স্মার্ট বাংলাদেশ বনাম ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি

মো. শাহিন হাওলাদার

মতামত

স্মার্ট বাংলাদেশের চারটি স্তম্ভ ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলÑ স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট সোসাইটি, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট গভর্নমেন্ট।

2023-10-15T15:57:20+00:00
2023-10-15T15:57:20+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
স্মার্ট বাংলাদেশ বনাম ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি
মো. শাহিন হাওলাদার
প্রকাশ: রোববার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩, ৩:৫৭ পিএম   (ভিজিট : ৯৯)
X

স্মার্ট বাংলাদেশের চারটি স্তম্ভ ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলÑ স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট সোসাইটি, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট গভর্নমেন্ট।  ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে পথে অগ্রসর হতে আমরা আমাদের নেতৃত্ব ও জনমানসে কতটুকু স্মার্টনেস-এর ধারণা সৃষ্টি করতে পেরেছিÑ এমন প্রশ্ন তোলা যায়।
মেগাপ্রকল্প ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সত্ত্বেও সরকারের কিছু কিছু ব্যর্থতা এ সমস্ত উন্নয়নের সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি, অর্থপাচার, ডলার সংকট, রিজার্ভের নিম্নগামী প্রবাহ- এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সব বিষয় নিয়ে আলোচনা না করে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দায়ভার নিয়ে আলোচনা করা যাক। স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট সেবা পেতে, কিংবা জনগণকে স্মার্ট করতে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে দেখা যাচ্ছে না। তাই ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি রূপ ধারণ করছে। ঢাকার দুই মেয়র এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তাছাড়া ঢাকাবাসীর মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে জনসচেতনা সৃষ্টিতে এ দুই সিটির মেয়রদ্বয় তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি।
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আর এই রোগের ভাইরাস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার পরেও সেদিকে নজর না দেয়ায় এই বছরে ডেঙ্গু মারাত্মক হয়ে উঠেছে বলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটে চললেও সেদিকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে এই বছরে মৌসুমের আগে আগে সেটা প্রকট হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগটি নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা, নজরদারি নেই। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে আসছে। কিন্তু এর বাইরেও যে বিপুল মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের তথ্য কোথাও নেই।
ঢাকা শহরে ডেঙ্গুজ্বর একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মশাবাহিত এ রোগের বিস্তার রোধে জরুরি পদক্ষেপ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন কি ডেঙ্গু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
ক্রমবর্ধমান এ হুমকি মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপের প্রয়োজন আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর কৌশল, যেমন মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান ও উন্নত স্যানিটেশন অনুশীলনগুলো ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রশমিত করার জন্য প্রয়োগ করা উচিত ছিল, কিন্তু তা এ দুই মেয়র করতে পারেননি।
আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ (ক, গ ও ঘ) ধারা অনুযায়ীÑ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, চিত্তবিনোদন এবং সামাজিক নিরাপত্তাÑ এই সাতটি চাহিদাকে মৌলিক মানবিক চাহিদা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মৌল মানবিক চাহিদার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানবজীবনে এগুলোর পরিপূরণ অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের সংবিধানে উল্লেখ এ চিকিৎসা সেবা পেতেও জনসাধারণকে হিমশিস খেতে হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার খুবই নাজুক পরিস্থিতি। এদিকে দেখা যাচ্ছেÑ ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে পুঁজি করে অসাধু সিন্ডিকেট ডাবের দাম তিন-চার গুণ বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণের পকেট কাটছে, স্যালাইনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে  বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবিভাগ তেমন সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি। ডেঙ্গুরোগীর উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তীব্র হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটিই ইঙ্গিত দেয়। আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য প্রাথমিক শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসাসেবা ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকায় ডেঙ্গুজ্বরের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন বেশ কয়টি অনন্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একটি বড় বাধা হলো শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব, যেখানে লাখ লাখ বাসিন্দা অপেক্ষাকৃত ছোট এলাকায় বসবাস করে। মানুষের এই উচ্চ ঘনত্ব ডেঙ্গু বহনকারী মশার বংশবৃদ্ধি ও সংক্রমণের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। উপরন্তু, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো আরও ডেঙ্গু বিস্তারে অবদান রাখে। সঠিক নিষ্কাশনব্যবস্থার অভাব ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে ডেঙ্গুর হুমকিকে বাড়িয়ে তোলে। অতীতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নানা প্রচেষ্টা দেখা গেলেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাদের সাফল্য সীমিতই বলা যায়।
মশাবাহিত এ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ–নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানগুলো সঠিক তথ্য প্রচারে, মিথকে উড়িয়ে দিতে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কার্যকর কৌশল প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিকন্তু, স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র নির্মূল, মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা পেশাদার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের যুক্ত করা—যেমন সরকারি সংস্থা, অলাভজনক সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সংস্থা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, সামাজিক সংস্থাসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তথ্য, সম্পদ ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য ঘনিষ্ঠভাবে একে ওপরকে সহযোগিতা করতে হবে। এই সমন্বিত কর্মকাণ্ডে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক প্রচারণা থেকে শুরু করে কার্যকর চিকিৎসা ও মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুই যুক্ত থাকবে এবং সেগুলো প্রয়োগ, বাস্তবায়ন বা কার্যকরাও নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সরবরাহ সংগ্রহ, জনস্বাস্থ্য প্রচারাভিযান বাস্তবায়নসহ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে সমর্থন করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করতে হবে। তারপরও একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন অপরিহার্য। একটি বিস্তৃত সিস্টেম থাকতে হবে, যা রিয়েল টাইম ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও রিপোর্টিং অন্তর্ভুক্ত করে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও লক্ষ্যযুক্ত হস্তক্ষেপে সক্ষম হবে।
কাজেই স্মার্ট বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য যদি নেতৃত্ব, নাগরিক সেবা ও জনসাধারণকে স্মার্টসেন-এর আওতায় আনা; সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গদবাঁধা কার্যক্রমে আমরা কতটুকু স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা যাবেÑ এমন প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয়।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও মানবাধিকারকর্মী






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy