যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই

সুধীর বরণ মাঝি

মতামত

যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। যুদ্ধের ভয়বহতা কতটা তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক এবং অমানবিক তা একবিংশ শতাব্দীতে বলার অপেক্ষা রাখে না।

2023-09-04T14:10:06+00:00
2023-09-04T14:10:06+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই
সুধীর বরণ মাঝি
প্রকাশ: সোমবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ২:১০ পিএম   (ভিজিট : ১০৬৬)
X


যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। যুদ্ধের ভয়বহতা কতটা তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক এবং অমানবিক তা একবিংশ শতাব্দীতে বলার অপেক্ষা রাখে না। আজকের বিশ্বে যা কিছু সংকট তার সবকিছুর মূলে রয়েছে যুদ্ধ এবং যুদ্ধ বাজার। যুদ্ধ ধ্বংস করে চলছে মানবিকতা, মূল্যবোধ, বিশ্ববিবেক এবং সকল সৃজনশীলতাকে।  সভ্যতা, মানবিকতা, জাতীয়তা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সৌহর্দ্য টিকিয়ে রাখতে সৃজনশীল  মানবিক পৃথিবী গড়তে যুদ্ধ বন্ধের বিকল্প নেই। যুদ্ধ নয়, শান্তি একটি মানবিক এবং সামাজিক শক্তি যা মানবজাতির অগ্রগতি এবং সামাজিক সমন্বয়ে একটি মহৎ ভূমিকা পালন করে।

যুদ্ধ মানবজাতির জীবনে একটি অত্যন্ত ধ্বংস প্রবৃত্তি বয়ে আনে। যুদ্ধের ফলে নষ্ট হয়ে যায় মানবজীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। যুদ্ধের সাহায্যে তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান উন্নতি হয় না, বরং এটি বিপজ্জনক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনার কারণে হৃতপিন্ডে ধ্বংস এনে দেয়। এটি সম্প্রদায়িক সাংঘাতিকতা এনে দেয়, যা জীবনও স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে ভেঙে দেয়। পৃথিবী একটি অসীম বিশাল জায়গা, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভাষা নিজস্ব আদর্শ ও মূল্যবোধে বিভক্ত আছে। তাই এই বিভিন্নতা সহজে আসতে পারে বা আসতেই পারে সংঘটিত হতে পারে যুদ্ধ ও অসন্তোষের রূপে। শান্তির  জন্য কখনো যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না প্রয়োজন ত্যাগ, সমঝোতা, মানবিক প্রেমসমৃদ্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা।

মানবসভ্যতা সততা, উন্নতি, ও সামাজিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ও সাংস্কৃতিক আদর্শগুলো অতীত চুক্তির মাধ্যমে মানবজাতির অগ্রগতি এবং সামাজিক সমন্বয়ের দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। যুদ্ধ নয়, শান্তি চাইÑ এই নীতিমূলক ধারণাটি আমাদের মানবিক ও সামাজিক প্রগতির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। যুদ্ধের ফলাফল অত্যধিক নাশক হয় এবং এটি সমাজ এবং অব্যবস্থা উৎপন্ন করে। যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাণহানি, সংসারের ভাঙা, অর্থনৈতিক পীড়িত এবং সামাজিক ক্ষতি উৎপন্ন হয়। মানবজাতির ইতিহাস পৃথিবীর মুখোমুখি যুদ্ধ ও সংঘর্ষের সাক্ষী হয়ে আসে। শতকরা শতক ধরে মানবসমাজ বিভিন্ন কারণে যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেছে। সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে, আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই এমন একটি আদর্শমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি যা আমাদের পৃথিবীকে আরও শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং সাক্ষরিকভাবে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

যুদ্ধের ফলে হচ্ছে মানবজীবনের হানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সমাজের অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের আশঙ্কা। এখানে নিরাপত্তা, ন্যায় এবং মানবাধিকারের মূল্যায়ন অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের প্রতিটি সদস্যের জীবন এবং মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও জাগরূকতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা, সমতা, ও মানবিক মূল্যায়নের মৌলিক আইন। এটি একটি শান্ত সমাজ এবং স্থিতিস্থাপনের জন্য শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রাজনীতিতে একটি শান্তির ভাবনা ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ বৃদ্ধি প্রয়োজন। দেশের অংশীদারসমূহ এবং আন্তর্দেশীয় সম্পর্কের মাধ্যমে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা এবং সমঝোতা সম্ভব। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নতি এবং সম্প্রদায় বিচয়নে সাহায্য করতে পারে। বৃদ্ধি এবং অগ্রসর হতে গিয়ে এই যুগে, প্রয়োজন সকলের একসাথে কাজ করার এবং সামাজিক ন্যায়ের মাধ্যমে একটি বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ বিশ্ব নির্মাণ করার। এটি শিক্ষা, সৃষ্টি, এবং প্রগতির মাধ্যমে সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্রের বিকাশ নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে। এই প্রস্তাবনা নিয়ে, আমরা যুদ্ধনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি আমাদের অনুরোধ যুদ্ধ থেকে ফিরে আসুন, শান্তি এবং সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা সম্প্রদায়, রাষ্ট্র এবং বিশ্বে উন্নতি ও সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করুন। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ এবং উন্নত বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, এবং এটি করার জন্য আমরা সবাই একসাথে কাজ করতে প্রস্তুত।

যুদ্ধ সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করে, মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্ধেষ ছড়ায়, সম্প্রীতি ধ্বংস করে। রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব বিশ্বের বড় দুটি সরবরাহ চেইনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। যার ফলে চাপ পড়েছে বিশ্বব্যাপী খাদ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার উপর। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের বর্তমান এই পরিস্থিতি কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মতো।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তাদের পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছেÑ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সারাবিশ্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৬৭.৬ শতাংশ বেশি ছিল। একইভাবে, প্রাকৃতিক-গ্যাসের দাম বেড়েছিল ২০০ শতাংশেরও বেশি। অ্যালুমিনিয়ামের দাম গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চো স্তরে এবং খাদ্য পণ্যের দামও একইভাবে বাড়ছে। গমের মতো খাদ্য পণ্যের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে স্তরে পৌঁছেছে। নভেম্বর ২০২১ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত খাদ্যের গড় মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৮ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি অনেক উন্নয়নশীল দেশেও মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও প্রভাবগুলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আটকে দেবে এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না, তবুও এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং উন্নয়ন ঝুঁকি তৈরি করে। তাই, বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ও জ্বালানি ঝুঁকির খারাপ প্রভাব মোকাবেলায় এখনই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আমরা যদি যুদ্ধের অতীত ইতিহাস দেখি সেখানে দেখি কোনো যুদ্ধই মানবসভ্যতার জন্য কল্যাণকর ছিলা না। প্রতিটি যুদ্ধ এবং যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা ছিল খুবই ভয়বহ উদ্বেগজনক। যুদ্ধ কখনো সভ্যতার ইতিবাচক বা সৃজনশীল পরিবর্তন আনতে পারে না, যার কারণে আমরা কোনোভাবেই যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারি না কিংবা করি না। যুদ্ধের মধ্যে আছে শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস এবং সাম্রাজ্যবাদীদের আধিপত্য বিস্তার। যুদ্ধ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ধ্বংস করে। যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছেন; সেই তারাই আজ অস্ত্র ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছেন।  শান্তির সাধারণ প্রতীক হল একাত্মতা, সহযোগিতা, মৌলিক অধিকার এবং সমঝোতা। এটি একটি সৃজনশীল পরিস্থিতি তৈরি করে, যা যুদ্ধের ধারণার বিপরীত।

শান্তি মানবসমাজের একটি মৌলিক অধিকার এবং জীবনের একটি প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা। শান্তির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি একটি সুস্থ, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রাধান্যমূলক শর্ত। শান্তি একটি দেশের অগ্রগতি এবং বৃদ্ধির সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শান্তির মাধ্যমে ভূখণ্ডে সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়।

যুদ্ধ নয়, শান্তিই পারে আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করতে। শান্তির সাহায্যেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, সাহিত্য এবং শিল্পের আদান-প্রদান সম্ভব হয়। এটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ করে। একটি শক্তিশালী এবং প্রগতিশীল সমাজের বলয় তৈরি করে।

শান্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নতিরও গুরুত্ব আছে। আর্থিক সমৃদ্ধি শান্তি ও স্থায়িত্ব সৃষ্টিতে সাহায্য করতে পারে, যেটি যুদ্ধের সময় অসম্ভাব্য। প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতি এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা এই দিকে একটি উত্তম পরিস্থিতি তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। অপরদিকে যুদ্ধের সময় অস্থির অবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থানের অস্থিরতা এবং মানবিক সম্প্রদায়ের ভাগ বিভাজন সমাজে দুর্বলতা এবং অস্থিরতা তৈরি করে।  এটি সমাজে আত্মসংজ্ঞান এবং সহযোগিতা নষ্ট করে, যা আরও বৃদ্ধি এবং উন্নতির সামর্থ্যকে হ্রাস করে। শান্তির অর্জনের জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বৌদ্ধিক পরিপ্রেক্ষিত প্রচেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। মানবসমাজে সম্পর্ক, সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা বৃদ্ধি এবং সমাজের উন্নতি নিশ্চিত করতে এই মূল উপায়গুলো অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।

মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, মানবিক সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী গড়ে তুলতে যুদ্ধ বন্ধের বিকল্প নেই। যুদ্ধ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, ভোগবাদী, দখলদারিত্ব,  চরম আত্মকেন্দ্রিকতার চিন্তাকে জাগিয়ে তোলে। ফলে মানুষ দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, খুন, হত্যার মতো কাজে নিজেকে জড়িয়ে একটা অমানবিক সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের এই ভয়বহতা থেকে পৃথিবীকে বাঁচানো জরুরি হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের এই ভয়বহতা থেকে মুক্তি পেতে সাম্রজ্যবাদী শক্তিগুলোকে অস্ত্রবিরতির সকল শর্ত মানতে হবে এবং সেই সাথে সকল প্রকার অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আজকের পৃথিবীর জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন নয়, প্রয়োজন মানবিক শক্তি, মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষার।

লেখক : শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর

বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy