রাজনীতিতে সহিংসতা সুফল দেয় না

এ কে এম শাহনাওয়াজ

মতামত

ক্ষমতা পরিবর্তনের তিনটি তরিকা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে দেখা যায়। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে এসব তরিকার ব্যবহার আমরা দেখেছি।

2023-11-01T15:44:48+00:00
2023-11-01T15:44:48+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
রাজনীতিতে সহিংসতা সুফল দেয় না
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০২৩, ৩:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ১৪৩)
X

ক্ষমতা পরিবর্তনের তিনটি তরিকা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে দেখা যায়। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে এসব তরিকার ব্যবহার আমরা দেখেছি। সবচেয়ে সভ্য তরিকা হচ্ছে গণতন্ত্রের পথে হাঁটা। রাষ্ট্রের সংবিধানকে মেনে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে জনমত গঠন করা। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইলে সুশাসন নিশ্চিত করে জনসমর্থন ধরে রাখা। বিরোধী দলকে ক্ষমতায় আসতে হলে নিয়মতান্ত্রিক পথেই থাকার কথা। রাজনীতি দিয়ে রাজনীতির মোকাবিলা করে জনসমর্থন আদায় করতে হবে। বাকিটা নির্ধারণ করবে নির্বাচন। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায় করতে হবে সরকারের দুর্বলতাগুলো সামনে এনে চাপ সৃষ্টি করে। এসব হবে রাজনৈতিক কৌশলের চাপ। দ্বিতীয় তরিকা হলো, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন করা। স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্র নির্বাসনে দিয়ে এ অস্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতায় যেতে হয়। আর শেষ পন্থা হলো গণতন্ত্রবিরোধী পথে পেশিশক্তি প্রদর্শন করা। ব্যাপক সহিংসতার পথে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা। যেসব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হেঁটে ক্ষমতা পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখেন না বা তেমন আত্মবিশ্বাস নেই যাদের, তারা জনশক্তির প্রতি বিশ্বাসী হন না। পাশাপাশি এসব রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর ক্ষমতায় আসার জন্য তাড়াহুড়ো থাকে। তারাই চান বড় রকমের সহিংসতা ঘটিয়ে সরকার হটাতে। দুর্বল রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে কখনো কখনো এ পথে পটপরিবর্তন সম্ভব হয়। না হলে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে।

বিএনপি-জামায়াত সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তন করতে চেষ্টা করেছে একাধিকবার। কিন্তু বিপক্ষে আওয়ামী লীগের মতো পুরোনো আন্দোলন-সংগ্রামে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলকে বিপথে হাঁটানো সম্ভব হয়নি। এতে রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াত ও বিএনপি উভয় দলেরই ক্ষতি হয়েছে বেশি।

আমরা মনে করি, এবারে নিয়মতান্ত্রিক পথে আওয়ামী লীগ সরকার ও দলের সামনে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। একটি সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে এমনিতেই জনপ্রিয়তায় কিছুটা সংকট তৈরি হয়। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা বিস্ময়কর উন্নয়নমূলক কাজ করে সে সংকট কাটানোর চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু এতে খুব সফল হয়েছেন বলে মনে হয় না। ব্যাপক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি সরকারকে কিছুটা ব্যাকফুটে ফেলে দেয়। দলীয়করণের বিষয়টিকেও অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। কিন্তু দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক সক্ষমতা দেখাতে পারেনি বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। অন্যদিকে বিএনপির কোনো কোনো নেতা অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। তাই রাজনীতির ব্যাকরণ না মেনে নিজেদের পেশিশক্তির ক্ষমতাকে হিসাবে না রেখে অমানবিকভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে মোক্ষে পৌঁছতে চেয়েছেন। এ পথে সংগত কারণেই হোঁচট খেয়েছেন বারবার। তবুও ভুল পথ পরিবর্তন করতে পারেননি। এ কারণেই ২৮ অক্টোবর অমানবিক সহিংসতা দেখতে হলো রাজধানীতে।

সীমান্তের কাছাকাছি গ্রামের একটি পরিবারের গল্প শুনেছিলাম। পরিবারটির মধ্যে তেমন শিক্ষার আলো ছিল না। বর্তমান প্রজন্মের স্বল্পশিক্ষিত ছেলেটির দাদা মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রাণ হারান। বাবার নাকি এক সময় পেশা ছিল চুরি করা। এরপর চোরাকারবারি হিসাবে বেশ নামডাক হয়। নব্বইয়ের দশকে ছেলেটি ইতালিতে চলে যায়। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রচুর পয়সা-কড়ি পাঠায় দেশে। বিপুল অর্থের মালিক হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ভদ্রলোক। টাকা-কড়ি ছড়িয়ে একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। এবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পড়েন। নিজের ওজন না বুঝলে যা হয়। শোনা যায়, তিনি নিজের পরিবারের সবার ভোটও নাকি পাননি।

বিএনপির ২৮ অক্টোবরের সব আয়োজন এবং অঘটন দেখে তেমনই মনে হলো আমার। বড় বড় সফল সমাবেশ দেখে বিএনপির স্থানীয় ও প্রবাসী নেতাদের সম্ভবত উচ্চাকাক্সক্ষা বেড়ে গিয়েছিল। এ শক্তিটিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে প্রবাহিত করতে পারতেন তারা। রাত পোহালেই মসনদে বসব ধরনের স্বপ্ন না দেখে একটু সময় নিতে পারতেন। আওয়ামী লীগ চাইলেই যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন গড়াপেটা করতে পারবে, বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভব না-ও হতে পারে। তেমন প্রেক্ষাপট তৈরি করার জন্য রাজনৈতিক কৌশল বের করারও দায়িত্ব থাকে রাজনৈতিক দলের। সেসব পথে হাঁটতে চাইলেন না বিএনপি নেতারা। রাজপথ দখল করে ক্ষমতা পরিবর্তন করার মতো নিজেদের কতটা সক্ষমতা আছে, তা-ও যাচাই করলেন না।

তারা হয় তো দেখেছিলেন লগি-বৈঠার অরাজকতা তৈরি করে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পেরেছিল, তারপরও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। বিএনপি নেতাদের বোঝা উচিত ছিল আন্দোলনের মাঠে আওয়ামী লীগ যতটা অভিজ্ঞ ও শক্ত, বিএনপির সে জায়গায় পৌঁছতে অনেক সময় লাগবে। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৩-১৪ সালেও অগ্নিসন্ত্রাস কম করেনি বিএনপি। এতে দলটির রাজনৈতিক ক্ষতি ছাড়া লাভ হয়নি।

এসব অভিজ্ঞতা রপ্ত করতে পারেননি বিএনপি নেতারা। স্বর্ণলতার মতো কতগুলো খুচরো দল হয়তো বিএনপিকে উসকে দিতে পারে। কিছুদিন আগেও এদের কারও কারও বক্তৃতায় শুনেছিলাম অরাজকতা তৈরি হলে তৃতীয় কোনো শক্তি মঞ্চে চলে আসতে পারে। সে স্বপ্নে কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যৎ গোছানোর চিন্তা করে থাকতে পারেন।

বিএনপির ঘোষণা ছিল তাদের সমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ। কিন্তু দুপুর ১২টার পর যখন টেলিভিশনে দেখলাম বিএনপির সমাবেশের কাছাকাছি দূরত্বে পুলিশের অনুমতি না পেয়েও জামায়াত-শিবির জড়ো হয়েছে, তখন ঘরপোড়া গরু আমাদের মনে কুডাক দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত অগ্নিসন্ত্রাসের দিকেই না হাঁটতে হয়। ২০১৪-১৫ সালে সন্ত্রাসের সিনে জামায়াতকে পাওয়া গিয়েছিল। এবার সতর্ক জামায়াত-শিবির সম্মুখসমরে না গিয়ে অর্বাচীন বিএনপি কর্মীদের নামিয়ে দিয়েছিল। এতে বিএনপি নেতাদের কতটা সমর্থন ছিল জানি না। কিন্তু আগুন নিয়ে খেললে হাত তো পুড়বেই। এখন ঠিকই কাদায় আটকে গেছেন তারা। টিভি ফুটেজ, সিসি ক্যামেরা, সংবাদকর্মীদের তথ্য, সবকিছু দিয়েই বিএনপির সংশ্লিষ্টতাকে প্রমাণ করা যাবে।

সহিংসতার ধরনগুলো ছিল খুবই নৃশংস। ২৮ তারিখ রাতের টিভি ফুটেজ, সামাজিক গণমাধ্যম এবং রোববারে প্রকাশিত সংবাদপত্রের ছবি আমাদের শিউরে দিয়েছে। সাপ পেটানোর মতো করে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা, পুলিশ বক্স এবং পুলিশ হাসপাতালে অগ্নিসংযোগ, হাসপাতালে পার্ক করা ও আবাসিক এলাকায় রাখা গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স পুড়িয়ে দেওয়া, বাসে আগুন, স্মরণকালের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আহত হওয়া সংবাদকর্মী-এসবের দায় বিএনপি নেতাদের এড়ানো কঠিন হবে। আপাত মনে হওয়া বিএনপির বন্ধু মার্কিন কূটনীতিকদের এবারের বক্তব্য কেমন হবে তা দেখার বিষয়। তারা একটি কৌশলী বক্তব্য দিয়েছে। সহিংসতার নিন্দা করেছে তারা। জানিয়েছে সবকিছু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করবে।

আমাদের মনে হয়েছিল, অনেকদিন পর মাঠের রাজনীতিতে অনেকটা এগিয়েছিল বিএনপি। বানরের তেলতেলে বাঁশে ওঠার মতো করে আবার নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতাদের উচিত স্বপ্ন-কল্পনায় না থেকে বাস্তবতার নিরিখে সুস্থ রাজনীতির পথে হাঁটা। রাজপথ দখলে রেখে সরকার পতনের সক্ষমতা দেখাতে তাদের অনেক সময় লাগবে। স্মরণ রাখা উচিত, শাপলা চত্বরে হেফাজত দখলদারত্ব বজায় রাখতে বসে গিয়েছিল। সরকারি প্রতিরোধ কম ছিল না তখন। তারপরও সারাদিন দখল বজায় রাখতে পেরেছিল। আর এবার সরকার হটিয়ে দেওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে রাস্তায় বসে পড়েছিল হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। কিন্তু দুঘণ্টাও টিকতে পারল না। কর্মীদের আগেই গা ঢাকা দিলেন নেতারা। এতে শুধু সমাবেশই পণ্ড হলো না, দল হিসাবে বিএনপি অনেকটা পিছিয়ে গেল। বাস্তবতা না মেনে পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া কর্মী-সমর্থকদের ঝুলিতে শূন্য পড়ে রইল।

জনমতের প্রতি আস্থা থাকলে এরপরও বিএনপি হরতালের ডাক দিত না। এবার দৃশ্যত বিএনপি আসামি। তাই তাদের এ ধরনের কর্মসূচি দেওয়া অর্থহীন। তাছাড়া মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একরকম প্রত্যাখ্যান করেছে হরতাল। এ হরতাল আবার চাপিয়ে দেওয়াকে কি মানুষ ভালোভাবে নেবে? লাগাতার হরতাল দিয়ে সরকারকে দুর্বল করে দেওয়ার চিন্তা থাকতে পারে। কিন্তু বিএনপি কি তেমন প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পেরেছে? এ সহজ কথা বিএনপি নেতারা নিশ্চয়ই বোঝেন। তবে কি বিদেশি চাপ ছিল তাদের ওপর? এভাবে পথ হাঁটলে বিএনপির আরও বড় হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy