অথচ এ লোক তখন গোপনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর হত্যাকারীরা অবৈধভাবে তাকে রাষ্ট্রপতি বানায়। আর রাষ্ট্রপতি হয়ে তিনি হত্যাকারীদের দায়মুক্তি ঘোষণা করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতা (তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান)কে হত্যার অনুমতি দেন (৩ নভেম্বর, ১৯৭৫)।
১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ‘Bangladesh Execution : A Discrepancy’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। এতে তথ্য দেয়া হয় যে, আগের বছরের ২ অক্টোবর এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ঘটনায় ২১৭ জনের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আলফ-ই-বার্গেসেন এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে একটি গোপন বার্তা পাঠান। কিন্তু পররাষ্ট্র দফতরের সূত্র এটি মিডিয়ায় ফাঁস করে দেয়। এ বার্তা থেকে জানা যায় যে, ২১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তার মধ্যে প্রায় ৩০-৩৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পূর্বেই। এ গণপ্রাণদণ্ডের চার মাস পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংগঠন ‘ÔHuman Rights Watch’ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। ১৯৭৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে ‘বাংলাদেশ টাইমস’ পত্রিকায় শিরোনাম দিয়ে মানবাধিকারের এ তথ্য প্রকাশ করে। ১৯৭৮ সালের ২৫ মার্চ এন এম জে ছদ্মনামে লিফশুলজ ‘Economic and Political Weekly’ পত্রিকায় Murder in Dacca : Ziaur Rahman’s Second Round শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন যেখানে বাংলাদেশের এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লিফশুলজ আরও লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৬ সালের বৈদেশিক নিরাপত্তা সহায়ক আইন যা ৫০২-বি হিসেবে পরিচিত, তাতে একটি সংশোধনী আনা হয়। এর আওতায় বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যার পরই হত্যাকারীরা যেভাবে সহজে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে আশ্রয় পেলো তাতে প্রমাণিত হয় যুক্তরাষ্ট্র এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিলো।
যে সমস্ত শাসক আমেরিকার আজ্ঞাবহ হবে না, তাদের স্বার্থে কাজ করবে না এ রকম জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক শাসককে উৎখাত করতে, হত্যা করতে বা করাতে, হত্যার প্ররোচনা দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করেনি। চিলির আলেন্দে, ঘানার ড. কাউয়ামে নক্রুমা, গুয়াতেমালার জ্যাকোবা অরবেঞ্জ, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুলুম্বা, নাইজেরিয়ার আবু বকর তাওয়াফা বলেওয়া, ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ণ, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান, ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফি প্রমুখকে তারা হত্যা করতে এবং করাতে বা উৎখাত করতে দ্বিধা করেনি। কারণ তাঁরা ছিলেন বাম ঘরানার শাসক। আমেরিকা শুধু কিউবার ফিডেল কাস্ত্রোকে হত্যা করতে পারেনি। তবে তাঁকে হত্যা করতে কম চেষ্টা করেনি, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য চীনপন্থি বামপন্থি দল যেমন মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে কম্যুনিস্ট পার্টি, আবদুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টি (মা-লে), সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি এবং জাসদ কম দায়ী নয়। এরা কৃষক শ্রমিকের রাজত্ব কায়েমের লক্ষ্যে দেশে হত্যা-খুন, ডাকাতি, লুটতরাজ শুরু করে দেয়, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটায়। দক্ষিণপন্থিদের মতো এরাও ছিল চরম ভারতবিরোধী। বঙ্গবন্ধুকে অজনপ্রিয় করতে এবং তাঁকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যা যা দরকার তাই তারা করেছিল। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে জাসদ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করে ‘বিপ্লবী গণবাহিনী’ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। লে. কর্নেল তাহের হলেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রধান। জাসদের পক্ষ থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্বে ছিলেন হাসানুল হক ইনু। ক্যান্টনমেন্টে গোপনে গঠিত হতে লাগল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ইউনিট। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন জাসদ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালে যোগদানের প্রস্তাব করলে তিনি এ প্রস্তাবকে আমলে নেননি। তখন ক্ষিপ্ত হয়ে জাসদ নেতৃত্ব সেনাবাহিনীর কিছু বিক্ষুদ্ধ তরুণ অফিসারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। জাসদ নেতৃবৃন্দ তাদের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলে ‘বিপ্লবী ফোরাম’। এখানে সেখানে এ ফোরামের ঘন ঘন বৈঠক বসতে থাকে। গুলশানের এক বাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করতে এক অভ্যুত্থানের নীলনকশা প্রণয়ন করে। সর্বহারা পার্টি সচিবালয়ে যাওয়া-আসার পথে বোমা মেরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়েছিল।
সেনাবাহিনীর যেসব বিপথগামী সদস্য পৈশাচিক এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের অন্যতম হলেন লেঃ কর্নেল ফারুক, মেজর রশিদ, মেজর ডালিম, মেজর বজলুল হুদা, মেজর নুর চৌধুরী, মেজর আজিজ পাশা, মেজর মহিউদ্দিন, মেজর রাশেদ চৌধুরী, লে. খায়রুজ্জামান, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন প্রমুখ। এ হত্যাকাণ্ড ছিলো একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে তারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন, বিচার থেকে তাদেরকে দায়মুক্তি (Indemnity) দেন। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের বিচার বন্ধ করতে খন্দকার মোশতাক দায়মুক্তি (Indemnity) অধ্যাদেশ জারি করে। আর জিয়াউর রহমান সে অধ্যাদেশকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি রূপ দেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। খন্দকার মোশতাক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জেলহত্যার তদন্তের জন্য তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে সে কমিটি বাতিল করে দেন। খন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এরা সবাই ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন, পদোন্নতি দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর
বাবু/এ.এস