অস্তিত্ব সংকটে দেশের নদ-নদী

অলোক আচার্য

মতামত

বাংলাদেশ নদীর দেশ। নদীর সাথে মানুষের সম্পর্ক আত্মিক। নদীমাতৃক দেশে নদীর অস্তিত্ত্ব আজ সংকটে। মানুষের লোভ আর অসচেতনতার

2023-11-07T16:12:33+00:00
2023-11-07T16:12:33+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
অস্তিত্ব সংকটে দেশের নদ-নদী
অলোক আচার্য
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৩, ৪:১২ পিএম   (ভিজিট : ৮৬৪)
X

বাংলাদেশ নদীর দেশ। নদীর সাথে মানুষের সম্পর্ক আত্মিক। নদীমাতৃক দেশে নদীর অস্তিত্ত্ব আজ সংকটে। মানুষের লোভ আর অসচেতনতার প্রভাবে প্রমত্তা নদীগুলো আজ মরতে বসেছে। আর এর প্রভাব পরছে আমাদের জলবায়ুতে। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকের নেই বর্জ্য শোধনাগার। সেই বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে। আমাদের শিল্প কল-কারখানার যত বর্জ্য তার একটি বড় অংশই মিশছে নদীতে। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং ও বিভিন্ন শিল্পকালকারখানা বর্জ্য। এর প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। শুকনো মৌসুমে অবস্থা আরো প্রকট হয়। অথচ নদীগুলো বর্জ্য ফেলার কোনো ভাগাড় হতে পারে না। নদী থাকবে নদীর স্বাভাবিক গতিতে। আর নদীকে ঘিরে কর্মচঞ্চল থাকবে অর্থনীতি। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হয় । কিন্তু দখল থেমে থাকে না। 

দেশের বহু নদীর তীর দখল করে প্রভাবশালীরা তাদের ব্যবসা, বহুতল ভবন বানিয়ে রেখেছে। বালি ফেলে ভরাট করতে করতে নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে বসেছে। সেসব দখলকারীদের দখলকৃত স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে হবে। কারণ এসব নদ-নদীই দেশের প্রাণ। আর দেশের প্রাণ মানে দেশের মানুষের প্রাণ। মাদকের মত এসব দখলকারীদের  বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। কোনভাবেই এসব দখলকারী প্রভাবশালীদের হাত থেকে সম্পূর্ণভাবে নদী মুক্ত করতে হবে। নদীর সাথে আমাদের জীবনধারার সুখ-দুঃখ জড়িত। বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। সৈয়দ শামসুল হক ‘আমার পরিচয়’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?’ এই তেরশ নদী কোথায় গেছে আমরা কি তার সন্ধান করেছি? আবহমানকাল ধরেই এ উপমহাদেশের নদীর সাথে জীবন জড়িত। নদীকে কেন্দ্র করে যুগে যুগে রচিত হয়েছে কালজয়ী সব গান। বারবার লেখক-কবির লেখায় স্থান পেয়েছে নদী। 

রচিত হয়েছে নদী ও নদীপারের মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে পদ্মা নদীর মাঝির মত কালজয়ী উপন্যাস। শুধু পদ্মানদী নয় দেশের শত শত নদীর ওপর বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। কৃষিকাজ, মাছধরা, শামুক ও ঝিনুকসহ বিভিন্নভাবে আমরা নদ-নদীর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের সংস্কৃতি-কৃষ্টির সাথে মিশে আছে এসব নদ-নদী। কিন্তু দখল, দূষণ, কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবসহ নানা কারণে নদীমাতৃক দেশের আজ করুণ অবস্থা। নদীর দেশ বাংলাদেশের আজ নদীমাতৃক পরিচয়টাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা ক্রমেই মরুভূমির দেশের বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নদী। আমাদের সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিবর্তন সেদিকের ইঙ্গিত বহন করে। 

তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশ। এককালের পঁচিশ হাজার কিলোমিটারের জলপথের বাংলাদেশ। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বিস্তৃত অববাহিকা ও জীবন্ত বদ্বীপ দেশটির ঐতিহ্য, সামাজিকতা, সংস্কৃতিকে নদীময় করে রেখেছে। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এ নদী। বিশেষজ্ঞদের মতেÑ দেশের অভ্যন্তরে বহমান নদনদী ও খালসমূহ সুরক্ষায় কোনো পরিকল্পনায় না থাকায় নদীর ইতিহাস ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। নদ-নদী খনন না করায় দেশের প্রধান নদীগুলোর অবস্থা মৃতপ্রায়। সেসব নদীর স্থলে এখন ফসলের আবাদ অথবা মাঠের পর মাঠ বালিচর। বর্ষায় যদিও নদীর অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়। নদীগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। তবে সেই অবস্থা  খুব অল্প সময়ই থাকে। শুকনো মৌসুম শুরুতেই নদী যৌবন হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে অনেক নদী। আরও নদী এখন মৃতপ্রায়। এভাবে একের পর এক নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। হয়তো একদিন অনেক নদীর নাম কেবল বইয়ের পাতায় থেকে যাবে। যেভাবে হারিয়ে গেছে ২১ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। প্রতিবছর নদীগুলো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১.২ বিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে যায়। এই পলি নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলে। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের নদী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নদী জরিপ করে নেডেকো রিপোর্ট তৈরি করা হয়। 

১৯৭৫ সাথে বিআইডব্লিউটিএর জরিপ থেকে দেশে ২৪ হাজার নৌপথের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন নৌপথের নাব্যতা কমতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালে ২১৬ মাইল নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালে আরও ২১ কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়। দেশে বর্তমানে সচল নৌপথের মধ্যে বারো থেকে তের ফুট গভীরতা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণির নৌপথ রয়েছে মাত্র ৬৮৩ কিলোমিটার। সাত থেকে আট ফুট গভীরতার দ্বিতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। পাঁচ থেকে ছয় ফুট গভীরতার তৃতীয় শ্রেণির নৌপথ রয়েছে এক হাজার ৮৮৫ কিলোমিটার। এক তথ্যে দেখা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের ৫০০ নদী ও ৮ হাজার খাল হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট জলাশয়ের অস্তিত্বও হুমকির মুখে আছে। ফলে নদী তীরবর্তী ৫ লাখ লোক ঢাকায় প্রবেশ করছে। 

নদীর পানি প্রবাহ কমে গিয়ে এক দিকে যেমন শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে পানি দূষিত হওয়ার কারণেও মরে যাচ্ছে নদী। অনেক ক্ষেত্রে পানির প্রবাহ আছে ঠিকই, কিন্তু তা এমনভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে যে, নদীর পানি আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। এসব নদীর মধ্যে শীর্ষে আছে বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় দেশের এক হাজার ২৭৪টি নদী ছিল। নদী রক্ষা কমিশনের হিসেব মতে এখন ৭২০টি নদী আছে। নৌপথ রক্ষায় একটি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। যদি নদী না বাঁচে তাহলে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে থাকবে। নদ-নদী মানুষ ছাড়াও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল রয়েছে নদীতে। নদী তার আপন সৌন্দর্য হারানোর সাথে সাথে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল বিল্প্তু হচ্ছে। এসব কিছু প্রভাব ফেলছে জীববৈচিত্র্যে। একের পর এক নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এর সাথে জড়িত প্রত্যেকের জীবনধারণে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। নদী ওপর নির্ভর করা মানুষগুলো বিকল্প আয়ের সন্ধানে ছুটছে। তারা বিভিন্ন শ্রমমূলক কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। ফলে কয়েকটি নির্দিষ্ট পেশার ওপর চাপ বাড়ছে।

নদ-নদী, খাল-বিল হলো আমাদের পুষ্টি উপাদান প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস যা আমরা মাছ থেকে পাই। অতীতকাল থেকেই আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। কিন্তু এখন সেই প্রবাদেও ভাটা পরেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মাছের উৎপাদনও কমছে। ফলে মাছ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাইরে চলে যাচ্ছে। যেসব নদী এখনও কোনো রকমে মানুষের অত্যাচারের ফলেও টিকে রয়েছে সেসব পলি পরার ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে আছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই দুকুল ভাসিয়ে সময়ে অসময়ে বন্যা হয়ে দুকুল ভাসিয়ে দিচ্ছে। আবার অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিনিয়তই সৃষ্টি হচ্ছে ভাঙরের। এসব ভাঙণে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় এসে দাড়াচ্ছে। দেশে বাড়ছে উদ্বাস্তু ও ভবঘুরে বেকার মানুষের সংখ্যা। 

ডেল্টাপ্ল্যান ২১০০ এর আওতায় দেশের ৬৪টি জেলায় প্রায় ৪৪৩৯ কি.মি. নদী,খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন করা হচ্ছে। ফলে ১০০টি ছোট নদী, ৩৯৬টি খাল ও ১৫টি জলাশয় পুনরুজ্জীবিত হবে। জলাশয়,খাল ও নদীর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপিত হবে। জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে। শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে,নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং বন্যার প্রকোপ হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে আনুমানিক ৫,২০,০০০ হেক্টর এলাকায় জলাবদ্ধতা, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিপর্যয় হতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।প্রায় ১,৩০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের ফলে বার্ষিক প্রায় ৩,৫০,০০০ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

মোটকথা নদীমাতৃক এই দেশে নদীর অস্তিত্বের সাথে আমাদের অস্তিত্ব ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। এভাবে নদী যদি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারায় তার বিরূপ প্রভার আমদের উপরই পরবে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই নদীগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। যদি নদীপথ সম্পূর্ণভাবে সচল করা যায় তাহলে পণ্য পরিবহণ সহজতর হবে এবং এতে খরচও কম লাগবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে একসময় নদীপথই ছিল অগ্রগণ্য। ক্রমেই সেই জায়গা দখল করে সড়কপথ। 

আর গুরুত্ব হারাতে থাকে নদীপথ। তবে চাইলে এখনও নদী পথ সচল করে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা যেতে পারে। এতে সাশ্রয়ের সাথে সাথে নদীগুলো মৃত অবস্থা থেকে জেগে উঠবে। দেশের অর্থনীতি গতি পাবে। নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের আরো কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। অন্তত যেসব নদ-নদী এখনো প্রবাহমান রয়েছে সেসব নদ-নদী রক্ষার উদ্যেগ কর্তৃপক্ষকে আশু নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদি নদীগুলো এভাবে তাদের অস্তিত্ব হারাতে থাকে তাহলে অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্বকভাবে বিঘ্নিত হবে। যা আমাদের চিরায়ত জলবায়ুর বিরুদ্ধে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এসব কারণেই দেশের নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থেকে দখলমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নদীকে দূষণমুক্ত রাখার দায়িত্বও আমাদের। এ কাজে সাধারণ মানুষ কর্তৃপক্ষের পাশে থাকবে।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy