সমাধান রাজনীতিবিদদেরই দিতে হবে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মতামত

শিরোনামে উল্লেখ করা কথাগুলো মোটেও নতুন নয়, বহুজনের মুখ থেকেই উচ্চারিত। রাজনীতিবিদরাও সে কথাই বলে থাকেন। রাজনীতিসচেতন মহলও

2023-08-24T11:18:17+00:00
2023-08-24T11:18:17+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
সমাধান রাজনীতিবিদদেরই দিতে হবে
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৩, ১১:১৮ এএম   (ভিজিট : ১৩০)
X


শিরোনামে উল্লেখ করা কথাগুলো মোটেও নতুন নয়, বহুজনের মুখ থেকেই উচ্চারিত। রাজনীতিবিদরাও সে কথাই বলে থাকেন। রাজনীতিসচেতন মহলও রাজনীতিবিদদের এমন উপদেশই দিয়ে থাকে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা যে সব সময় চরম এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন কিংবা বিদ্বজ্জনদের উপদেশকে সহজে বিবেচনায় নেন তেমনটি আমাদের দেশে অন্তত দেখা যায় না।

এর অনেক কারণ আছে। আমাদের দেশে রাজনীতি বহুল উচ্চারিত শব্দ, রাজনীতি করেন এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। রাজনৈতিক দলের সংখ্যায় তো আমরা বোধ হয় পৃথিবীতে এক নম্বরের আসন অনেক আগেই দখল করে বসে আছি। তবে সেসব দলের অন্তত ৯৮ শতাংশের কোনো অফিস নেই, নেতাকর্মীও নেই।

দলের নাম আছে, দু-একজন নেতার নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে। এদের রাজনীতিকে যদি রাজনীতি বলা হয়, তাহলে রাজনীতির সংজ্ঞাই বোধ হয় পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এদের বেশির ভাগকে দেখা যায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো না কোনো বড় দলের সঙ্গে জোট গঠন করতে। সেই জোটে কখনো ৭০-৮০টি দলের সংখ্যার কথা বলা হলেও ৭০-৮০ জন নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।

সত্যিকার অর্থে রাজনীতি গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে—যেখানে আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আদর্শ ইত্যাদি যেমন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে; দেশ, জাতি ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে সমকালীন অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, দর্শন দ্বারা পরিচালিত নেতৃত্বও গড়ে ওঠার বিষয়টি আবশ্যক। আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ১৯৪৭-পূর্ববর্তী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকা নেতাকর্মীরা। তখন তাঁরা মুসলিম লীগকেই মনে করেছিলেন স্বাধীনতালাভের জন্য নেতৃত্ব প্রদানকারী রাজনৈতিক নির্ভরশীল দল। কিন্তু অভিজ্ঞতা তাঁদের বুঝতে শিখিয়েছে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জন্য প্রয়োজনীয় দল হলেও পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য নয়।
যাঁরা এই রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করেছিলেন তাঁরাই আওয়ামী লীগ গঠন থেকে পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন। মওলানা ভাসানীসহ বামধারায় বিশ্বাসী একটি অংশ ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠন করেছিল। তাদের আদর্শ ছিল শোষণহীন সমাজ গঠন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন করা। আওয়ামী লীগের আদর্শ ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হয় পাকিস্তানকে ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত করা নতুবা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭১ সালে শেষটিই তারা রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিল। আওয়ামী লীগ রাজনীতির পোড় খাওয়া মাঠে কতটা ত্যাগ, প্রজ্ঞা ইত্যাদি দেখাতে পেরেছিল তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। মওলানা ভাসানীর ন্যাপ শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখালেও শিকড় বিচ্ছিন্ন রাজনীতি করার কারণে নানা বিভক্তি-বিভাজন এবং আদর্শচ্যুতিতে পিছিয়ে পড়া সংগঠনে পরিণত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে জাসদ আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতাবোধের অভাবের কারণে তরুণ এসব নেতাকর্মী রাজনীতিতে যে রোমান্টিসিজম দেখিয়েছিলেন তার শেষ পরিণতি রাষ্ট্রের জন্য যেমন সুখকর হয়নি, দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাকর্মীদের জন্য মোটেও ইতিবাচক কিছু দেয়নি। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে ভয়াবহ বিয়োগান্ত ঘটনার মাধ্যমে সব কিছুকে ওলটপালট করে দিয়েছে।

১৯৭৮ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দল গঠন করেন সেটি রাজনীতির নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আরোপিত দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একটি দল যখন প্রত্যাশা পূরণ করার ক্ষেত্রে কারো কারো কাছে ব্যর্থ কিংবা প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলে তখন তারা স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। আন্দোলন-সংগ্রাম এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে দলটি রাজনীতির মাঠে বিরোধী কিংবা বিকল্প শক্তি হিসেবে মানুষের কাছে বিবেচিত হয়। মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগ সেভাবেই বিকল্প এবং প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর রাজনীতিতে সেই পাঠশালায় রাজনীতির জ্ঞান, অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটাতে দেওয়া হয়নি। ফলে এখানে রাজনীতিতে আদর্শহীন, সুবিধাবাদী, উগ্র, হঠকারী, ডান, বাম ও সাম্প্রদায়িক নানা গোষ্ঠী দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিরোধী হিসেবে দাঁড়ালেও আদর্শের বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য এবং উদারবাদিতার অনেক সম্ভাবনাকেই উদ্ভাসিত করতে দেয়নি। এরপর জাতীয় পার্টিও একইভাবে গঠিত হয়েছে। রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাকেন্দ্রিক এই দলটি এখন নিভু নিভু পর্যায়ে অবস্থান করছে।

বিএনপি বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির বাস্তবতায় ডান, মধ্য ডান থেকে অতি ডান এবং অতি বাম ও সাম্প্রদায়িক মহলের কাছে সমাদৃত দল ও নির্ভরশীল শক্তি। সুতরাং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন পরস্পরবিরোধী মতাদর্শে দুটি রাজনৈতিক ধারা রয়েছে। একটি উদারবাদী, অসাম্প্রদায়িক ধারা, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ, এর সঙ্গে কিছু ছোট ছোট রাজনৈতিক দল যুক্ত হয়েছে, যারা এই আদর্শে বিশ্বাস করে। এর বিপরীত ধারার রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি, যেখানে সব মধ্য থেকে উগ্র ডান এবং উগ্র বামদের অবস্থান রয়েছে। এর সঙ্গে অতীতে সাম্প্রদায়িক এবং সুবিধাবাদী ডানপন্থী কিছু দল নিয়ে জোটের রাজনীতি ভোটেও কার্যকর ছিল। সম্প্রতি এর সঙ্গে ৩৬টি ছোট ছোট দল যুক্ত হলেও সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধীদের যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তব চিত্রটি আদর্শিক বিবেচনায় এমন পর্যায়ে রয়েছে। সুতরাং দেশ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে এখন ৫০, ৬০ কিংবা ৭০ দশকের প্রথমাংশের মতো নেই। এতে ব্যাপক আদর্শিক বিচ্যুতি ও ঘাটতি রয়েছে। তার পরও আমাদের রাজনীতির মাঠে প্রধান এই দুই দল কিংবা এই দুই দলের নেতৃত্বের জোটকেই বিবেচনায় নিয়ে দেশের রাজনীতির বিচার-বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী দুটি ধারার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে জয়লাভের চেয়েও প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাই উভয় শক্তির মূল লক্ষ্য, সেটি তাদের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার। সেখানে এক পক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, করতে দেবে না এমন দাবি করে যাচ্ছে। কতটা তারা শেষ পর্যন্ত সফল হবে তা বলা মুশকিল। অন্য পক্ষ সরকারি দল ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতায় দেশকে আর ফিরিয়ে না নেওয়ার অবস্থান থেকে সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নির্বাচনের আর বাকি মাত্র কয়েক মাস। সরকারের মেয়াদও আর বেশিদিন নেই। কিন্তু দুই পক্ষের অনড় অবস্থান স্পষ্ট। এর মধ্যে বিদেশি নানা শক্তির তৎপরতা প্রায় এক বছর থেকেই জোরদার করছে। ফলে এবার দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের নানা অভিমত শোনা যাচ্ছে। বিরোধী দল বিদেশিদের কথায় অনেক সময় অনেক বেশি আশাবাদী হয়ে উঠছে, আবার কখনো কখনো হতাশ হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বিদেশিদের ব্যাপারে কখনো কখনো খুবই শক্ত অবস্থান নিচ্ছে, কখনো কখনো নমনীয়তা দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি বিরোধীরা গ্রহণ করছে না, আবার সরকারও বিরোধীদের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসার পরিবেশ দেখছে না। এটাকে অনেকের কাছেই খুব একটা প্রাক-নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ বলে মনে হচ্ছে না। তারা মনে করছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে সব পক্ষেরই আস্থা এবং অংশগ্রহণ কোনো না কোনোভাবে প্রয়োজন। সেটি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই করা যেতে পারে, যদি সরকার এবং বিরোধী পক্ষ ধীরে ধীরে তাদের মত পরিবর্তন করে। তা না হলে দেশে আবার ২০০৭-এর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু একটা ঘটে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তেমনটি ঘটলে রাজনীতি শুধু পিছিয়ে যায় না, ধ্বংসও হয়ে যায়। সেই সময় রাজনীতিবিদদের ওপর যে স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল তা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত ছিল। ২০০৯ সাল থেকে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এখন যত সমালোচনাই একে অন্যের বিরুদ্ধে করা হোক না কেন, তা তো জনগণও শুনতে পাচ্ছে, গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হচ্ছে। গণমাধ্যমে বসে এক দল অন্য দলের মুণ্ডুপাত তো কম করছে না। কিন্তু এটিও তো থাকবে না যদি অরাজনৈতিক শক্তি এসে মাথার ওপর চড়ে বসে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে রাজনীতির সমাধান কোনোকালেই আশা করা যাবে না। একইভাবে বিদেশিরাও বাংলাদেশের রাজনীতির সমাধান সরাসরি দেবে না। তবে তারা তাদের মতো করে যদি কিছু করে, সেটি তাদেরই স্বার্থরক্ষা করবে, বাংলাদেশের রাজনীতি বা জনগণের নয়। সুতরাং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান প্রকৃত রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে রাজনৈতিক জ্ঞান বুদ্ধি ও বিবেচনা থেকে। সেটি করার এখনো সময় রয়েছে।

লেখক : ইউজিসি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফেলো ও সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy