
X
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাঁরা আপনজন, ঘর–সংসার হারিয়েছেন তাঁদের জন্য মানবিক স্পর্শই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তেমনই এক মানবিক উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।
রোববার বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শন করে সেখানে আশ্রয় নেওয়া অর্ধশতাধিক অসহায় প্রবীণের পাশে দাঁড়িয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক সরাসরি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেন। জেলা প্রশাসক নিজ হাতে প্রবীণদের গায়ে শীতের কম্বল জড়িয়ে দেন, খোঁজ নেন তাঁদের শারীরিক অবস্থা ও জীবনের গল্প। পাশাপাশি প্রত্যেককে দেওয়া হয় সুস্বাদু ফলের ঝুড়ি। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি ঝুড়িতে ছিল আঙুর, কমলা, আপেল ও কেক।
দীর্ঘদিন পর এমন আন্তরিকতায় আপ্লুত প্রবীণদের চোখে তখন কৃতজ্ঞতার জল। যেন কেউ বহুদিন পর তাঁদের মানুষ হিসেবে মনে রেখেছে।
বেওয়ারিশ মানবসেবা বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সায়েরা বেগম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক বৃদ্ধাশ্রমটি পরিদর্শনে এসেছেন। তিনি বলেন, ডিসি স্যার শুধু কম্বল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি, নিজ হাতে প্রত্যেক প্রবীণকে কম্বল পরিয়ে দিয়েছেন। সুস্বাদু ফলের ঝুড়িও দিয়েছেন। একজন মানবিক মানুষ না হলে এমনটা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, নিঃসন্দেহে তিনি একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোলামুর রহমান রব্বানী বলেন, প্রবীণ মানুষগুলোকে কেউ মনে রাখে—এই অনুভূতিটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। জেলা প্রশাসকের এই আন্তরিক উদ্যোগ আমাদের নতুন করে আশাবাদী করেছে।
বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক নগরীর কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানায় যান। সেখানে তিনি ৩২৫টি কম্বল এতিম শিশুদের মাঝে বিতরণ করেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের পড়াশোনা, আবাসন, চিকিৎসা ও সার্বিক কল্যাণ বিষয়ে খোঁজখবর নেন তিনি।
এতিমখানার অধ্যক্ষ আবুল কাসেম বলেন, জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি ও মানবিক সহায়তা আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। শিশুদের মুখের হাসিই প্রমাণ করে—এই ভালোবাসা কতটা মূল্যবান।
এতিমখানা পরিচালনা কমিটির অর্থ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ আবসার চৌধুরী বলেন, এতিম শিশুদের সংখ্যা জানার পরই ডিসি স্যার তিন শতাধিক কম্বল পাঠিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত অমায়িক, ভদ্র ও আন্তরিক একজন মানুষ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে।
এতিমখানার হল সুপার আব্দুল মোবিন বলেন, চার দশকের কর্মজীবনে এমন মানবিক জেলা প্রশাসক দেখিনি। তিনি প্রতিটি শিশুর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শীতবস্ত্রের সঙ্গে যদি সামান্য ভালোবাসা ও মানবিক স্পর্শ পৌঁছে দিতে পারি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তিনি আরও বলেন, এই শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের জন্য নিরাপদ, সুন্দর ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের সম্মিলিত দায়িত্ব। এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।