প্রকৃতির মনোরম সৌন্দর্যে ভরপুর কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীর এই সৌন্দর্য উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো। বর্ষার জলে নবসাজে সেজে ওঠা নিকলী হাওড়কে শিক্ষা সফরের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতিকে কাছ থেকে উপভোগ করতে পারে।
বৃষ্টির তালে তালে নিকলীর দিকে ছুঁটেছে গাড়ি। বাসের জানালা দিয়ে টপটপ বৃষ্টির ধ্বনি খুব ভোরে আধো আধো ঘুম চোখে নিকলী হাওড়ের দেখা মিলে; হাওড়ের ধারে সবুজ গালিচার মতো মাঠে নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে গরুগুলো।দেখলেই মনে হয় প্রকৃতির কোলে আঁকা এক শান্ত স্বর্গীয় দৃশ্য।বাতাসের মৃদু দোলা আর দূরের নীরবতা মিলিয়ে তৈরি হয় অপার সৌন্দর্য। মনে হয়, গ্রামবাংলার বুকেই লুকিয়ে আছে একটুকরো কাশ্মীর। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে এই নির্মল চিত্রপট। কমিউনিটি সেন্টার আর রেস্টুরেন্টের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের যুগে দেখা মিললো সাদা আর গোলাপি রঙের কাপড়ে বাঁধা ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গেইটের। নিকলীতে কচুরিপানার ফাঁকে হাওড়ের কোলে বেড়ে ওঠা দুই শিশুর মাছ ধরার দৃশ্য বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্র অপু আর দূর্গাকে স্মরণ করিয়ে দিবে যেকোনো পর্যটকদের। মেঘলা আকাশে চিলের বুক ফাঁটা চিৎকার যেন ওই এলাকার মানুষের জীবিকা নির্বাহের কঠোর পরিশ্রমকে অভিবাদন জানাচ্ছে।প্রকৃতির নির্মল হাওয়ার সঙ্গ দিয়েছে হাওরের পানির ঢেউ,মাঝি, জেলে, রাখাল,পর্যটক।
নাদিয়া আফরোজ
নিকলীর সঙ্গে আরো নবতর সৌন্দর্যের ভিন্ন মাত্রা সংযুক্ত হয়েছে ছাতিরচর,মিঠামইনের ‘অল ওয়েদার রোড’ আর অষ্টগ্রাম। এই অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী পর্যটনকেন্দ্রকে বিশেষ যত্ন নিতে হবে।নিকলী হাওড় প্রকৃতি রক্ষা না করলে পর্যটন টিকবে না।হাওড়ের টানে বাঁচে মিঠামইনের মানুষ।বেড়িবাঁধের ওপরে মানুষের জীবন যেন হাওড়ের ওপর নির্ভরশীল।‘পেটের লাইগ্যা হাওরে নামুন লাগে’-নিকলীর এক বৃদ্ধ চাচা।হাওড় থেকে তাজা তাজা মাছ ধরে কিশোরগঞ্জের সদরে গিয়ে বিক্রি করে কখনো বেশ ভালো অংকের টাকা আয় করতে পারে, বেচে যাওয়া বাকিটুকু মাছ ঘরে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ক্ষুধা নিবারণ করে। জেলে পাড়া না হয়েও জেলে পাড়ার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ আর অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নামের’ মতো কিশোরগঞ্জের এই নিকলী হাওড়ের যত্ন যেন এই দেশের লেখক - কবি - সাহিত্যিক-সরকারের দৃষ্টি থেকে যেন বঞ্চিত না হয়।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ এই হাওড় একসময় ছিল মিঠাপানির দেশি মাছের ভরসাস্থল। কিন্তু আজ সেই হাওড় থেকেই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে নানা দেশি প্রজাতির মাছ।জমির অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে হাওড়ের মাছের ডিম ধ্বংস হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে পোনা আর ডিমওয়ালা মাছ নিধন আবার কখনো চোখে পড়ে হাওড় শাসন,আশপাশের ময়লা আবর্জনা গরু ছাগলের বিষ্ঠা পানিতে থাকা মৎস সম্পদকে বিলুপ্ত করতে সহায়তা করছে।এই হাওড়ের ওপর কিশোরগঞ্জের জেলার উন্নতি নির্ভর করে অনেকাংশেই।জরুরি ব্যবস্থা না নিলে এই মিঠাপানির দেশি মাছ আরো বিলুপ্তির মাত্রা বৃদ্ধি হতে হতে এক পর্যায়ে মৎস সম্পদ হারিয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মতো অবস্থায় রূপ ধারণ করবে।আমরা জানি, বাঙালি হলো খাবারে মাছে-ভাতে।তাই নিকলীর এই জলধারার সৌন্দর্য,মৎস সম্পদ,এলাকার মানুষদের দূর্যোগকালীন সময়ে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা,ডাকাতদের কবল থেকে রক্ষার জন্য কঠোর আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে সেই সঙ্গে উপর মহলের তদারকির দৃষ্টি।তবেই,‘ বাঁচবে সম্পদ, ঘটবে দেশের উন্নতি ’। অন্যথায়-নিকলী হাওড়ে অরক্ষিত সৌন্দর্যের আর্তনাদ ঘটবে।