শঙ্কা আছে, মেঘ কাটানোর পথও রয়েছে

আব্দুল বায়েস

মতামত

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে বেশ চাপের মধ্য দিয়ে চলছে তা স্বয়ং সরকারপ্রধানও স্বীকার করেন। তবে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার

2023-10-24T15:25:22+00:00
2023-10-24T15:25:22+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
শঙ্কা আছে, মেঘ কাটানোর পথও রয়েছে
আব্দুল বায়েস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৩, ৩:২৫ পিএম   (ভিজিট : ১১৭)
X

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে বেশ চাপের মধ্য দিয়ে চলছে তা স্বয়ং সরকারপ্রধানও স্বীকার করেন। তবে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার কার্যকারণ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। মোট কথা, ইদানীং নিম্নমুখী রিজার্ভ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের দাম উদ্বেগের উৎস হয়ে উঠছে, চায়ের কাপে ঝড় তুলছে, গুজবের জন্ম দিচ্ছে। এমন একটা অবস্থা সাম্প্রতিককালে বিশেষত গেল দুই দশকে পরিলক্ষিত হয়নি। ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত যে ফুরফুরে মেজাজে অর্থনীতি সামনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল রেকর্ড অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস, সহনীয় মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক নির্দেশকে অগ্রগতি ইত্যাদি ইতিবাচক দিক নিয়ে বিশ্বের দরবারে সদর্প বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যায় পাকিস্তান, ভারত এমনকি শ্রীলঙ্কাকে। কিন্তু হঠাৎ ধেয়ে আসা করোনার কারণে যেমন সারা বিশ্বে, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতির নৌকা বিরূপ আবহাওয়ায় পড়ল বটে; তবে সুপক্বতার কারণে তখন সংকট উৎরাতে সক্ষম হয়। 

কিন্তু তবুও সংকট যেন শেষ হয়েও হলো না শেষ। এটা শুধু আমাদের বেলায় নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিনা পূর্বাভাসে সংঘটিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিল। এখন আবার ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট প্রকট হয়ে ওঠার এরও বিরূপ ধাক্কা নানাক্ষেত্রে পড়তে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে খাদ্যসামগ্রী, বিশেষত গম ও সার আমদানিতে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশ পড়ল বিপাকে। একদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে পতন যেন হু-হু করে বেড়ে ওঠা মূল্যস্ফীতির আগুনে জ্বালানি দিল; অন্যদিকে দ্রুত পতন ঘটতে লাগল রিজার্ভের। এরই মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে সংলাপ শেষে শর্তযুক্ত ঋণপ্রাপ্তি পরিস্থিতি খাদের কিনারে যেতে দেয়নিÑ এই যা রক্ষা। 

দুই.
বাংলাদেশকে এখন দারুণ চিন্তায় ফেলেছে অনেক কিছু, তবে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ধস এবং রিজার্ভের ক্ষয় নিদ্রা হরণের অন্যতম প্রধান কারণ। সবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণের আশ্বাস দিচ্ছে, তাতে মূল্যস্ফীতি বাগে আসতে পারে। তাই আলোচনা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে সীমিত রাখা শ্রেয় বলে মনে করছি। প্রসঙ্গত, উল্লেখ করতে চাইÑ যারা বলছেন আমরা খুব ভালো আছি, সবকিছু ভালো চলছে; তারা যেমন ঠিক নন, তেমনি ভুল করছেন গেল গেল অর্থনীতি গেল, আর মাত্র কদিন তার মধ্যেই সব শেষÑ এ জাতীয় যুক্তিতর্ক দিয়ে যারা আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন তারাও। দেশের বর্তমান নাজুক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেদিকে নজর দেওয়া হবে এই মুহূর্তের সহি কাজ। ডুবন্ত মানুষটিকে আগে উদ্ধার এবং পরে বকাবকি করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ধরা যাক রিজার্ভের পতন নিয়ে পর্যালোচনা। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ১২ অক্টোবর প্রথম পাতায় মোটা হরফে করা শিরোনামে প্রশ্ন রেখেছেÑ ‘রিজার্ভ নিয়ে কেন এত আলোচনা।’ তারপর এক বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা পেশ করে জানান দিচ্ছে যে, ২০২১ সালের আগস্ট মাসের ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অবশ্য ইডিএফ ফান্ডের আট বিলিয়ন বাদ দিলে রিজার্ভ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার। অতএব বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়, দ্রুততার সঙ্গে রিজার্ভ ক্ষয় এবং তার ভয়ানক পরিণতির দিকে লক্ষ্য রেখেই রিজার্ভ নিয়ে এত আলোচনা এবং এই নিবন্ধ লেখার প্রয়োজনীয়তা।

তিন.
যেকোনো দেশে রিজার্ভ অনেকটা বাড়ির ছাদে রাখা পানির ট্যাংক কিংবা চৌবাচ্চার মতো। একদিক দিয়ে পানি প্রবেশ করবে, অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে সেই পানি প্রাপকের চাহিদা পূরণ করবে। ঠিক যে হারে পানি বের হবে ঠিক সেই হারে পানি প্রবেশ করলে ভারসাম্য অবস্থা বজায় থাকে, নচেৎ হয় পানি উপচে পড়ে অপচয় ঘটাবে, নয়তো বাসিন্দারা পানিবঞ্চিত হবে। আবার পানি যেমন মানুষের জীবন, রিজার্ভও তেমনি একটা অর্থনীতির জীবন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাটি সচল রাখতে যেসব মালমসলা দরকার তার সিংহভাগ আসে বিদেশ থেকে এবং তা কিনতে হয় বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। সুতরাং বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ না থাকলে (অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমতুল্য) অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি হতে পারে ( যেমনÑ অধুনা শ্রীলঙ্কায়)। অন্যদিকে অতিরিক্ত রিজার্ভও যে অর্থনীতিকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে সে বিষয়ে আপাতত দৃষ্টি নাইবা দেওয়া হলো। 
প্রথমে আসে মিলিয়ন ডলার প্রশ্নÑ ডলার তথা রিজার্ভের দ্রুত পতন ঘটছে কেন? এর আগে, বিশেষ করে গেল দুদশকে, কেন এমন পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়নি? সোজা কথায় এর উত্তর হচ্ছে, যে হারে চৌবাচ্চার পানি ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চেয়ে কম হারে চৌবাচ্চায় পানি প্রবেশ করছে। হুন্ডির কারণেÑ ইংরেজিতে বলে ইনফরমাল চ্যানেলÑ বিদেশ থেকে পাঠানো ডলার দেশে ঢুকছে ঠিকই, তবে ব্যাংকে জমা হচ্ছে না। হুন্ডিতে ডলারের দাম সরকারি রেটের চেয়ে বেশ বেশিÑ ডলারপ্রতি ৭-১০ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ডলার এলে তাকে দেওয়া হবে ১০০ টাকা আর প্রেরক যদি হুন্ডির দ্বারস্থ হয়, তা হলে সে পাবে ১০৭-১১০ টাকা। সুতরাং যতদিন হুন্ডি ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকবে কিংবা হুন্ডির বাজার রমরমা থাকবে ততদিন সরকারি পাতে ডলার পড়বে না। অন্যদিকে, প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে আমাদের রপ্তানি আয়ও পড়ন্ত যার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের মতো স্ফীত হচ্ছে না। দুই, আমদানি ব্যয় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছেÑ হোক সে যুদ্ধের কারণে কিংবা টাকার মান নিচে নামার জন্য। সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যে যথাযথ কাজ করেনি বিষয়ে সমালোচনা আছে এবং অভিযোগ আছে, কার্যকর হয়ে থাকলেও তা কাঁচামাল কিংবা পুঁজি পণ্য প্রবাহ ব্যাহত করে রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আবার শুনছি, সরকারি কর্মচারীদের জন্য কয়েকশ গাড়ি আমদানির প্রস্তাব উঠেছে। তা ছাড়া এই সংকটকালেও তো দেখা যাচ্ছে অযাচিত বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসজাতীয় পণ্য আমদানি কমছে না। বিভিন্ন ছুতায় সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণ আগের মতোই। এ ধরনের বিলাসজাত পণ্য আমদানি এবং ‘আনন্দ সফর’, এমনকি ব্যক্তি খাতের, নিরুৎসাহিত করে ডলার সাশ্রয় করা উচিত ছিল। তিন, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার বিদেশে রাখা এবং বিশেষত নির্বাচনের পূর্বে বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি ডলার সংকট সৃষ্টির পেছনে নিয়ামক হিসেবে শুধু কাজ করেছে বলে মনে হয় না, চলমান পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। 

চার.
যা-ই হোক, রিজার্ভের বর্তমান পরিস্থিতিকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে দেখার তেমন কোনো অবকাশ নেই। রিজার্ভের পতন ঠেকানো এখন জরুরি কাজ। রেহমান সোবহান বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে যাওয়ার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার মিল রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিঃসন্দেহে শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। কারণ আমাদের বড় একটি রপ্তানি খাত আছে। সেই সঙ্গে আছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়Ñ যা শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি। সে কারণে বিশ্বাস করি না, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কখনও শ্রীলঙ্কার মতো হতে পারে।’

পাঁচ.
এটা অনস্বীকার্য যে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে তবে উৎকণ্ঠার তেমন কিছু নেই। রিজার্ভ বৃদ্ধি বা ধরে রাখার অন্যতম উৎস বৈদেশিক বিনিয়োগ। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস হলেও কিন্তু আপাতত আগামী সরকার না আসা পর্যন্ত বৈদেশিক বিনিয়োগজনিত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। তবে যদি তাৎক্ষণিক বিবেচনা করা যায়, তা হলে বোধ হয় পরিস্থিতি তেমন নাজুক নাও হতে পারেÑ (ক) ডলারের বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ করে দেওয়া; (খ) বিভিন্ন দেশ বা সংস্থার পাইপলাইনে থাকা সাহায্য বা অনুদান দ্রুত অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করা; (গ) ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বাড়ানো সংকট মোচনের মোক্ষম মাধ্যম; (ঘ) পণ্যের বহুমুখিতার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং কড়া নজরদারিতে আমদানি- রপ্তানি রাখা এবং দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকানোর কৌশলের সন্ধান করা। 

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ইতিবাচক প্রাক্কলন এবং ভালো ফলনের জন্য হয়তো আগামী আমন পর্যন্ত চাল আমদানি করা লাগবে নাÑ এমন সংবাদ আশার বাণী বয়ে আনে বৈকি। 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy