
X
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৮ মার্চ হতে শুরু হয় দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত ৩৩ হাজার ৯৯৫ জনের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার বাঙালি পুলিশ সদস্য সাধারণ জনতার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তখন হয়ে উঠে মুক্তিকামী বাঙালির চিন্তা-চেতনার একমাত্র বহিঃপ্রকাশ, যা বাঙালি পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সদস্যদেরকে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমনের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং মানসিক শক্তি জোগায়। প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা হিসেবে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দৃঢ় মানসিকতা, কঠিন মনোবল এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেতনা সেদিন বাঙালি পুলিশ সদস্যদের শক্তিশালী করে তুলেছিল। যার কাছে যে অস্ত্র ছিল তাই নিয়েই প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের মোকাবেলায় বাঙালি পুলিশ সদস্যদেও ৩০৩ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রবল আক্রমনের মুখে একসময় প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়লে সকলেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যার পক্ষে যেভাবে সম্ভব কর্মস্থল ত্যাগ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ হতে পারে এমন ধারণা বাঙালি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আগে থেকেই আলোচিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ব্যারাকে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যগণ মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ২৫ মার্চ দুপুর হতে পুলিশের বিভিন্ন মাধ্যমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ আসতে থাকে। পুলিশ কন্ট্রোলরুম হতে বিভিন্ন দিকে ওয়্যারলেস সেটসহ মোবাইল টিম পাঠানো হয়। শহর এলাকায় চলাচলকারী সেনাবাহিনীর গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখার জন্য তাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়। রাত আনুমানিক ১০টায় পুলিশের একটি টহল দল তেজগাঁও এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয়কে যুদ্ধ সাজে শহরের দিকে চলাচল করতে দেখেন। টহল দলটি সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে দ্রুত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। এই সময় ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বেইজ স্টেশন ও কন্ট্রোলরুমের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কনভয়ের আগমনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
রাত ১১:৩০টার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত টহল দলের সদস্যগণ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির কনভয়কে এলাকা অতিক্রম করতে দেখে। সেনাবাহিনীর কনভয়টি তাদের অবস্থান অতিক্রম করার পর পরই পুলিশের টহল দলটি ভিন্ন পথে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রবেশ করে সেনাবাহিনীর শহরে আগমনের বিষয়টি অবগত করে। সাথে সাথে পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বহর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাইরে চারদিক ঘিরে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রথমে পুলিশ হাসপাতালের দক্ষিণ দিক থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। এই আক্রমনের সংবাদ তাৎক্ষনিকভাবে সারা দেশের জেলা ও মহাকুমায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। সংবাদটি ছিল, ÔBase
for all stations of East Pakistan Police. Keep listening, watch, we are already
attacked by the Pak Army. Try to save yourself, over’. রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের অভ্যন্তরে বাঙালি পুলিশের সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন। অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে অস্ত্রাগার হতে একটি করে থ্রি নট থ্র্রি আর মার্ক ফোর রাইফেল এবং ২০ রাউন্ড গুলি নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নেন। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের অভ্যন্তরে সুবিধাজনক স্থানে এবং বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কনভয় প্রধান ফটকের কাছাকাছি আসার সাথে সাথে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মুক্তিকামী বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন। এই আক্রমনে পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে একটু থেমে গেলেও পরবর্তী সময়ে ট্যাংক, মর্টার এবং ভারী মেশিনগান দিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাদের আক্রমণে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের অভ্যন্তরে চারটি ব্যারাকে আগুন ধরে যায়। একদিকে আগুন, আরেকদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বেপরোয়া গুলি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য পুলিশ সদস্যরা ছুটোছুটি শুরু করে। অল্প সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক বহরসহ পুলিশ লাইন্সের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তখনও চার তলা ব্যারাকের উপর হতে পুলিশ সদস্যদের বেপরোয়া গুলিবর্ষণ চলছিল। প্রথম পর্যায়ে তাদের প্রতিরোধ টিকে থাকলেও পরে তা একেবারেই ভেঙে যায়। পুলিশ সদস্যদের গুলি শেষ হয়ে গেলে আত্মরক্ষার্থে যার যেদিক দিয়ে সম্ভব অবস্থান পরিবর্তন করতে চেষ্টা চালায়।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে অনেক পুলিশ সদস্য শাহাদত বরণ করেন। আহত পুলিশ সদস্যরা নিরুপায় হয়ে শরীরে রক্তস্নাত জখম নিয়ে পুলিশ লাইন্সের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে কাঁটাতারের বেড়া ক্রলিং করে চামেলীবাগ, শহীদবাগ, পুলিশ হাসপাতালসহ সুবিধাজনক স্থান দিয়ে যার পক্ষে যেভাবে সম্ভব কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন কারও ঘর-বাড়ি, কারও বাড়ির ছাদ, বাড়ির গ্যারেজ, হোটেল, পুলিশ হাসপাতালে আশ্রয় নিয়ে সূর্যোদয়ের পূর্বেই ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে চলে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁরাই ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ও যুব-প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ মাতৃকার টানে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, পরিবার-পরিজন হারা হন, আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মহান মুক্তিসংগ্রামে বাঙালি বীর পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মামুন মাহমুদ (১৭ নভেম্বর ১৯২৮-২৬ মার্চ ১৯৭১), ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ; মুন্সি কবিরউদ্দিন আহমেদ (১ জানুয়ারি ১৯১৮-৩০ মার্চ ১৯৭১), পুলিশ সুপার, কুমিল্লা; শাহ আব্দুল মজিদ (০৩ জানুয়ারি ১৯৩৫-৩১ মার্চ ১৯৭১), পুলিশ সুপার, রাজশাহী; আব্দুল হাকিম, পুলিশ সুপার, নোয়াখালী; সামসুল হক, পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম; নজমুল হক (১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪-এপ্রিল ১৯৭১), পুলিশ সুপার ও উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন বিভাগ, চট্টগ্রাম; অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম হোসেন (১ ডিসেম্বর ১৯১৯-২ মে ১৯৭১); এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯২১-৫ মে ১৯৭১) সহ বিভিন্ন পদমর্যাদার ১১০০ জনেরও বেশি (কোথাও প্রায় ১২৬২ জন) পুলিশ সদস্য শহিদ হন।
শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, প্রগতির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ পুলিশের সেবাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং করোনাকালীন সম্মুখ যোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের অকুতোভয় সদস্যদের চব্বিশ ঘণ্টার সতর্ক দৃষ্টি আর আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই জনসাধারণের স্বাভাবিক এবং নিরাপদ জীবনযাপন সম্ভব।
‘Bangladesh
Police is committed to enforce law, maintain social order, reduce fear of
crime, enhance public safety and ensure internal security with the active
support of the community’-এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পুলিশের সকল ইউনিট মাননীয় ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ জনাব চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বিপিএম (বার), পিপিএম মহোদয়ের নির্দেশনায় সুচারুরূপে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। সড়ক ও মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ; বাসস্টেশন, রেলস্টেশন ও নৌবন্দরে পাহারারত পুলিশ; বাসস্থান, শপিংমল, মার্কেট, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টুরিস্ট স্পটের নিরাপত্তায় পুলিশ; চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি, জালটাকা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ; গার্মেন্টস, শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সাথে বেতন বোনাসের সমন্বয় সাধনে পুলিশ; বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নকারী তথ্য, গুজব, পোস্ট, মন্তব্যের আলোকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ; জঙ্গি, সন্ত্রাসী, অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রোধে পুলিশ; রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, স্থাপনা, আদালত প্রাঙ্গণ, গার্ড/কেপিআই নিরাপত্তায় পুলিশ; বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন, অর্থ পরিবহন, রাষ্ট্রীয় আয়োজনের নিরাপত্তায় পুলিশ।
বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ চব্বিশ ঘণ্টাই মাঠে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ, পুলিশ আইন, ১৮৬১ (১৮৬১ সালের ৫ নং আইন) এর ২২ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘এই আইনের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক পুলিশ কর্মচারী সর্বদা কার্যেরত বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং যেকোনো সময় জেলার যেকোন স্থানে তাহাকে পুলিশ অফিসার হিসাবে নিযুক্ত করা যাইবে।’ কিন্তু, কখনও কী অনুভব হয়েছে যে, নীলাভ পোশাকের আড়ালেও রয়েছে একটি রক্তমাংসে গড়া শরীর; সেখানে সাধারণ মানুষের মতোই রক্তের ধারা প্রবাহিত হয়। সে রক্তেও আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে, আছে সীমাহীন দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার। জীবনের সোনালি দিনগুলো জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্য দিয়ে চলে যায়। পুলিশ ভুলে যায় নিজের প্রয়োজনের কথা, প্রিয়জনকে ঘিরে বিভিন্ন উৎসবমুখর দিনগুলোর কথা।
লেখক : পুলিশ সুপার, চুয়াডাঙ্গা