বঙ্গবন্ধুর গণমুখী শিক্ষার স্বপ্ন

ড. আতিউর রহমান

মতামত

আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর পুণ্য আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তার অমর কীর্তি ও ভাবনাগুলো স্মরণ করি। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের

2023-08-29T16:55:58+00:00
2023-08-29T16:55:58+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
বঙ্গবন্ধুর গণমুখী শিক্ষার স্বপ্ন
ড. আতিউর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৩, ৪:৫৫ পিএম   (ভিজিট : ১৫৫)
X


আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর পুণ্য আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তার অমর কীর্তি ও ভাবনাগুলো স্মরণ করি। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের আরেক নাম বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের একটি সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করা। তিনি সব সময় মনে করতেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। তাই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার পক্ষে ছিলেন। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা এতটা প্রাসঙ্গিক আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কালে বঙ্গবন্ধু স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের মৌল আকক্সক্ষার আলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নব-অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন। আর যুদ্ধের ছাই-ভস্মকে পেছনে ফেলে সমৃদ্ধির পথে এই চ্যালেঞ্জিং যাত্রায় মানবসম্পদ উন্নয়নকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিয়েই তিনি এগোতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদাকে দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রস্তুতের গুরুদায়িত্ব। বঙ্গবন্ধুর সেই আকাক্সক্ষাই প্রতিফলিত হয়েছিল শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৭৪-এ। তাই তো শিক্ষা কমিশনের প্রধান প্রস্তাবনাই ছিল ‘বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী জনগোষ্ঠী তৈরি করা।’ কেননা আশার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের উন্নয়নের অধিকারের পাটাতন মজবুত হতে পারে। কুদরত-ই-খুদা কমিশন রিপোর্ট নৈতিকতানির্ভর উপযুক্ত জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল।

তবে এই কমিশন রিপোর্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পর্যালোচনা কেবল স্বাধীনতা-উত্তরকালে আবদ্ধ রাখলে তা পূর্ণাঙ্গ হবে না। প্রাক-স্বাধীনতাকালে দুই দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার অধিকার প্রশ্নে বাঙালি যে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে সেটিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ জাতীয় শিক্ষানীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এ দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা এবং বাস্তবায়ন বিষয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনাগুলো এই সংগ্রামের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এবং স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে। এই আকাক্সক্ষা-চিন্তা-ভাবনাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে ধারণ করতে পেরেছেন ওই সময়েই যিনি ক্রমে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছেন সেই বঙ্গবন্ধুই।

ভাষা আন্দোলন নিঃসন্দেহে কেবল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না। তবে এই মহান আন্দোলনের যে সাংস্কৃতিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলোকে তো অস্বীকার করা যাবে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাচর্চা না করা গেলে যে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হওয়া সম্ভব নয়, তা তো আর নতুন করে বলার অপেক্ষ রাখে না। তাই শিক্ষাবিষয়ক দাবি-দাওয়া পঞ্চাশের দশকজুড়েই পূর্ববাংলার রাজনৈতিক সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাজুড়ে ছিল। ওই সময়ে সংসদে এবং সংসদের বাইরে মাঠে-ময়দানের রাজনীতিতে তাই বঙ্গবন্ধুসহ পূর্ববাংলার সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের আমরা দেখি শিক্ষা ইস্যুতে সরব থাকতে। ষাটের দশকের ‘শিক্ষা আন্দোলন’ একদিকে পাকিস্তানি অপশাসকদের সঙ্কোচনবাদী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিরোধ ছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘতর মেয়াদের রাজনৈতিক সংগ্রামের পাটাতন তৈরিতেও এ আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ফলে একদিকে আমাদের রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে শিক্ষা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে থেকেছে, অন্যদিকে আমাদের শিক্ষার দাবির সংগ্রামও আমাদের রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামকে বলশালী করেছে।

আর আমাদের এই শিক্ষার সংগ্রামে একেবারে গোড়া থেকেই অগ্রণী সংবেদনশীল নেতৃত্ব হিসেবে হাজির ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই ১৯৪৮ সালে (অর্থাৎ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই) পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের রিপোর্টে দেখা যায় যে, শিক্ষা ও উন্নয়নের যোগসূত্র স্থাপন করে তরুণ শেখ মুজিব খুলনার দৌলতপুরে প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘শিক্ষাদীক্ষাই হইল মানবসভ্যতার মাপকাঠি অথচ আমাদের দেশের অগণিত জনসাধারণকে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবাইয়া রাখিয়া কোন মুখে আমরা বিশ্বের দরবারে নিজদিগকে সভ্য জাতি বলিয়া গৌরব করিব?’ প্রাক-স্বাধীনতাপর্বে সব সময়ই বঙ্গবন্ধু এভাবে গণমানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের জন্য শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে গেছেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের আগেও বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিই যখন মুখ্য রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় তখনো বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে বলতে শুনি ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না।’

স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশ পরিচালনার ভার কাঁধে নিয়ে এই দর্শনই প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানে ‘গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা’, ‘নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদান’, ‘সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করা’ এবং ‘নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’-এর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হতে দেখি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রাথমিক পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন শেষে তিনি যখন মধ্যমমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন সেখানেও মোট উন্নয়ন ব্যয়ের ৭ শতাংশ ‘শিক্ষা ও মানবসম্পদ’-এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আর সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার যাতে নিশ্চিত করা যায় সে লক্ষ্যেই ড. কুদরত-ই-খুদাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ১৯৭৪ প্রস্তুত করার জন্য।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত শিক্ষা কমিশনের এই রিপোর্ট কতটা বাস্তবানুগ ছিল সেটি কেবল এর প্রাসঙ্গিকতা এবং উপযুক্ততা দিয়ে বিচার করার বিষয় নয়। এজন্য নজর দিতে হবে প্রতিবেদনে যে প্রস্তাবনাগুলো ছিল সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহ করা হয়েছিল কিনা এবং ওই সম্পদ ব্যবহার করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কী ছিল সেগুলোর দিকে। প্রথমে সম্পদ সরবরাহের কথা ধরা যাক। আগেই বলেছি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মোট উন্নয়ন ব্যয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছিল। যুদ্ধিবিধ্বস্ত একটি দেশের বাস্তবতায় এ অনুপাত নিঃসন্দেহে শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতি-মনোযোগের পরিচায়ক। এই সম্পদ বিনিয়োগ করে প্রাথমিক শিক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি, মাধ্যমিকে ১০ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষকের সংখ্যা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণসহ রেডিও-টিভির মাধ্যমে নির্দেশনা প্রদানের পথনকশা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ছিল।

দ্বিতীয় যে দিকটিতে নজর দেওয়া দরকার তা হলো কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নের জন্য সম্পদ বরাদ্দের পাশাপাশি যথাযথ প্রশাসনিক উদ্যোগ রাষ্ট্র নিয়েছিল কিনা। প্রশাসনিক কাঠামোর খলনলচে বদলে ফেলা নিঃসন্দেহে মধ্যমেয়াদি (অর্থাৎ তিন থেকে পাঁচ বছরের) বিষয় নয়। বিশেষত শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে যে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছিল তা সদ্য-স্বাধীন দেশে দক্ষ জনবলের অভাবের মধ্যে বাস্তবায়ন সত্যিই চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবুও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের যুক্ত করতে সদাসচেষ্ট ছিল দল-মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজেই ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে এক সভায় বলেছিলেন ‘গণমুখী শিক্ষা করতে গেলে প্ল্যান-প্রোগ্রাম অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন এবং এজন্যই কমিশন করা হয়েছে এবং কমিশনে এর মধ্যে আপনারা দেখতে পাইতেছেন যে, আমাদের কোনো দল-মত নাই। যারা উপযুক্ত তাদের আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত করিতেছি।’ ফলে বলা যায়, দল-মত নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সে সময় যথাযথ গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছিল।

দুঃখের কথা, বঙ্গবন্ধু তার এই মহতী শিক্ষা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট চক্রান্তকারীরা তাকে হত্যা করার পর আমাদের মনে-মননে বঙ্গবন্ধু প্রোথিত থাকলেও সময়োচিত ও গণমুখী শিক্ষার পথে আমাদের অগ্রযাত্রাটি যে খেই হারিয়ে ফেলেছিল তা তো মানতেই হবে। শিক্ষা কমিশনের ওই রিপোর্টটিতে যে প্রস্তাবনাগুলো ছিল সেগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। আর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের অগ্রযাত্রায় গত ১৩-১৪ বছর সময়কালে শিক্ষা খাতে আমাদের সংখ্যাতাত্ত্বিক অর্জন প্রশংসনীয়ই বলতে হবে। তবে আমার মতে, ১৯৭৪-এর শিক্ষা কমিশনে যে পথনকশা দেওয়া হয়েছিল তার সংখ্যাবাচক দিকগুলো অর্জনে আমরা যে সাফল্য দেখাতে পেরেছি, গুণবাচক দিকগুলো বাস্তবায়নে ততটা সফল হতে পারিনি। সবার জন্য শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কাজটি আমরা ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে শিক্ষার গুণমান এবং কর্মমুখিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক কাজ যে বাকি তা মানতেই হবে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থায় সুনীতি ও সুশাসনের যে কোনো বিকল্প নেই এ কথাটি আমাদের সবাইকে মানতে হবে। এবারের জাতীয় শোক দিবসে গণমুখী ও সময়োপযোগী শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখে গেছেন তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই আমরা তাকে যথাযথ সম্মান ও ভালোবাসা দেখাতে পারি।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর 

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy