
X
প্রকৃতির এক অপরূপ লীলা ভূমি চিত্রাপাড়ের সুন্দরবন
সুন্দরবনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় শত কিলোমিটার দূরে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে চিত্রা নদী। এই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে চিত্রা পাড়েরর ‘মিনি সুন্দরবন’।
এই নদীর দু’পাড়ে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর ও আশপাশের গ্রাম জুড়ে প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নিয়েছে সুন্দর বনের বিভিন্ন গাছপালা। চিত্রার দু’পাড়ে এখন যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের হাতছানি। বিশেষ করে বনজুড়ে গড়ে উঠেছে পাখিদের অভয়ারণ্য। এখানকার প্রকৃতির মনোরম ছোঁয়া পেতে প্রতিদিন ভ্রমণ পিপাসুরাও ছুটে আসছেন এখানে । প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে এ বনকে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করলে এখানে রয়েছে অপার সম্ভাবনা।
বনে ঘুরে দেখা গেছে, আঁকা-বাঁকা ভঙ্গিতে বয়ে চলেছে চিত্রা। এরই কূল ঘেঁষে সবুজের মহাসমারোহে এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষরাজি। এমন নৈসর্গিক দৃশ্য মন কাড়ছে দর্শনার্থীদের। সবুজের বুক চিরে উঁকি মারছে নীল আকাশ। মৃদু বাতাশে শিহরণ জাগিয়ে তোলে মনে-প্রাণে। বলা চলে প্রকৃতির এক অপরূপ লীলা ভূমি চিত্রাপাড়ের এ সুন্দরবন।
একসময়ের খরস্রোতা চিত্রা নদী যদিও এখন আর আগের মত বেগবান নেই। তবে তার দু’পাড়ে বিশাল এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এই ম্যানগ্রোভ। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এখানকার চরের জমিতে প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠেছে সুন্দর বনের বিভিন্ন গাছপালা। এমনকি আশপাশের গ্রাম গুলোও দিন দিন সবুজের বেষ্টনিতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এটি পাখি ও প্রাণিদের জন্য এখন অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন শত শত ভ্রমণ পিপাসু এখানে এসে ভিড় জমাচ্ছেন। লোকালয়ে এ ধরণের পরিবেশ গড়ে উঠবে এমনটি অনেকেই ভাবতে পারেনি। এ বন এখন আশার আলো দেখাচ্ছে।
সুন্দরবন থেকে উঠে আসা পশুর, বলেশ্বর, দড়াটানাসহ যেসব নদী রয়েছে ,সেইসব নদীর সাথে চিত্রা নদীর সংযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সুন্দর বনের বিভিন্ন গাছের বীজ জোয়ারের পানিতে চিত্রায় ভেসে এসে এ বনের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা বিশেজ্ঞদের। এসব বীজের মাধ্যমে চরের জমিতে ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এ সকল গাছপালা জন্ম নিয়েছে।
এখানে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গোলপাতাসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছ মাথা তুলে জানান দিচ্ছে নতুন বনের উপস্থিতি। পাশাপাশি বন্য প্রাণিদের আবাসস্থল এই বনে। ভোর হতেই মৌমাছিরা মধু আহরণে নেমে পড়ে। এছাড়া বক, পাকৌড়ি আহারের সন্ধানে আশপাশের বিলে পাড়ি জমায়। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বনের চারিপাশ।
পরিযায়ী পাখি থেকে শুরু করে নানা পাখিদের ওড়াউড়ি মুগ্ধ করে তোলে দর্শনার্থীদের। মনোরম দৃশ্য দেখার জন্য অনেকে লাইন দেন বনের কাছে এসে। বর্তমানে এখানে দর্শনার্থীদের জন্য একটি ইকোপর্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
শিশু ও নারীদের ভ্রমণের জন্য এ বন খুবই নিরাপদ ও আনন্দদায়ক। দিনের আলোয় তারা বনের সবুজ ছায়ায় ঘুরে উপভোগ করতে পারবে প্রকৃতির নৈসর্গিক দৃশ্য। পাশাপাশি চিত্রা নদীতে নৌকা ও ট্রালারে করে ভ্রমন করা যেতে পারে। নদীতে ডলফিনের উপুড় হয়ে বাজি খাওয়ার দৃশ্যগুলো যে কারোই নজড় কাড়বে।
পাশাপাশি চিতলমাছের বুতকি কাটা দেখেও অবাক হতে হয়। এছাড়া এ বনে রয়েছে কুমির আকৃতির ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা গুইসাপ। পরিবেশ বান্ধব প্রাণি এটি। পাশাপাশি মেছোবাঘ, বনবিড়াল, বেজি ও বিভিন্ন প্রাজাতির সরীসৃপ রয়েছে। বিশেষ করে বনের গাছপালায় পাখিদের কিচির-মিচির শব্দে মনকে দুলিয়ে তোলে। বনের এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের। একটু নির্মল বাতাশ আর বনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে প্রতিদিনই ছুটে আসছে ভ্রমণ পিপাসুরা।
এলাকার পরিবেশকর্মী বাবলু মণ্ডল জানান, শীত মৌসুমে অতিথি পাখি দেখতে এখানকার বনে শতশত লোক ছুটে আসে। এ বনে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গোলপাতাসহ অনেক মূল্যবান গাছ জন্ম নিয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশটা পুরোপুরি সুন্দরবনে রূপ নিয়েছে। গাছপালা ও পাখি এবং বন্যপ্রাণিদের নিরাপত্তাসহ বনটি সংরক্ষণ করতে পারলে পর্যাটন শিল্পে অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।