জলবায়ুর ভয়ঙ্কর বার্তায় বিজ্ঞানীরাও শঙ্কিত

প্রদীপ সাহা

মতামত

সারা বিশ্বে একের পর এক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের বরফের স্তর যেভাবে বেড়ে

2023-11-05T15:34:07+00:00
2023-11-05T15:34:07+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
জলবায়ুর ভয়ঙ্কর বার্তায় বিজ্ঞানীরাও শঙ্কিত
প্রদীপ সাহা
প্রকাশ: রোববার, ৫ নভেম্বর, ২০২৩, ৩:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ১৭৮)
X

সারা বিশ্বে একের পর এক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের বরফের স্তর যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো শঙ্কিত। জাতিসংঘ বলেছে ইউরোপ জুড়ে যে তাপপ্রবাহ চলছে, তা আরও রেকর্ড ভাঙার দিকে এগোচ্ছে। এসব নজিরবিহীন রেকর্ড জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিনা, তা বলা কঠিন। কারণ আবহাওয়া এবং পৃথিবীর মহাসাগরের আচরণ খুবই জটিল; এগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই শঙ্কিত হয়ে পড়েছে যে, বিশ্বে ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতি ঘটতে চলেছে। লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের পরিবেশ বিষয়ক ভূগোল বিশেষজ্ঞ ড. টমাস স্মিথ বলেন, ‘আমার এমন কোনো সময়ের কথা জানা নেই, যখন আবহাওয়া মণ্ডলের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বত্র এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে।’ ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. পাওলো সেপ্পি বলেন, ‘পৃথিবী এখন লাগামহীন পরিবর্তনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যার পেছনে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ঘটা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং ২০১৮ সাল থেকে এল নিনোর প্রভাবে প্রথম পৃথিবীর গরম হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু।’ এল নিনো প্রকৃতি গরম হয়ে ওঠার একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যখন প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অংশে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের ওপরে ওঠে যায়, তখন এর প্রভাবে প্রকৃতি গরম হয়ে ওঠে। 

এ পর্যন্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে গরম দিনের রেকর্ড ছিল জুলাই ২০২৩। ২০১৬ সালে বিশ্বে গড় উষ্ণ তাপমাত্রার যে রেকর্ড ছিল, এবারের তাপমাত্রা তাকে ছাড়িয়ে গেছে। এবার প্রথমবারের মতো পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)-র জলবায়ু পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘কোপার্নিকাস’ জানিয়েছে, এ বছরের ৬ জুলাই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে যে কার্বন নিগর্মণ হচ্ছে পৃথিবী ক্রমশ গরম হয়ে ওঠার পেছনে সেটাই বড় কারণ। ই¤েপরিয়াল কলেজ লন্ডনের আরেকজন জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. ফ্রেডেরিকো অটো বলেন, ‘গ্রিনহাউস গ্যাস থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঠেকানো না গেলে এমনটাই ঘটবে বলে পূর্বাভাস করা হয়েছিল। এর জন্য দায়ী মানুষ। জুন ২০২৩ যেভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির রেকর্ড ভেঙেছে, তাতে আমি বিস্মিত। বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে এত তাড়াতাড়ি এমনটা ঘটার কথা নয়। এল নিনোর প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ে, কিন্তু সেটার প্রভাব এত তাড়াতাড়ি দেখাটা অস্বাভাবিক।’ এ বছর জুন ২০২৩ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল জুনের স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে ১ দশমিক ৪৭ সেলসিয়াস বেশি। এই বৃদ্ধি হিসাব করা হয় পৃথিবীতে শিল্পোন্নয়ন ঘটার আগের সময়কার সঙ্গে তুলনা করে। ১৮০০ সাল নাগাদ বিশ্বে শিল্পবিপ্লব ঘটার পর থেকে মানুষ আবহাওয়া মণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করছে অনেক বেশি। ড. টমাস স্মিথ এক দশক আগে বুঝতে পারেননি, ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছবে। তিনি বলেন, ‘জলবায়ুর যে মডেল ধরে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তাতে দীর্ঘমেয়াদে কী ঘটতে যাচ্ছে তার পূর্বাভাস দেওয়া যায়। কিন্তু আগামী দশ বছরে কী ঘটবে তা বলা কঠিন। ১৯৯০ সালে আবহাওয়ার আচরণের যে মডেল ধরে আমরা কাজ করেছিলাম, তাতে আজকের অবস্থা স¤পর্কে মোটামুটি একটা সঠিক ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আগামী দশ বছরে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, তার সঠিক পূর্বাভাস এখন দেওয়া কঠিন হবে।’ এই সময়ের মধ্যে পৃথিবী যথেষ্ট ঠাণ্ডা হবে না বলেই তিনি মত প্রকাশ করেছেন। 

‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ জানিয়েছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সাল হতে চলেছে সারা পৃথিবীব্যাপী উষ্ণতম বছর অর্থাৎ পৃথিবী ক্রমশই উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে প্রতিদিন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘মিনিস্ট্রি অব আর্থ সায়েন্সেস’ জানিয়েছে, ‘২০১৫ সালে দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৯৬১-১৯৯০ সালের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এর বাইরে সেরা উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত ছিল তাপমাত্রার ক্রমানুসারে ২০০৯, ২০১০, ২০০৩, ২০০২, ২০১৪, ১৯৯৮, ২০০৬ এবং ২০০৭ সাল। ২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অন্তত বারো বছর ছিল সেরা উষ্ণ বছর। গত এক দশককে চিহ্নিত করা যেতে পারে উষ্ণতম দশক হিসেবে। ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজি’-এর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘গত বছর হিট ওয়েভ-এর কারণে দেশে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। বন্যা এবং খরার মতো হিট ওয়েভকেও এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত। 

বিশ্বব্যাপী মহাসাগরের তাপমাত্রা এবার মে, জুন এবং জুলাই মাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৬ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার যে রেকর্ড ধরা পড়েছিল, বর্তমান তাপমাত্রা তাকে দ্রুত ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তাপমাত্রা যেভাবে অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়ছে, তাতে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে শঙ্কিত। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির পৃথিবী বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল স্মিথ বলেন, ‘আটলান্টিকের এই অংশে এমন সামুদ্রিক উষ্ণপ্রবাহ আগে কখনও দেখা যায়নি। আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের তাপমাত্রা জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর সংজ্ঞায় চরম অবস্থার চেয়েও বেশি।’ এর কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন কিনা, তা এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ড্যানিয়েল স্মিথ বলেন, ‘পৃথিবী গরম হয়ে উঠেছে এটা পরিষ্কার এবং মহাসাগরগুলো আবহাওয়া মণ্ডল থেকে অতিরিক্ত উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রের এই জীববৈচিত্র্য পৃথিবীর ৫০ ভাগ অক্সিজেন জোগায়। আমরা যখন তাপপ্রবাহের কথা বলি, মানুষ ভাবেÑ তাতে শুধু গাছপালা-ঘাসপাতা মরে যায়। কিন্তু মহাসাগরের পানি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ ডিগ্রি বেড়ে যায়, তখন সামুদ্রিক জীব ও গাছপালার বেঁচে থাকার জন্য বাড়তি ৫০ ভাগ খাদ্যের প্রয়োজন হয়।’ 

দক্ষিণ মেরু সাগরে বরফের স্তর জুলাই ২০২৩-এ ছিল রেকর্ড পরিমাণ কম। ব্রিটেনের আয়তনের দশগুণ পরিমাণ আয়তনের বরফের স্তর গলে গেছে। ১৯৮১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে যে পরিমাণ বরফের আস্তরণ ছিল, এই গলে যাওয়া বরফের পরিমাণ তার তুলনায় রেকর্ড মাত্রায় কমে গেছে। কেন এই পরিবর্তন? এর কারণ কি জলবায়ুর পরিবর্তন? বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপার নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়া যেভাবে আশঙ্কাজনক হারে উষ্ণ হয়ে উঠছে, তাতে দক্ষিণ মেরু সাগরের বরফের স্তর উদ্বেগজনকভাবে গলে যাচ্ছে। তবে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের ড. ক্যারোলাইন হোমস ব্যাখ্যা করেন, ‘এটা স্থানীয় আবহাওয়ার কারণে অথবা মহাসমুদ্রের স্রোতের ফলেও ঘটতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা শুধু রেকর্ড ভাঙার কারণে উদ্বেগ নয়; যে মাত্রায় রেকর্ড ভাঙছে তা-ও তাদের ভাবাচ্ছে। জুলাই ২০২৩-এ এমন বরফ গলা আগে কখনও দেখিনি। এর আগে বরফ গলে যে মাত্রায় নেমে এসেছিল, এই মাত্রা তার চেয়ে আরও ১০ ভাগ নিচে।’

এত দ্রুত যে পরিবর্তন ঘটছে, এত দ্রুতগতিতে যে আগের রেকর্ডগুলো ভাঙছেÑ সেটাই বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আগামীতে আবহাওয়া মণ্ডলের আরও রেকর্ড ভাঙা অঘটনের আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৪ সালে গিয়েও নানা ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হবে বিশ্ব। তবে জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. ফ্রেডেরিকো অটো বলেনÑ ‘তার মানে এই নয় যে, জলবায়ু ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তার মতে, নতুন পরিস্থিতির আলোকে পৃথিবীকে মানুষের বেঁচে থাকার উপযোগী করে তোলার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এখনো সময় আছে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আসুন আমরা সচেষ্ট হই; জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে এ পৃথিবীটাকে রক্ষা করি।  

লেখক : কবি ও কলামিস্ট






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy