
X
বৃষ্টি খাতুন না অভিশ্রুতি শাস্ত্রী-এ দুই নামের জটিলতায় ৬ দিন ধরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের মর্গে পড়ে আছে মরদেহ।
এদিকে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিচয় নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, মরদেহ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কুষ্টিয়ার বৃষ্টি খাতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এবং তার চাকরি ক্ষেত্রে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামে পরিচিত ছিলেন। তবে তার জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চাকরির জন্মবৃত্তান্তে নামের ক্ষেত্রে কোনোটিতে বৃষ্টি খাতুন আবার কোনোটিতে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী দেয়া আছে। এসব নথিতে বাবার নামের জায়গায় শাবলুল আলম এবং মায়ের নাম বিউটি বেগম লেখা। আবার আরেকটি চাকরির জন্মবৃত্তান্তে মায়ের নাম অপর্ণা শাস্ত্রী লেখা।
আবার অনেকে জানাচ্ছেন, মৃত্যুর আগে বৃষ্টি নিজেকে শাবলুল আলম ও বিউটি বেগমের পালিত সন্তান বলে জানিয়েছেন। এসব নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তার ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তা হস্তান্তর করা হবে না বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
মেয়ের মরদেহ বৃষ্টি খাতুনের দাবি করা শাবলুল আলম সবুজ ওরফে সবুজ শেখ বলেন, সিআইডি অফিস থেকে এখনও ডিএনএ রিপোর্ট দেয়নি। রিপোর্ট আসার পরে পুলিশ মরদেহ বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে। তাই অপেক্ষায় আছি। হস্তান্তর করলে আমরা মেয়ের মরদেহ নিয়ে কুষ্টিয়ার খোকসায় গ্রামের বাড়ি যাব এবং সেখানেই দাফন সম্পন্ন করব।
বৃষ্টির মা বিউটি বেগম ও তার খালা সাবানা খাতুন বলেন, বৃষ্টির মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষায় আমরা ঢাকায় এসেছি। আমার মেয়েকে নিয়ে আমরা বাড়ি যাব। কিন্তু ডিএনএ রিপোর্ট হয়নি। এজন্য আমাদের মরদেহ দেয়া হচ্ছে না।
শাবুরুল আলম সবুজ ও বিউটি বেগম দম্পতির দাবি, অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামের ওই সাংবাদিকের আসল নাম বৃষ্টি খাতুন। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বনগ্রাম গ্রামের পশ্চিমপাড়ায়। তার বাবার নাম শাবুরুল আলম সবুজ ওরফে সবুজ শেখ ও মায়ের নাম বিউটি বেগম জানান প্রতিবেশিরাও।
এদিকে ওই সাংবাদিককে তার সহকর্মীরা অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামে চিনতেন, ফেসবুকেও তার ওই নামই পাওয়া যায়। মন্দিরে গিয়ে পূজা-অর্চনাও করতেন বলে জানা গেছে। এমনকি ওই সাংবাদিকের চাকরির আবেদন পত্রে দেখা গেছে, তার বাবার নাম লিখেছেন অভিরূপ শাস্ত্রী এবং মায়ের নাম লিখেছেন অপর্ণা শাস্ত্রী। সেখানে তিনি নিজের বর্তমান ঠিকানা লিখেছেন সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, মৌচাক।
জানা গেছে, রিপোর্ট ডট লাইভ ছেড়ে সম্প্রতি কেস্টারটেক নামে একটি অনলাইন মাল্টিমিডিয়া কোম্পানিতে যোগ দেয়া তুষার হাওলাদারের সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন অভিশ্রুতি। ওই ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া মোট ৪৬ জনের মধ্যে অভিশ্রুতি আর তুষারও রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস অভিশ্রুতির মরদেহ উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মর্গে রাখে।
এরপর শুক্রবার (১ মার্চ) অভিশ্রুতিকে নিজের মেয়ে বৃষ্টি বলে দাবি করেন সবুজ শেখ। পরে রমনা কালি মন্দিরের সভাপতি উৎপল সাহা রমনা থানায় লিখিতভাবে দাবি করেন মেয়েটি সনাতন ধর্মের, তার নাম অভিশ্রুতি শাস্ত্রী। তার বাড়ি ভারতে। শাস্ত্রী বিভিন্ন সময় কালিমন্দিরে এসে পূজা করতো। এতেই মরদেহ নিয়ে তৈরি হয় ধূম্রজাল। ফলে ডিএনএর মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্তের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে ওই নারী সাংবাদিকের মরদেহ তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ৬ দিন ধরে মর্গে পড়ে আছে তার মরদেহ।
তার পরিচয় নিশ্চিত হতে রোববার (০৩ মার্চ) বাবা পরিচয়দানকারী শাবরুল আলম সবুজের নমুনা ও সোমবার (৪ মার্চ) দুপুরে মা পরিচয়দানকারী বিউটি বেগমের ডিএনএ-এর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এখনও রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
শাবুরুল আলম সবুজ বলেন, অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামের সাংবাদিকই আমার মেয়ে বৃষ্টি। ছোটবেলা থেকে তার ডাক নাম বৃষ্টি খাতুন। গ্রামে নাম বৃষ্টি, স্কুলে নাম বৃষ্টি, কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজে যখন পড়েছে, তখনও তার নাম বৃষ্টি। সে ঢাকাতে ঢাবি সাত কলেজের অধীনে ইডেন কলেজে দর্শনে পড়াশোনা করেছে। তার রোল নম্বর ২৭৬। সেই সব কাগজেও তার নাম বৃষ্টি। সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রীই আমার মেয়ে বৃষ্টি।
অভিশ্রুতি বা বৃষ্টির জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ইডেন কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার প্রবেশপত্রে নাম বৃষ্টি খাতুন রয়েছে। ২০২১ সালের ৬ জুলাই ইস্যু করা জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম বৃষ্টি খাতুন হিসাবেই রয়েছে। সেখানে বাবার নাম সবুজ শেখ এবং মায়ের নাম বিউটি বেগম রয়েছে। কলেজের প্রবেশপত্রেও তার একই রকম তথ্য আছে। ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর ইস্যু করা জন্ম নিবন্ধন সনদে নাম অভিশ্রুতি লেখা হলেও বাবার নাম লেখা হয়েছে মো. শাবুরুল আলম এবং মায়ের নাম বিউটি বেগম।
ইসি সূত্র জানা গেছে, এনআইডি সংশোধনের জন্য ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে আবেদন করেন ওই নারী সাংবাদিক। আবেদনে তিনি নামের পাশাপাশি বাবার নাম সবুজ শেখের পরিবর্তে মো. শাবরুল আলম এবং জন্ম তারিখ ১৯৯৮ সালের ৯ মার্চের পরিবর্তে ২০০০ সালের ২৫ ডিসেম্বর সংশোধন চান। তার সেই আবেদনটি এখনো ‘গ’ ক্যাটাগরিতে পড়ে আছে।
ইসির সূত্র আরও জানিয়েছে, এনআইডি সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে ওই নারী ২০২২ সালের নিবন্ধন করা জন্ম সনদ, বাবার এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ দাখিল করেন। তবে তিনি যে জন্ম সনদ দাখিল করেছেন, সেই নম্বর এবং সেখানে থাকা জন্ম তারিখ দিয়ে অনলাইনে খুঁজতে গেলে আরেকজনের তথ্য আসে। তাই বৃষ্টির দাখিল করা জন্ম সনদটি এডিট করা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।