
X
সারা পৃথিবীর সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসন এখন প্রযুক্তিনির্ভর। বিশেষ করে ডাটা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হচ্ছে। ঘরে বসে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আয়-রোজগার করার সুযোগ বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররাও পাচ্ছেন। স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তা তথা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের দেশে কোথাও কোথাও ব্যবহার হতে শুরু করেছে। তার মানে ধীরে ধীরে আমাদের মতো দেশেও সবকিছু প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আরও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সক্ষম করে তোলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ধীরে হলেও শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। আমাদের দেশ থেকে আজকাল যেসব তরুণ বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, তাদের সিংহভাগই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় ঢুকে পড়ছে। কেননা পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থা সেভাবেই রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আর শিক্ষার এই রূপান্তর বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজের ব্যাপক রূপান্তরেরই প্রতিচ্ছবি।
এমনই এক সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝোঁকের বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিশেষ করে কোভিডকালে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছিল তার রেশ কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। তবে এখন আবার আমরা সামনাসামনি শিক্ষা-শিক্ষণে ফিরে গেছি। তবুও কোথাও কোথাও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার চল এখনো চালু আছে। বলা যায়, ব্লেন্ডেড শিক্ষাব্যবস্থার সম্ভাবনার দিকটি এখন আরও বেশি করে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু সম্ভাবনার সুযোগ কোভিডকালের মতোই সবাই সমান হারে পাচ্ছে না। সব শ্রেণির শিক্ষালয় ও শিক্ষার্থীর ডিভাইসও নেই। সে কারণেই সবার মাঝে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই বাস্তবতাতেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা স্মার্ট বাংলাদেশের ধারণাটি সামনে নিয়ে এসেছেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস’-এর উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তবতা। স্মার্ট বাংলাদেশ ও স্মার্ট জাতি গঠনই আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।... কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা, উদ্দীপিত বাস্তবতা, রোবটিক্স অ্যান্ড বিগ-ডাটা সমন্বিত ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে চায়।’ খুব সংক্ষেপে আমাদের আগামীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথনকশাটিই যেন তিনি তুলে ধরেছেন। সারা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি এ নবযাত্রার সূচনার কথা বলেছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের সমাজ এবং অর্থনীতিও বদলে গেছে। বদলে যাচ্ছে। অচিরেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সামনে রয়েছে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জাতীয় লক্ষ্য। এজন্য আসলেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করার বিকল্প নেই।
আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অদক্ষ প্রবাসী শ্রমিক এবং গার্মেন্ট রপ্তানি এখনো অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলেছেÑ এ কথা সত্য। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পরের পর্যায়ে প্রবেশ করতে আরও সৃজনশীল ও দক্ষ জনশক্তির যে প্রয়োজন, সে কথাটি নিশ্চয় অস্বীকার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আইসিটিভিত্তিক শিল্পসেবা রপ্তানির প্রসার একটি যথাযথ পথ হতে পারে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) প্রক্ষেপণ অনুসারে, ২০২৫ সাল নাগাদ তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে আমরা ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে পারব। আর ২০৩১ সাল নাগাদ এই পরিমাণ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানো খুবই সম্ভব। বলা বাহুল্য, এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারলে ডলার আয় কিংবা রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করা অনেকখানি সহজ হয়ে আসবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের যে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে তা সর্বজনবিদিত। সমতুল্য অন্য দেশগুলোর থেকে জনশক্তির গড় বয়সের বিচারে আমরা অনেকখানি এগিয়ে আছি। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০২১-এ আমাদের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ ‘ওয়ার্কিং এইজ পপুলেশন’ তথা শ্রমবাজারে নিয়োজিত হওয়ার উপযোগী বয়সের মানুষ। তাদের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৩০ নাগাদ এই অনুপাত আরও দুই পয়েন্ট বেড়ে ৫৭ শতাংশ হবে। তবে এই জনসংখ্যাকে প্রকৃত অর্থেই জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে তাদের জন্য যুগোপযোগী বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষাদান পদ্ধতিরও ডিজিটালাইজেশন দরকার। বিশেষত করোনাকালে আমরা শিক্ষাদান পদ্ধতির ডিজিটালাইজেশনের প্রয়োজনীয়তাটুকু বেশি করে অনুভব করেছি। ওই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হওয়ায় যে ক্ষতি হচ্ছিল তা পুষিয়ে নিতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনরা নানামুখী ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় কিছুটা উপকার হয়েছিল। কিন্তু সবার পক্ষে দূরশিক্ষণের সুফল সমানভাবে ভোগ করা সম্ভব হয়নি। কেননা দেশের ৪০ শতাংশেরও কম মানুষের ইন্টারনেট অ্যাকসেস আছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও মাত্র ৪৫ শতাংশের উপযোগী ইন্টারনেট কানেকশন ছিল বলে এক জরিপ থেকে জানা গেছে।
দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনে আমাদের এখনো অনেক উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে নানামুখী সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলো থেকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলো বিশেষ সহায়ক হবে বলেই মনে হয়। টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা একাধিক লার্নিং প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া ব্যক্তি খাতেও আমাদের একাধিক লার্নিং প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে বলা যায়। কাজেই শিক্ষাদান পদ্ধতির ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্ব আমাদের নীতিনির্ধারকরা ঠিকই উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। তবে তাদের চেয়েও এগিয়ে রয়েছে তরুণ সমাজ। ইতোমধ্যে প্রায় আট-দশ লাখ তরুণ ডিজিটালকর্মী বা স্বউদ্যোক্তা নিজে নিজেই প্রযুক্তি রপ্ত করে ফ্রিলান্সিং কাজে যুক্ত হতে পেরেছে। তারা করে করে শেখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও ‘করে শেখা’র গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন। ২১ জুলাই ১৯৭৫-এ বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেনÑ ‘কেউ করে শেখে, কেউ দেখে শেখে আর কেউ বই পড়ে শেখে। আর সবচেয়ে যে বেশি শেখে সে করে শেখে।’ নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই এগিয়েছে আমাদের শিক্ষা খাত (বিশেষত গত ১৩-১৪ বছরে)। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের সংখ্যাবাচক অর্জন কিন্তু নিতান্ত কম নয়। প্রাথমিক শিক্ষায় নেট এনরোলমেন্ট ৯৮ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৭০ শতাংশ এবং দুই স্তরেই নারী-পুরুষ ভর্তিতে সাম্য, কারিগরিতে এনরোলমেন্ট স্বল্পতম সময়ের (৬ বছর) মধ্যেই ৬ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশ করা গেছে। প্রতিবন্ধীসহ সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে আমাদের নেওয়া প্রণোদনা উদ্যোগগুলোর সাফল্য তো সারা বিশ্বেরই স্বীকৃত। তবে আমার মতে, ১৯৭৪-এর শিক্ষা কমিশনে যে পথনকশা দেওয়া হয়েছিল তার সংখ্যাবাচক দিকগুলো অর্জনে আমরা যে সাফল্য দেখাতে পেরেছি, গুণবাচক দিকগুলো বাস্তবায়নে ততটা সফল হতে পারিনি। সবার জন্য শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কাজটি আমরা ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে শিক্ষার গুণমান এবং কর্মমুখিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক কাজ যে বাকিÑ তা মানতেই হবে। বিশেষ করে নির্মাণনির্ভর শিক্ষা অবকাঠামোর ওপর যতটা জোর দিচ্ছি তার চেয়ে ঢের বেশি জোর উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর দেওয়া দরকার ছিল। কারিগরি শিক্ষার হার নিঃসন্দেহে বেড়েছে। কিন্তু সেখানেও হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সুযোগ বাড়ানো যে দরকার, তা মানতেই হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষাকে চলমান রূপান্তরমুখী শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে আরও জোরালোভাবে করা যায় কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ভাবার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার সংখ্যার পাশাপাশি তার গুণগত মানের বিষয়টি সমান গুরুত্বসহ ভাবা দরকার।
শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধির জন্য তো কাজ করতেই হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার কর্মমুখিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া চাই। আর এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিকস তথা স্টেম বিষয়ে শিক্ষার দিকে। আগেই বলেছি, কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট ৬ বছরের ব্যবধানে ৬ থেকে ১৬ শতাংশে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি। তবে মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যারা কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হচ্ছে তাদেরও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কেবল টারসিয়ারি পর্যায়ে (অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়) স্টেম বিষয়ে পড়ালেখা করছে এমন শিক্ষার্থীদের অনুপাত মোট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর তুলনায় ১১ শতাংশের সামান্য বেশি। বলা বাহুল্য, এই অনুপাতটি দরকারের তুলনায় অনেক কম। প্রতিবেশী ভারতে এই হার প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি মালয়েশিয়ায় এই হার আরও বেশি (৪৪ শতাংশ)।
জনশক্তির যথাযথ ব্যবহারে তুলনামূলক বেশি সফল হওয়া দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বলা যায় যে, স্টেম শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এই উন্নতি করা দরকার। এ ক্ষেত্রেও আমরা ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। ভবিষ্যতের কর্মশক্তিকে স্টেম শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের মালয়েশিয়া এডুকেশন ব্লু প্রিন্ট (এমইবি) ২০১৩-২০২৫ থেকে আমরা শিখতে পারি। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ইতোমধ্যেই সে দেশে স্টেম শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর অনুপাত ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর প্রথম তিন বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের মধ্যেই সে দেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্টেম শিক্ষায় ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২০২৫-এর মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশেরও স্টেম শিক্ষার প্রসারে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দাঁড় করিয়ে তার ভিত্তিতে এগোনো দরকার। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং সর্বোপরি ব্যক্তি খাতের অংশীজনদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা স্টেম শিক্ষার বিস্তারের নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করতে পারব, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণেও সহায়ক হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশের যে সময়োচিত লক্ষ্য আমাদের সামনে এসেছে, তা বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত, জনশক্তিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষাদান পদ্ধতির যেমন আধুনিকায়ন দরকার, তেমনি দরকার শিক্ষার বিষয়বস্তুর আধুনিকায়নও। এসব ক্ষেত্রেই আমরা ইতোমধ্যে কিছু কিছু সফলতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। অন্য দেশের সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে যেমন শিক্ষা নিতে হবে, তেমনি নিজেদের সাফল্য-ব্যর্থতাগুলো থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। এভাবেই আমরা নিজেদের পথটি পেয়ে যাব এবং সে পথ ধরে এগোতে পারব। আগামীতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক শিক্ষার ওপর তাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারেও তার প্রতিফলন দেখতে হবে। তবে এ কথা অনিস্বীকার্য যে, উপযুক্ত মানবশক্তি নির্মাণই হতে হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য। মানবতার গৌরব অর্জনের অংশীদার হবে আমাদের শিক্ষার্থীরা, তেমন প্রত্যাশাই আমরা করি। ঠিক যেমনটি রবীন্দ্রনাথ তার ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে বলেছেনÑ ‘চিত্তের গতি অনুসারেই শিক্ষার পথনির্দেশ করিতে হয়। ... নানা লোকের নানা চেষ্টার সমবায়ে আপনিই সহজ পথটি অঙ্কিত হইতে থাকে। এজন্য সকল জাতির পক্ষেই আপন পরীক্ষার পথ খোলা রাখাই সত্যপথ-আবিষ্কারের একমাত্র পন্থা।’ আমাদের জাতীয় জীবনেও নয়াধাঁচের সৃজনশীল শিক্ষার আলোকে তেমন সত্য-আবিষ্কারক শিক্ষার্থী তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক সেই আশাই করছি। তবে এটি এক লাফেই সম্ভব নয়। সে পথে আমাদের ধীরে ধীরে হাঁটতে হবে। কারণ সেটিই সঠিক পথ।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর