বইপ্রেমী জাতি সমৃদ্ধ হবেই

অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার

মতামত

গবেষণায় দেখা গেছেÑ যদি আপনি প্রতিদিন একটি ভালো মানের বইয়ের পেছনে অন্তত ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেন, তাহলে

2023-10-15T15:35:41+00:00
2023-10-15T15:35:41+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
বইপ্রেমী জাতি সমৃদ্ধ হবেই
অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার
প্রকাশ: রোববার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩, ৩:৩৫ পিএম   (ভিজিট : ১০৮)
X

গবেষণায় দেখা গেছেÑ যদি আপনি প্রতিদিন একটি ভালো মানের বইয়ের পেছনে অন্তত ৩০ মিনিট সময় ব্যয় করেন, তাহলে সেই বইটি আপনার জীবনে কয়েক বছর আয়ু বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে। ৫০ বছর বয়স্ক ৩ হাজার ৬৩৫ জন মানুষের ওপর প্রায় ১২ বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালান লিয়েন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। তারা ওই মানুষকে তিনটি দলে ভাগ করেন। প্রথম দল, যারা একেবারেই বই পড়েন না। দ্বিতীয় দলটি সপ্তাহে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বই পড়েন। আর তৃতীয় দলটি সপ্তাহে সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় বই পড়েন। ফলাফলটা বেশ চমকপ্রদ। বইবিমুখ মানুষের চেয়ে বইপড়ুয়া মানুষ প্রায় দুই বছর বেশি বাঁচতে পারেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয় এই তিনটি পরিবর্তনশীল সূচকের ভিত্তিতে ওই গবেষণায় দেখা যায়, সপ্তাহে সাড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি বই পড়া দলটির মৃত্যুঝুঁকি বইবিমুখ দলের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ কম ছিল। আর সাড়ে তিন ঘণ্টার কম সময় বই পড়া দলটির মৃত্যুঝুঁকি বইবিমুখ দলের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম ছিল। অর্থাৎ বইপ্রেমীদের মারা যাওয়ার আশঙ্কা অন্য দলের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিকেল জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। লিয়েন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা গবেষণার মাধ্যমে দেখতে চেয়েছিলেন যে কীভাবে বই ও ম্যাগাজিন পড়া মানুষের জীবনচক্রের ওপর প্রভাব ফেলে। তারা জানান বই পড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মস্তিষ্কে জ্ঞানের পরিধি বাড়তে থাকে।
সম্প্রতি আরেকটি গবেষণা বলছে, উপন্যাস পড়লে মস্তিষ্কের সংযোগ সামর্থ্য ও সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি বই মানুষের মাঝে দয়া, বিনয় এবং সৃজনশীলতা বিকাশে সাহায্য করে। বিশ্ব সংস্কৃতি বলছে, সবচেয়ে বেশি পড়ার অভ্যাস রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড এবং চীন দেশে। শীর্ষ বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় টানা দুই বছর ধরে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের মানুষ সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ব্যয় করেছেন বই পড়ার পেছনে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে- ওখানে সাক্ষরতার হার কম হলেও যারা মোটামুটি শিক্ষিত, তারা পড়ার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করেন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। চীনের মানুষ বই পড়েছেন সপ্তাহে ৮ ঘণ্টা। তালিকার পেছনের সারিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। মার্কিনীরা সপ্তাহে গড়ে মাত্র ৫ ঘণ্টা ৪২ মিনিট বই পড়েন।
বইপড়া বা জ্ঞানার্জনের সঙ্গে মানবীয় গুণাবলির বিকাশ, গবেষণার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি, নেতৃত্ব ও ব্যবসাক্ষেত্রে সফলতার নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্ব প্রযুক্তির রাজধানীখ্যাত সিলিকন ভ্যালির তিন ভাগের এক ভাগ প্রকৌশলী ভারতীয়। গুগল, অ্যাডোবি, মাইক্রোসফট, আইবিএম, টুইটারের মতো স্বনামধন্য কোম্পানির সিইও ভারতীয়। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের শীর্ষ ১০ শতাংশ কোম্পানির সিইওর আসন অলংকৃত করে রেখেছে ভারতীয়রা। প্রতি বছর ব্যবসাক্ষেত্রে চরম সফল ৫০০ কোম্পানির তালিকা তৈরি করে ফরচুন ম্যাগাজিন। ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির ৩০ শতাংশ সিইও হলো ভারতীয়। সম্প্রতি সবচেয়ে কম খরচে ভারত সফলতার সঙ্গে চাঁদে রকেট উৎক্ষেপণ করেছে।
চীনের একটি ভাস্কর্যের কথা বলছি। ভাস্কর্যটিতে একটি ব্যালেন্সের এক পাশে হালকা গড়নের একজন তরুণ অনেক বই সঙ্গে নিয়ে বসে আছেন। অন্য পাশে একজন স্থূলকায় ব্যক্তি একটি বই হাতে বসে আছেন। ব্যালান্সটি কিন্তু অল্প বয়সী ছেলেটির দিকে হেলে পড়েছে। নিচের ক্যাপশনে লেখাÑ ‘তোমার ওজন কিলোগ্রাম অথবা আকারের ওপর নির্ভর করে না। বরং তা নির্ভর করে তুমি কতগুলো বই পড়েছ তার ওপর’। চীনারা জাতিগতভাবে এই কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। সে জন্যই হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে তারা জ্ঞানভিত্তিক উপনিবেশ তৈরি করেছে। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের ধমনি ও হৃৎপিণ্ডখ্যাত গণিত ও প্রোগ্রামিং পারদর্শিতায় চীনারা এখন বিশ্বসেরা। ফলে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে চীনাদের অবদান অনস্বীকার্য। তা ছাড়া বিশ্ব বাজারে শিল্পপণ্যের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে চীন।
বিস্ময়ের বিষয়টি হলোÑ বাংলাদেশের নাম নেই পড়ুয়া জাতির ওই লিস্টটিতে। অনেকে বলেন বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলক কম বই পড়েন। কিন্তু সেই কম আসলে কতটা, তা জানার কৌতূহল মেটাতেই ইন্টারনেটে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত তথ্য মিলল না। এর প্রথম কারণ হতে পারে বাঙালির পাঠাভ্যাস নিয়ে তেমন কোনো জরিপ বা গবেষণা হয়নি। আর দ্বিতীয় কারণ হতে পারে পড়ুয়া জাতির তথ্যভাণ্ডারে নিজেদের কীভাবে সংযুক্ত করতে হয় বা এর জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কি কি শর্ত পূরণ করতে হয় তা আমরা জানি না। কারণ যাই হোক না কেন আমাদের পাঠাভ্যাস নিরূপণের বিষয়টি জাতির সত্যিকার সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক।
বিদেশে অধ্যয়নকালে বইপ্রেমী একটি জাতিকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। ট্রেনে কারও হাতে বই থাকতে পারে কিন্তু লোকাল বাসে দাঁড়িয়ে কেউ পড়েন? মেট্রোরেলে? হ্যাঁ ওই দেশটিতে পড়েন। এমন একজন দুজন নয়, শত শত। কি বই তারা পড়েন? শুধুই কি গল্প-উপন্যাস? না। কেউ খেলাধুলা, কেউ ফ্যাশনের, কেউ জাদুর, কেউ বিজ্ঞানের, কেউ গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানের, কেউ দর্শনের, কেউ জীবনযাপন প্রণালির, কেউ পড়েন চিরায়ত বই। কর্মজীবীরা নিজের কাজে আরও পারদর্শী হওয়ার জন্য, উন্নতি করার জন্য বই পড়েন। আমরা কর্মক্ষেত্রে ঢুকে পড়লে ভাবী, পড়া শেষ! আর বইপ্রেমী জাতি ভাবে নতুন ক্ষেত্রে পড়া শুরু। আমাদের সংস্কৃতিতে কিছু বইকে ‘পাঠ্যবই’ নাম দিয়ে প্রকারান্তে অন্য বইগুলোকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে। আবার স্কুল-কলেজে সৃজনশীল প্রশ্নের কারণে পাঠ্যবই তার গুরুত্ব হারিয়েছে। কারণ পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে গাইড বই-ই মূল ভরসা। ফলে গাইড বইয়ের ভিড়ে পাঠ্যবইয়ের জীবনপ্রদীপ নিবু নিবু করে জ্বলছে। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির যুগে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের হতে হবে জ্ঞান অন্বেষণে বদ্ধপরিকর, প্রকৃত বইপ্রেমী।
বর্তমান সরকারের সবার জন্য শিক্ষানীতি বাস্তবিক অর্থে প্রশংসার দাবি রাখে। জনসংখ্যার অনুপাতে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ একেবারেই সীমিত। তাই জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার বিকল্প পথ আছে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু যেকোনোভাবে পরিশ্রম করে গেলেই সফলতা আসবে এটা অবধারিত। পরিশ্রম করতে হবে সঠিক উপায়ে, সঠিক পদ্ধতিতে ও সঠিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে। অনেকেই অজুহাত দেন, দিকনির্দেশনা দেয়ার মতো কেউ নেই। কিন্তু আমরা কি জানি, বই জীবনের অন্যতম সেরা দিকনির্দেশক। জীবনকে বদলে দেয়ার মতো সঠিক দিকনির্দেশনাগুলো লেখা থাকে বইয়ে। একবার ভাবুন তো, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠনকারী অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, ভোগ-বিলাসে মত্ত ব্যক্তি কি কখনো বই লিখেছেন? এটা হলফ করে বলা যায়, নেতিবাচক চিন্তার ভোগবাদী মানুষের পক্ষে বই লেখা সম্ভব নয়। বই লেখেন শুদ্ধ ও গভীর চিন্তাসম্পন্ন সমাজের সুশীল ও শুভ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। পৃথিবী যারা গড়েছেন, জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন যারা ঘটিয়েছেন, তারা কেউ কিন্তু সাধারণ মানুষ নন। তাদের জীবনোপলব্ধি, জীবনকালের অভিজ্ঞতা, কর্মপন্থা ও জীবনদর্শনই কালো অক্ষরে উপস্থাপিত হয় আমাদের সামনে বই আকারে। তাই বইপড়া মানে সত্যিকার অর্থে ওই গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা। বই পড়তে গিয়ে কখনো ভাববেন না আপনি পড়ছেন, ভাবুন কালো অক্ষরের জাদুতে কোনো অসাধারণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন বা গল্প করছেন। দেখবেন পড়তে গিয়ে কষ্ট হচ্ছে না বরং আনন্দ পাচ্ছেন। বইবিমুখী জাতি কখনই উন্নয়নের সঠিক পথ খুঁজে পায় না। জাতি যত বেশি বইবিমুখী হবে তত বেশি ভোগ-বিলাসে মত্ত মোটা বুদ্ধির জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।
ভারত ও চীনের মতো বাংলাদেশের পাঠাভ্যাসের প্রকৃত চিত্র আমাদের সামনে দৃশ্যমান হলে জাতির সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনা করা সহজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। এতে সমৃদ্ধ হবে জাতি, এগিয়ে যাবে দেশ।

 লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy