
X
লরেন্স লিফশুলজ বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন জার্নাল ও সংবাদপত্রে লিখেছেন। তিনি হংকং থেকে প্রকাশিত ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ, লন্ডনের দ্যা গার্ডিয়ান, মুম্বইয়ের দি ইকোনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি এবং নিউইয়র্কের দ্য নেশন সংবাদপত্রে প্রায় চার দশক ধরে লেখালেখি করেছেন। তিনি প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে জুলাই মাসে কোলকাতা থেকে সড়কপথে বেনাপোল হয়ে ঢাকাতে আসেন। তিনি সেদিনগুলোতে ভারতের বিহার প্রদেশের গয়াতে বসবাস করতেন এবং মহাত্মা গান্ধীর ভাবশিষ্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠত সর্বজয়া আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচালিত গ্রামীণ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের উপরে কাজ করতেন। তিনি ঊনিশ বছর বয়সে ইউল ইউনিভার্সিটি অর্থায়নে একটি প্রোগ্রাম নিয়ে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি তখন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি স্নাতকের ফেলো ছিলেন। এটা উল্লেখযোগ্য প্রোগ্রাম ছিলÑ যারা উক্ত ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হত, তারা সহজে তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেত।
একবছর ভারতের অতিবাহিত করার পর তিনি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে যাতায়াত শুরু করেন। ইন্দো-চায়না যুদ্ধের দিনগুলোতে অধিকাংশ সময় সড়কপথ ও নৌপথে তিনি ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসে কাটিয়েছেন। সেই সময়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমবার এসেছেন। তিনি যখন ঢাকাতে আসলেন, তখন পুরোনো ঢাকায় একটি সস্তা হোটেল খুঁজে পেলেন। তিনি ঢাকাকে নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান শুরু করলেন।
কোনো একদিন লরেন্স লিফশুলজ নিউমার্কেটের একটি ওষুধের স্টোরে কিছু ওষুধ কিনতে গেলেন। তিনি যখন নিউমার্কেটের ঢুকলেন, তখন তাঁকে স্টোরের মালিক নুরুল হুদা বসতে অনুরোধ করলেন এবং চা দ্বারা আপ্যায়িত করলেন। এ সময় লরেন্স লিফশুলজ পুরোনো ঢাকার সস্তা হোটেলে অবস্থান করেছিলেন; এ কথা শুনে নুরুল অনেক কষ্ট পেল। ভ্রমণের সময় সস্তা ও সাদামাটাভাবে চলার জীবনাদর্শনের কথা নুরুলকে ব্যক্ত করলেন তিনি। যাতে তিনি যাত্রাপথে পৃথিবী ও পারিপার্শ্বিক সমাজব্যবস্থাকে সূক্ষ্মভাবে অবলোকন করতে পারেন।
দুই.
নুরুল হুদাকে লরেন্স লিফশুলজের চিন্তা-দর্শনটি খুবই আকৃষ্ট করল। নরুল হুদা লরেন্স লিফশুলজকে তার বনানীর বাসায় থাকার জন্য অনেক অনুরোধ করলেন। চট্টগ্রাম যাওয়ার পূর্বে হুদার বাসায় থাকার জন্য তাঁকে প্রভাবিত করলেন। কয়েকদিন লরেন্স লিফশুলজ নুরুলের আতিথিয়েতায় ছিলেন এবং নরুলের পরিবার তাঁর প্রতি অনেক আন্তরিক ছিলেন। নরুল হুদা বিহারে লরেন্সের কাজের কথা শুনে তিনি লরেন্সকে এক নতুন কোনো ব্যক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কথা বললেন। তিনি কার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন প্রথমে তা বলেননি। লরেন্সকে বাইকের পেছনে তুলে নিয়ে নরুল হুদা কাক্সিক্ষত ব্যক্তির বাসার সামনে থামল এবং উক্ত ব্যক্তির সাথে লরেন্সকে পরিচয় করিয়ে জন্য তাঁর বাসায় অপেক্ষা করতেছিলেন।
নরুল হুদা ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে লরেন্সকে নিয়ে গেলেন এবং বঙ্গবন্ধুর কর্মচারীকে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। বঙ্গবন্ধু আসলে নুরুল হুদা লরেন্সকে বিদেশি অতিথি হিসেবে তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু লরেন্সকে সাদরে গ্রহণ করলেন তাঁর সহজাত ভঙ্গিতে। বঙ্গবন্ধুর সাথে নুরুল হুদার আগে থেকেই চেনা-জানা ছিল। ভারতে লরেন্সের কর্মপরিকল্পনা জানতে চাইলেন বঙ্গবন্ধু। লরেন্স বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানলেন। কিন্তু এর আগে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না। বিভিন্ন প্রশ্ন করে লরেন্স অনেক কিছু জানতে সক্ষম হলেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক বঙ্গবন্ধু ও লরেন্সের মধ্যে আলাপচারিতা হল। বঙ্গবন্ধু তাঁকে অনেক প্রশ্ন করে বিহারে তাঁর প্রকল্পের কাজ ও তাঁর অভিব্যক্তি কী সে সম্পর্কে জানলেন। লরেন্সের প্রতিত্তোরে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম এবং সত্তরের নির্বাচনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে পুনর্বিন্যাস করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যা তৎকালীন সামরিক স্বৈরতন্ত্রে মাধ্যমে মোটেও অর্জন করা সক্ষম হবে না বলে অভিমত প্রকাশ করেন।
বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে চাইলেবঙ্গবন্ধু তাঁকে জানানÑ তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ। সুইডেনের প্রসংশা করে বঙ্গবন্ধু জানানÑ অর্থনৈতিক বৈষম্য গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে দূরীকরণ সম্ভব যা সরাসরি সুষ্ঠু, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মধ্যে নিহিত। লরেন্সের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের খোলামেলা, অকৃত্রিম ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতার কথা উল্লেখ করে লরেন্স লিফশুলজ জানান, বঙ্গবন্ধু ছিলেন সহজ-সরল মুক্তমনের মানুষ। তিনি লরেন্সের সাথে আলোচনা উপভোগ করতেছিলেন। সেই সাক্ষাতে লরেন্স বঙ্গবন্ধুর মধ্যে কোনো ধরনের অহমিকা ও আত্মগড়িমা খুঁজে পাননি। বরঞ্চ লরেন্সের মতো একজন যুবক সেই আলাপ মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মহানুবভতা ও আতিথিয়েতায় দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন।
কিন্তু লরেন্সের কাছে বড়োই পরিতাপের বিষয় হলÑ ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে সাক্ষাতের পাঁচ বছর পরে সেই ব্যক্তির সাথে আর কখনো দেখা না হওয়া। সেই বাসায় বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছেÑ যেখানে লরেন্স বঙ্গবন্ধুর হাতে পরিবেশিত দুপুরের খাবার খেয়েছেন। লরেন্স সাংবাদিক হিসেবে পনেরো আগস্টের ট্র্যাজেডির জটমুক্ত ও অনুসন্ধান করা তাঁর পেশার একটা পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন এবং তাঁর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
পঁচাত্তরের জুলাইয়ে লরেন্স ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউ সংবাদপত্রে দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং নয়াদিল্লিতে অবস্থান করতেছিলেন। ১৯৭৪ সালে এক বছর তিনি দ্য রিভিউর বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন। ম্যাগাজিনটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরিতে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতো।
পনেরো আগস্ট ভোরে লরেন্স অন্যান্য প্রতিবেদকদের সাথে নয়াদিল্লির রেডফোর্টে ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বসে তথ্য সংগ্রহ করতেছিলেন। ঐদিন ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ শুরু করেন। সময়টি ছিল খুবই জটিল ও বিতর্কিত; কারণ তখন ভারতে জরুরি অবস্থা চলছিল এবং হাজার হাজার মিসেস গান্ধীবিরোধীরা অস্থিরতা সৃষ্টি করছিল। এদের মধ্যে গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণও ছিলেন। মিসেস গান্ধীর ভাষণের সময়ে রয়টার্সের একজন সংবাদ প্রতিনিধি লরেন্সকে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের আসনে খুঁজে পেলেন। তিনি তাঁর সম্পাদকের বরাত দিয়ে জানানÑ সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপদগ্রস্ত কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছেন। বার্তাটি তাকে তাৎক্ষণিক ঢাকাতে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে, এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উৎঘাটনে। রয়টার্সের বার্তাবাহক লরেন্সের দিকে তাকিয়ে জানানÑ ঘটনাটি বড়োই মর্মান্তিক। পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি হ্যাঁ ইশারাসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন। লরেন্স ও তাঁর সঙ্গী রয়টার্সের প্রতিনিধির সাথে তাৎক্ষণিক ঢাকার উদ্দেশে রওয়নার প্রস্তুতি নেন।
তিন.
এটা খুবই পরিষ্কার জেনারেল জিয়া পনেরো আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিফাল। অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস সাথে সাক্ষাৎকারে ফারুক ও রশিদ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পূর্বে জিয়ার সাথে বহুবার দেখা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ম্যাসকারেনহাস তাঁরÑঅ্যা লিগাসি অব ব্লাড বইয়ে সেই সাক্ষাৎকার উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৭ সালে ইউরোপের একটি শহরে লরেন্স বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদের কয়েক ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার নেন। লরেন্স সে সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে খুনি রশিদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রশিদের নিজ কারণ ও নিজ ইচ্ছাতেই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় কিন্তু উদ্যোগটি ছিল লরেন্সের। রশিদের পরিচিত লোকজন লরেন্সের সাথে লন্ডনে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে রশিদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা বলেন। লরেন্স ও রশিদ তাৎক্ষণিক সময় ও তারিখ নির্ধারণ করেন শহরের কোনো জায়গায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মিলিত হবার। লরেন্সের সাথে তার লন্ডন শহরে সাক্ষাত হয়নি। লরেন্স সাক্ষাতের উদ্দেশ্য লন্ডন ত্যাগ করলে দুজন স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসার লরেন্সকে তাঁর গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য দিকনির্দেশনা দেন। অবশ্যই লরেন্সের এ সাক্ষাৎকারটি বৃটিশ সরকারের নজরদারির মধ্যে ছিল। লরেন্স বিস্মিত না হয়ে যখন রশিদের সাথে সাক্ষাত করেন। তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে ম্যাসকারেনহাস কী বলেছিলেন তা জানতে চাইলেন। লরেন্সের কাছে ম্যাসকারেনহাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির সত্যতা স্বীকার করে। তাদের দুজনের আলাপচারিতায় আরো বিস্তারিত যুক্ত করেন। রশিদ লরেন্সকে বহুবার বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পূর্বে জেনারেল জিয়ার সাথে সরাসরি সাক্ষাত করেছেন এবং জিয়া উক্ত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এটা ছিল একটা ষড়যন্ত্রÑ যেখানে ভিন্ন ভিন্ন লোক ভিন্ন ভিন্ন বলয়ে আলাদা ভূমিকা পালন করেছে। রশিদ, মোস্তাক ও জিয়াকে ভিন্নভাবে চিন্তা করা খুবই ভুল। তারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রের অনেকগুলো অংশের চালিকাশক্তি। জিয়ার শাসনামলে খুনিদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রদূত হিসাবে পদায়ন এবং পুরুস্কৃত জিয়ার সংশ্লিষ্টতাকে আরো প্রকট করে। সংবিধানে ইনডেনিটি আইন বলবৎ রেখে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রাখাই জিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বহন করে। লরেন্স ১৯৭৫ সালের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। অবৈধ অভ্যুত্থানের পর বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন বা নিহত হয়েছেন কিনা সে বিষয়ে শফিউল্লাহ সন্দিহান ছিলেন। তিনি চিফ জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফকে অবৈধ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ইউনিটকে তার কার্যক্রম ব্যর্থ করার নির্দেশ দেন যখনই তাঁর কাছে অবৈধ অভ্যুত্থানের সক্রিয় কার্যক্রমের সংবাদটি পৌঁছে। শফিউল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন, তখনো বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধু সাথে স্বল্প সময় টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে স্বীকার করেছেন তাঁর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে। বঙ্গবন্ধুকে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে অনুরোধ করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি অনুগত ফোর্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারেন। কোনোভাবেই শফিউল্লাহ সফল হননি। কেনো তিনি সফল হননি সেটা আর একটি ভিন্ন আলোচনা।
জিয়া প্রসঙ্গে ফিরে এলেন লরেন্স লিফশুলজ। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল শফিউল্লাহকে গৃহবন্দি করা হয়। শফিউল্লাহার মতেÑ ঐ সময়ে মেজর রশিদ তাঁর কাছে এসে জানান, জেনারেল জিয়া এবং অন্যান্য সিনিয়র অফিসার সবকিছু জানেন কী পরিকল্পনা করা হয়েছিল সে সম্পর্কে। রশিদের সাথে সেই সাক্ষাতে রশিদ লরেন্সের কাছে স্বীকার করে শফিউল্লাহাকে মেজররা সমস্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখেন। শফিউল্লাহার কাছে এটা পরিষ্কার যে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার জিয়া উক্ত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পরিষ্কার জানতেন।
পনেরো আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জেনারেল জিয়ার সংশ্লিষ্টতা আরো বিস্তারিতভাবে বের হয়ে আসবে বলে বিশ্বাস করেন। লরেন্সের তাঁর নিজস্ব পর্যালোচনায় জানানÑ জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে যেসব ষড়যন্ত্র হয়, তার ভূমিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন কওে জিয়া। রশিদ তার বক্তব্যে লরেন্সকে নিশ্চিত করে জানানÑ জিয়া রশিদকে আশ্বস্ত করে অবৈধ অভ্যুত্থানের সময় সেনাবাহিনীর কোনো ইউনিট তাদের অপারেশনের বিরুদ্ধে যাবে না, যদি তারা তাদের মিশনটি সফলভাবে সংঘটিত করতে পারে। রশিদ তার সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেনÑ জিয়া সতর্কতার সাথে রশিদের অপারেশনাল প্লান পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধায়ন করেছেন।
লরেন্সের মতে, অবৈধ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব না দেওয়ার জিয়ার নিজস্ব কিছু কারণ ছিল। জিয়ার নিজস্ব এজেন্ডা ছিল যেগুলো সম্পর্কে কতিপয় লোকের পরিপূর্ণ ধারণা ছিল। লরেন্সের মতে, জিয়ার সক্রিয় সাপোর্ট ছাড়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হতে পারত না। জিয়াই পর্দার অন্তরালের ব্যক্তি, যদি জিয়া সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে থাকতেন, তবে সে অবশ্যই এ হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে পারতেন। কারণ এটা ছিল তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। লরেন্সের মতে, জিয়া ছিল জটিল চরিত্রের মানুষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিয়া সরলতার ভান করত; কিন্তু কার্য হাসিলের জন্য তার নিজস্ব কলাকৌশল ব্যবহার করত। বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই সময়ে পর্দার অন্তরালে থেকে জিয়া কতোটা নৃশংস ও সূক্ষ্ম অপকর্ম সম্পাদনে পটু ছিলেন।
লরেন্স ১৯৯৭ সালে রশিদকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে আমেরিকার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইল। রশিদ জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা নিয়ে আমেরিকার অবস্থান জিয়ার কাছে জানতে চাইলেন তিনি। জিয়া তাকে আমেরিকার অবস্থান পরিষ্কার কওে জানান, আমেরিকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সম্মতি রয়েছে। ফিলিপ চেরি নামক সিআইএর স্টেশন অফিসারের সাথে জিয়ার একাধিকবার সরাসরি সাক্ষাত হয়েছে; সম্প্রতি এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জিয়া নিশ্চিত করেন আমেরিকার পক্ষ থেকে এ হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করা হবে নাÑ এ আশ্বাসটি রশিদকে সে নিশ্চিত করে। রশিদ লরেন্সকে বলেন, আমেরিকার সিআইএ এজেন্টের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল জিয়ার। কিন্তু তিনি কার সাথে যোগাযোগ করতেন তা রশিদ জানতেন না। পূর্বেই বলা হয়েছে, জিয়া জটিল চরিত্রের লোক ছিলেন এবং তিনি রশিদের কাছে আমেরিকার চরের নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
পাকিস্তানি লেখক এম. বি. নকবির সাথে লরেন্স লিফশুলজ যোগাযোগ ছিল। নকবি তাঁকে ১৯৭৫ সালে পনেরো আগস্টে কন্ট্রোলার অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, রেডিও পাকিস্তানের গভীর রাতের কার্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। নকবির চিঠি একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যেখানে বলা হয়েছেÑ জুলফিকার আলী ভুট্টো পনেরো আগস্টের রাতে ঢাকায় সেই অস্বাভাবিক নিউজের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে ছিলেন। নকবি বর্ণনা করেছেন, ঐ রাতে জিলাল হায়দারের (তৎকালীন পাকিস্তান রেডিওর ডিরেক্টর জেনারেল) সেন্ট্রাল নিউজরুমে নির্দেশনা ছিলÑ ঢাকার যে কোনও নিউজ আসলেই তাকে যেন তাৎক্ষণিক জানানো হয়।
নকবি লরেন্স লিফশুলজকে জানিয়েছেনÑ পাকিস্তান রেডিওর ডিরেক্টর জেনারেল খুব সকালেই মিটিং ডাকেন। হটলাইনের মাধ্যমে সেন্ট্রাল নিউজরুম থেকে ঢাকার যেকোনো নিউজ জানানো হয় এমন নির্দেশনা দেন। ডিজি ঢাকার কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিউজের প্রত্যাশা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার জন্য অপেক্ষা করতেছিলেন। অবশ্যই ডিজি সাহেবর মনে আগে থেকেই কিছু ছিল। তিনি তিন থেকে চারবার আনসারীর (ডিরেক্টর অব নিউজ) কাছে জোরপূর্বক জানতে চেয়েছেনÑ ঢাকা থেকে কোনো সংবাদ আসছে কিনা। বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে নিউজরুম থেকে নিউজটি আসল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর অফিসার কর্তৃক সপরিবারে নিহত হয়েছেন। এটাই ছিল আসল নিউজ। যখনই নিউজটি আসল, তখনই জিলাল হায়দারের মুখ থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হল। তাকে কিছুটা শান্ত মনে হল। সম্ভবত এ নিউজটিই প্রত্যাশা করতে ছিলেন তিনি। তিনি তড়িঘড়ি করে মিটিং বন্ধ করে অফিস ত্যাগ করলেন। মনে হলÑ নিউজটিই নিয়ে জিলাল হায়দার সোজা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাসবভনের গেলেন। উপসংহারে উপনীত হওয়া যায়, ঢাকার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ইসলামাবাদ ভালো করেই অবগত ছিল।
চার.
লরেন্স ২০০৭ সালে জিলাল হায়দার জাইদীর (সাবেক ডিজি, পাকিস্তান রেডিও) সাথে সাক্ষাৎকার নেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের নিউজের জন্য অপেক্ষা এবং তাৎক্ষণিক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে নিয়ে যাওয়াÑ এ বিষয়ে প্রশ্নটি করলে তিনি অস্বীকার করেন। লরেন্স জানান, জিলাল হায়দার জাইদীর নকবির প্রতি প্রতিবেদক ও সাংবাদিক হিসেবে অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে। লরেন্স দীর্ঘদিন থেকে তাঁর লেখা অনুসরণ করেন। তিনি খুবই সৎ ও পেশাদার প্রতিবেদক হিসেবে সুপরিচিত ও বিবেচিত। দীর্ঘদিনের জানা-শোনার মাধ্যমে লরেন্স মনে করেন নকবি সাংবাদিকতার নীতিকে লঙ্ঘন করতে পারেন না এবং পেশাদারিত্ব রক্ষায় নকবি সবসময়ই সচেষ্ট ছিলেন।
পাকিস্তান ও সোদি আরর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই জানত; তার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই উভয় দেশ বাংলাদেশকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটাই প্রমাণ করে যে ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। কাকতালীয় ঘটনা খুব কমই কাকতালীয়ভাবে ঘটে। সমস্যাটা ছিল তখন পর্যন্ত অবৈধ ক্ষমতা দখলদারীরা ঘোষণাই করেনিÑ বাংলাদেশ একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। অথচ পাকিস্তান ও সৌদি আরব ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল। মোস্তাকের মনের মধ্যে এমন একটা ঘোষণার খায়েশ ছিল; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছিল। ধোঁয়াশে ও অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছিল। অনেকেই সেই রাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল।
১৯৯৭ সালে খুনি রশিদ লরেন্সকে জানান, সেই রাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার নির্দেশ পাননি। কিন্তু তিনি স্বীকার করলেনÑ তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য প্রস্তুত ছিল। যখন লরেন্স রশিদকে জিজ্ঞেস করলেন কেন তারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যসহ বাইরের অনেককে হত্যা করলো? প্রতিত্তোরে রশিদ জানালেনÑ তার কমান্ডের বাইরেও কিছু ফোর্স অন্যান্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। বিস্তারিত জানতে লরেন্স প্রশ্ন করলে, রশিদ এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়নি।
রশিদের খুবই কাছের ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম খুনি ফারুকের ভারতীয় লেখক সলিল ত্রিপাতি ১৯৮৬ সালে একটি সাক্ষাৎকার নেন। বঙ্গবন্ধু কনিষ্ঠ পুত্র দশ বছরের রাসেলকে কেনো হত্যা করা হলো জানতে চাইলে, ত্রিপাতি প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর পেলেন। ফারুক জানান, এটা ছিল একটা মার্সি কিলিং, মুজিব রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ছিল। তাদের সবাইকে খতম করতে হয়েছিল। ভারতীয় লেখক ত্রিপাতি বলেন, সে কথাগুলো আমাকে বলার সময় ফারুকের মধ্যে চূড়ান্ত খতমের তীব্রতা দেখা গেল, তার পায়ের সামনে যারাই পরল, তাঁদেরই মস্তক উড়িয়ে দেওয়ার নেশায় মেতেছিল তারা। তাদের চোখে কোনো মায়া ছিল না, কোনো অনুশোচনা ছিল না, শুধু ছিল খতম আর উৎখাতের অহংকার।
ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে যদি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ না থাকত তবে তারা পনেরো আগস্টের নির্মম ঘটনার পরে বাংলাদেশ বেতারের ঘোষণা কিংবা লিখিত কোনো বার্তার উপর নির্ভর করত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে। তা না করেই তারা বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিল। কিন্তু তারা কেউই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। কাজেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের বিষয়টি পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও আমেরিকা একসাথে পনেরো আগস্টে ঘটানোর ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন সময়ে আমেরিকার হটলিস্টে যে কয়টা সরকারকে উৎখাত করার তার এজেন্ডা ছিল তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার ছিল অন্যতম।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মৌলিক কাঠামো ভেঙে ফেলে পাকিস্তানি ভাবধারায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে পনেরো আগস্ট বড়োই বেদনার মাস, শোকের মাস ও মাতমের মাস। এ মাসের রক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের শিরা-উপশিরায় অনাদিকাল পর্যন্ত প্রবাহিত হবে। এ নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আমাদের চেতনার বাতিঘওে আলোকবর্তিকা হয়ে আলো ছড়াবেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নান্দনিক পললভূমি রেখে যাবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
বাবু/এ.এস