
X
যেকোনো জাতির জন্য তরুণ সমাজই হচ্ছে সকল ক্ষেত্রে উন্নতির প্রধান ভিত্তি। কোন দেশের তরুণ সমাজের ভিতর দেশাত্ববোধ ও নৈতিক বোধগম্যতার প্রাবল্য থাকলেই সে দেশের সকল ক্ষেত্রে উন্নতি ত্বরান্বিত হতে পারে। কিউবার একটি প্রবাদ প্রচলিত। The new pleases and the old satisfies নতুন দেয় আনন্দ আর পুরাতনে হয় তৃপ্তি। সচরাচার নতুন বলতে আমরা তরুণদেরই বুঝে থাকি। তরুণরাই আগামীর আশা-ভরসা। তারাই আমাদের স্বপ্ন দেখায়।
চীন বিপ্লবের পিতৃপুরুষ চেয়ারম্যান মাও সে তুং-এর একটা কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, In the final analysis, the world belongs to the youth চূড়ান্ত বিশ্লেষণ বিশ্ব হচ্ছে তরুণদের। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এর সত্যতা দেখতে পাব। দেখতে পাব অতীতে সকল দিগ্বিজয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরাই। আলেকজান্ডার যখন মিশর-ব্যবিলন-ইরান পদনত করে ভারতে দিগ্বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন তখন তার বয়স কত ছিল? ৩০-৩২ বছরের বেশি নয়। মুহাম্মদ বিন কাশিম যখন সিন্ধু জয় করেন তখন তিনি ১৮-২০ বছরের তরুণ।মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর যখন জন্মভূমি ফারগানের সিংহাসনে বসেন তখন তিনি ছিলেন কিশোর বালক। তেমনি ছিলেন মহামতি আকবর। তরুণদের শক্তি ও ভাল ভূমিকাই সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করতে পারে। তারা পথ হারিয়ে ফেললে সমাজ বিপন্ন হয়ে পড়ে, সমগ্র জাতি হতাশ হয়ে পড়ে, তরুণরা সমাজ, পরিবেশ ও রাষ্ট্র নিয়ে মহৎ স্বপ্ন দেখার ধারায় শামিল না হতে পারলে দুশ্চিন্তা তাদের মস্তিষ্কে পরিসর তৈরি করতে সুযোগ পেয়ে যায়।
অশ্লীল সিনেমা, নেশাদ্রবের হাতছানি, ক্ষমতা, অবৈধ অর্থ উপার্জনের লোভসহ বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা বর্তমান সমাজে যেভাবে জাল পেতে রেখেছে সেই জালের ফাঁদে পড়া থেকে নিরাপদে থাকতে পারা এখন অনেক কঠিন ব্যাপার। আমরা বেশি পরিমাণে স্বার্থচর্চা করতে গিয়ে আদর্শের রূপ-অবয়বকে সম্পূর্ণ মলিন করে দিয়েছি, যার কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে সমুজ্জ্বল কোনো আদর্শই রূপ-যৌবন নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই তারা তাদের চিত্তকে কোনো সৃজনশীল চর্চা দিয়ে প্রশান্তি দিবে সেই ধারাও খুঁজে পাচ্ছে না। যার ফলে তরুণরা হতাশ হয়েই অর্থ ও ক্ষমতার পিছনে পঙ্গপালের মত ছুটছে এবং নানান অবৈধ ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে।
সারাবিশ্বে তরুণ সমাজের মাঝে মাদকাসক্তদের সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণে মনে হয় মানুষ প্রযুক্তির উৎকৃষ্ট সাধনের মাঝেই একসময় আদিমত্বে ফিরে যাবে। বাংলাদেশের সরকারি হিসাব মতে মাদকমক্তদের সংখ্যা ৫০ লাখ। আর বেসরকারি হিসাব মতে, ৭০ লাখেরও বেশি। এদের বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী। মাদক গ্রহণকারীর ৮০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিশ্বের নেশাগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ঢাকা শহরে শুধু ১০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। এটা যদি পরিসংখ্যান ব্যুরোর অনুপাতে বের করা হয়, তাহলে মানুষ আঁতকে উঠার কথা। তার মানে ৬৮ হাজার গ্রামে গড়ে ১০৭ জন করে মাদকসেবী রয়েছে।
এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামে ৩২ ধরণের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ দল মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার দিয়ে সারাদেশে সুকৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াবা। ভারত, নেপাল ও তিব্বত অঞ্চল নিয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বাংলাদেশকে ঘিরে ফেলেছে।ফলে এ দেশে যত্রতত্র মিলছে গাজা, ভাঙ, আফিম, তাড়ি, মদ, ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, বুপ্রেরনফিন, পেথেডিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সিসা, আইস, ইত্যাদি।
মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দেশে কমপক্ষে ৬৫ লাখ মানুষ সরাসরি মাদকাসক্ত। তাদের ৮৭ শতাংশ পুরুষ যার ১৩ শতাংশ নারী। এদের সিংহভাগ তরুণ- তরুণী। ৬০ শতাংশ মাদকাসক্ত মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে কোনো না কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার হাসিব মালোশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। সে দেশে ফিরে বাজার থেকে কাশির ঔষধ সংগ্রহ করে। এরপর সেখান থেকে বিশেষ উপায়ে ওই রাসায়নিক উপাদান বের করে আইস তৈরি করে। ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হওয়া রোহিত মালোশিয়ার পড়া লেখা করে দেশে ফিরে বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করত, রুবায়েত লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া লেখা শেষ করে দেশে এসে মরণঘাতী মাদক আইসে আসক্ত হয়ে পড়ে। টেকনাফে ২ লাখ মানুষের মাঝে ৮০ হাজার মানুষ কোন না কোনভাবে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত।
ইদানিং তরুণ সমাজ বইপড়া, সাহিত্য সুস্থ বিনোদন চর্চা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। কেউ গেমে আসক্ত, কেউবা ফেসবুকে আবার কেউ পর্নোগ্রাফিতে। ওই আসক্তির বিষয়টি সারাবিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ মনোস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য মতে, বাংলাদেশের প্রায় ১১ কোটি ২৭ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহকদের মধ্যে ১০ কোটি ৩২ লাখ ব্যবহারকারী মুঠোফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত। যার মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৫ শতাংশ। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত।
ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ অনলাইনে বিপদের মুখে রয়েছে। এই সংস্থার তথ্যানুসারে বিশ্বে প্রতিদিন তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। আর প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হচ্ছে। গেম আসক্তি মাদকের চেয়ে সর্বনাশা খেলা। এই খেলার মাধ্যমে সমাজে বাড়ছে মারামারি খুনোখুনি। মনোবিজ্ঞানীরা ভিডিও গেমে আসক্তিকে বলছে ডিজিটাল মাদক। দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় গেম হলো ফ্রি ফায়ার, পাবজি এবং ব্লু হোয়েল। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এসব গেম জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সাথেসাথে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন শুধু পাবজি গেম খেলে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। যার সিংহভাগ তরুণ প্রজন্ম। এই গেমের মাধ্যমে একে অন্যকে হত্যাকরা, ভয়ংকর গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যার ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা ইত্যাদি করা হয়। অন্যদিকে চিনের ফ্রি ফায়ার গেম তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়। এসব ভিডিও গেমসের জনপ্রিয়তার ফলে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম চরমভাবে বিপদগামী হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং-কালচার। বিশেষ করে করোনা মহামারীর ফলে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নিতে বাধ্য হয়। আর এই কারণে অভিভাবকরা তার সন্তাদের হাতে ল্যাপটপ, মোবাইল ডিভাইস তুলে দেয়। এই সুযোগে উঠতি তরুণ প্রজন্ম জড়িয়ে পড়ে গেম, ফেসবুক, টুইটার, টিকটক, লাইকি কিংবা পর্নোগ্রাফিতে। ভারতের এইচ ওডি সাইক্রিয়াট্রিক অ্যান্ড চিফ ন্যাশনাল ড্রাগ ডিপেন্ডেন্স ট্রিটমেন্ট সেন্টারের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কিশোর ও যুবকদের মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে আসক্তি বাড়ছে। আইএএনএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবিক সমস্যার প্রাথমিক উপসর্গ হচ্ছে অন্য শিশুদের সাথে মেলামেশা ও কথাবার্তা বন্ধ করে দেওয়া ও পরিবারের সদস্যদের সাথে দূরত্ব তৈরি করা। চিকিৎসকদের মতে, মোবাইল আসক্তির ফলে ভ্রণের কোয়ালিটি কমে যায় যদি মোবাইল ফোন পকেটে রাখা হয়, বুক পকেটে রাখলে হার্টের সমস্যা হয়। অনলাইনে আসক্তির ফলে সামাজিক দক্ষতা, জীবনের গুণগতমান এবং পড়ালেখাসহ সব কাজের গতি ও মান কমে যায়। ফলে তাদের হতাশা বা বিষণ্নতা বেড়ে যায়।
কিশোরগ্যাং নামে পরিচিত গ্যাং এখন সমাজের আতঙ্ক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, এসব গ্যাং এর অপরাধের পেছনে যে কৌশল, তা তারা শিখছে বিভিন্ন ভিডিও গেমস থেকে। টিনেজারদের যৌনচাহিদা ও বিকৃতি ভর করছে নানা গেমে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে গড়ে উঠছে অসংখ্য কিশোর গ্যাং। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়শই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেই চলছে। একজন বয়স্ক লোক মাদকসক্ত হয়ে পথে পড়ে থাকলে তার জন্য যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া উচিত, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি উদ্বেগ উৎকন্ঠা তৈরি হওয়া উচিত একজন শিক্ষিত তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়াতে। কারণ, শিক্ষিত তরুণ বলতে জাতির ভবিষ্যৎ চালক। দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মাঝে মাদকাসক্ত হওয়ার হার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি জাতির জন্য ভয়ংকর খারাপ সংবাদ। এত আধুনিক উদ্ভাবন ও উন্নয়ন কার জন্য? যে তরুণ চরম নেশার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে তার সাথে সভ্যতা, উন্নয়ন, সুশীলতা ও সৌন্দর্যের কি বা দাম আছে? কারণ সে তো একটা জীবন্ত লাশ। এখন তরুণ সমাজের মাঝে মাদকাসক্ত হওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ খুঁজলেই বুঝা যাবে অসুস্থ বিনোদন উপভোগ, সুশীল কর্মে মনস্থিতির অভাব ও অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চাই তার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যারা জীবনকে বেশি উপভোগ করতে চেয়েছে বা বেশি স্মার্ট হতে চেয়েছে তাদের মধ্যে থেকেই অধিক সংখ্যক তরুণ-তরুণী বিচ্যুতির সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ যুবসমাজ যতই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে ততই তারা ভোগের উপাদান পরিবেশিত হয়ে মন- বিচ্যুতির কবলে পড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের যেকোনো জাতি বা ধর্মের আলাদা একটা সাংস্কৃতিক আদর্শ রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক আদর্শই তাদের সমভাবে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনের পথ নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এখন সারাবিশ্বে ইন্টারনেটের কল্যাণে আধুনিক সংস্কৃতির যে রুপ তৈরি হয়েছে সেটাই যুবসমাজের কাছে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। পুরাতন অনেক জীবনধর্মী ও সভ্যতাচর্চার জন্য অপরিহার্য রুচিশীল সংস্কৃতি, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এখন তরুণ সমাজের কাছে যেন ডাস্টবিনের উচ্চিষ্ঠ খাবার। তাদের শিক্ষকের ভুমিকায় এখন ইন্টারনেট হওয়ায় মা-বাবা, শিক্ষক-গুরুজন ও সামাজিক মুরুব্বি মহলের অতিপ্রয়োজনীয় জীবনমুখী উপদেশও তাদের কাছে পরিণত হচ্ছে বিরক্তির কারণ হিসেবে। তরুণ প্রজন্মের মনে পরিবর্তনের স্রোত যদি এভাবে ভাল-মন্দ, বিচার-বিবেচনা করার গুণটি নষ্ট করে দিতে থাকে, আমাদের অত্যাধুনিক সফলতার ফলগুলোতো সব পোকা খেয়ে নষ্ট করে দিবে।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল তরুণরা। ‘৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আইয়ুব খানকে হটিয়েছিল তরুণরাই। মুক্তিযুদ্ধে সামনের কাতারে ছিল তরুণরাই। এরশাদ শাহীর নয় বছরের ক্ষমতার মঞ্চ ধুলিস্যাৎ করেছিল তরুণরাই। এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা স্মরণ রেখে তরুণদের, নবীনদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। অবক্ষয়, সহিংসতা ও দিক-নির্দেশনাহীনতার স্রোত খড়কুটোর মতো ভেসে চললে কেবল নিজেদেরই সর্বনাশ হবে না, জাতীরও সর্বনাশ হবে। কারণ, আগামীদিনের নেতৃত্ব তো তাদেরই দিতে হবে।
লেখক : প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা
বাবু/এ.এস