
X
শীতের রাতে সাগরের গর্জন থেমে গেলেও কাঁপছিল চট্টগ্রাম শহরতলীর রানী রাসমনির ঘাট, আকমল আলী ঘাট ও উত্তর কাট্টলী এলাকার জেলেপল্লীর বাসিন্দারা। অন্ধকারে মোড়া সাগরপাড়ে শীত নিবারণের আশায় অপেক্ষা করছিল অসহায় জেলে পরিবারগুলো। ঠিক তখনই কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। নিজ হাতে শীতার্ত মানুষের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে তাদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে চট্টগ্রামের তিনটি জেলেপল্লী ও সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় মোট ৫০০টি কম্বল বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক। স্থানীয়দের কাছে যিনি ইতোমধ্যে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত।
রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লীর বাসিন্দা সাগর দাসের স্ত্রী বেবি দাস (৩৫) শীতের মধ্যে কম্বলের অপেক্ষায় ছিলেন অন্যদের মতোই। স্বামীর মাছ ধরা ছেড়ে অটোরিকশা চালানোর আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তার। সামান্য সহায়তার আশায় ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে থাকেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের হাতে কম্বল পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বেবি দাস বলেন, ডিসি স্যার নিজ হাতে কম্বল পরিয়ে দেওয়ার পর সারা শরীরে গরম অনুভব করলাম। আমাদের মতো গরিব মানুষদের আগে কেউ এভাবে আপনজনের মতো পাশে দাঁড়ায়নি।
উত্তর কাট্টলী জেলেপাড়ার ৫১ বছর বয়সী সমীরণ দাস বলেন, চট্টগ্রাম শহরের কাছেই থাকি, কিন্তু আমাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। জীবনে কখনো কোনো জেলা প্রশাসককে আমাদের সাগরপাড়ে আসতে দেখিনি। গতকাল রাত দেড়টায় নিজে এসে কম্বল দিয়েছেন—এটা আমাদের কাছে অভাবনীয়।
তিনি আরও বলেন, জেলেপল্লীর পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত জমি স্বল্পমূল্যে বা কিস্তিতে লিজ দিলে জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস ও জীবনমান উন্নত হবে।
আকমল আলী ঘাট জেলেপল্লীর জেলে নেতা দুলাল দাস ও রানী রাসমনির ঘাটের জেলে নেতা খেলন দাস জানান, শহর থেকে অনেক দূরের এসব জেলেপল্লীতে গভীর রাতে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি তাদের কাছে অকল্পনীয়। এতে শীতার্ত পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
কম্বল বিতরণের সময় জেলেপল্লীর বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং জেলেদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন।
জেলেদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে হবে। শুধু পুরোনো জীবনধারায় আটকে থাকলে চলবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবিকার ধরন পরিবর্তন করে স্বনির্ভর হতে হবে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, জেলেদের টেকসই জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
এ ছাড়া সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় ভাসমান ও অসহায় মানুষের মাঝেও কম্বল বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় নূর কায়াস নামে এক নারী তার তিন সন্তানসহ রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। তার এক শিশু প্রচণ্ড শীতে কাঁপছিল। বিষয়টি নজরে এলে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে খাবারের জন্য আর্থিক সহায়তা দেন এবং তার বড় সন্তান আছিয়ার পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।