
X
২০২৫ সালে বাংলাদেশের সড়ক, রেলপথ এবং নৌপথে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৯৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫০৯৬ জন আহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনার ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় একটি ধাক্কা। বাংলাদেশের যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৪.৮৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি রবিবার (৪ জানুয়ারি) ঢাকার সেগুনবাগিচায় সংবাদ সম্মেলন করে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, "জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা এবং উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকার করা প্রয়োজন।"
প্রতিবেদন অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনার বিস্তারিত:
২০২৫ সালে ৬৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১১ জন নিহত এবং ১৪৮১২ জন আহত হয়েছেন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৯৮৩ জন নিহত ও ২২১৯ জন আহত হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪%।
পথচারী, চালক, পরিবহন শ্রমিক, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১০২৮৮টি যানবাহন দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে মোটরসাইকেল, ট্রাক, বাস, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশা সহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ :
১। বেপরোয়া গতি। ২। বিপদজনক অভারটেকিং। ৩। সড়কের নির্মাণ ত্রুটি। ৪। ফিটনেসবিহীন যানবাহন। ৫। চালক, যাত্রী, পথচারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসতর্কতা। ৬। চালকের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সংক্রান্ত অজ্ঞতা। ৭। পরিবহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব। ৮। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার। ৯। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। ১০। অরক্ষিত রেলক্রসিং। ১১। রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা। ১২। ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্নীতি। ১৩। ট্রাফিক আইন অমান্য করা। ১৪। রোড সাইন ও রোড মার্কিং না থাকা। ১৫। সড়কে চাঁদাবাজি। ১৬। রাস্তার উপর হাট-বাজার। ১৭। মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা। ১৮। চালকের নিয়োগ ও কর্মঘন্টা সুনির্দিষ্ট না থাকা। ১৯। সড়কে আলোকসজ্জা না থাকা। ২০। রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উচু না থাকা। ২১। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দ্বায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকা। ২২। দেশব্যাপী নিরাপদ, আধুনিক ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক-ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার কারনে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ভয়াবহভাবে বাড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশমালা :
১. প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবহনখাত সংস্কার সড়ক নিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ও যাত্রী অধিকারের বিষয়টি অর্šÍভুক্ত করা।
২. নির্বাচনী এলাকার অধিবাসীদের সড়ক নিরাপত্তা, যাতায়াতের ভোগান্তি লাঘবের বিষয়ে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্ন্তভুক্ত করা।
৩. সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্ধ বাড়ানো, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক নিরাপত্তা উইং চালু করা।
৪. সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি নাগরিককে সরকারের ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে সহজে ও দ্রুততম সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে সরকার ঘোষিত ৬০ঘন্টার ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্টা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাঁবাজি বন্ধ করা।
৭. গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস প্রদান ও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে উন্নত বিশ্বের কারিকুলাম চালু করা।
৮. ভয়াবহ ধুলা দুষণে লক্ষলক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে ঢাকনা বিহীন রিকশা, ব্যাটারীচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার পরিবর্তে দেশের সকল নগরীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ইলেকট্রিক এসি বাসের শক্তিশালী নেটওর্য়াক গড়ে তোলা।
৯. ট্রাফিক পুলিশের গতানুগতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১০. সড়কে বৈধ যানবাহন ও অবৈধ যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা লেইন প্রবর্তন করা।
১১. প্রতিটি জাতীয় মহাসড়কে ছোট ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেইন তৈরি করা।
১২. গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ তহবিলসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পক্ষে যাত্রী সাধারনের প্রতিনিধি অর্ন্তভুক্ত করা।
আন্তর্জাতিক মানের গণপরিবহন ব্যবস্থা ও সড়ক নিরাপত্তা:
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “ক্ষমতার পালাবদল হলেও সড়ক নীতিতে পরিবর্তন হয়নি, যার ফলে দুর্ঘটনা, যানজট, চাঁদাবাজি এবং ভাড়া বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দেশের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি, সড়কের নিরাপত্তা এবং পরিবহন খাতের দুর্নীতির কারণে জনগণ এখনও সমস্যায় রয়েছে।”
সমাজের জন্য একটি নিরাপদ এবং আধুনিক সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এই ধরনের সুপারিশগুলি বাস্তবায়ন জরুরি। তা ছাড়া, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।