
X
পাবনা ভাঙ্গুড়া উপজেলা জুড়ে সরিষার হলুদ ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। ফসলের মাঠের হলুদ রাজ্যে গুঞ্জনে মুখরিত মৌঁমাছির দল। মাঠ জুড়ে সরিষা ফুলের অপরুপ দোলাচালে কৃষকের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি।
শীতের সকালের নরম রোদে উপজেলার মাঠগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। যতদূর চোখযায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। সরিষা ফুলে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠ দেখে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে হলুদের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের ফাঁকে ফাঁকে মৌমাছির গুঞ্জন আর মাঠের আইলে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকদের চোখ-মুখে এক রাশ আশা। এ যেন শুধু ফসলের মাঠ নয়, বরং কৃষকের স্বপ্নের রাজ্য।
এক সময় লাভ না হওয়া ও অব্যাহত লোকসান গুনতে থাকায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা তথা চলনবিল অঞ্চলে সরিষা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ছিলেন চাষিরা। এখন স্বপ্ন দেখছেন বাম্পার ফলনের। গত বছর স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার দাম ভাল পাওয়ায় কৃষকরা এবারও সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে পড়েছে। বিনামূল্যে পাওয়া উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা ফলনে কৃষকের প্রশান্তির হাসি দীর্ঘ হচ্ছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় গত বছরে প্রায় ৬হাজার ৬শ' ৬০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ১১হাজার দুইশ ৭০ মে. টন সরিষা। যা হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ৫১ মে. টন সরিষা উৎপাদন হয়েছিল।
এ বছর কৃষি বিভাগের উদ্যোগে সরিষা চাষে কৃষকেরা দারুণ অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এ বছর ৬হাজার ৭শ'৪০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৬শ ৩০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। নিন্মাঞ্চলের জমিতে এখনো অনেকে এ ফসলের চাষ করছেন। যা লক্ষ্যমাত্রার বেশি চাষ হবে বলে, স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের ধারণা।
এ বছর উপজেলায় সরিষার চাষ বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর সরিষার বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক ও কৃষিবিভাগ। স্থানীয় কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ কালে নির্দেশনা দিয়েছেন,শুধু ধান চাষ করলে হবে না। পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা, আলু, সূর্যমুখী ফুল, পাট, তিল,গবাদি প্রাণীর ঘাসসহ অন্যান্য ফসল চাষের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষকের নিপুন হাতে প্রকৃতির বুকে গড়ে তোলা ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষার তেলের চাহিদা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলনের পাশাপাশি দাম ভালো পাওয়ার আশা কৃষকদের। ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আগামীতে আরও সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চিন্তা-ভাবনা করছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
উপজেলার বিভিন্ন ইউপর সরিষাক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে যেন কেউ সবুজের গায়ে হলুদের আল্পনা দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছে। হলুদ ফুলে ভরে গেছে পুরো মাঠ। মাঠের পর মাঠ যেন হলুদের গালিচা। দিগন্ত জুড়ে শুধু হলুদের সমারোহ। সরিষার ফুলে ফুলে মৌঁমাছিরা মধু আহরণে ব্যস্ত। সরিষা ফুলের হলুদ রাজ্যে মৌঁমাছির গুনগুনানিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা মাঠ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে পৌর এলাকা, ভাঙ্গুড়া, খানমরিচ, দিলপাশার, অষ্টমনিষা, পারভাঙ্গুড়া ও মন্ডতোষ ইউনিয়নে দুই শতাধিক কৃষক ১৫ থেকে ৩০ বিঘা করে জমিতে অধিক ফলনশীল জাতের সরিষা চাষ করেছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বর্মন জানান, এ বছর উপজেলায় বারি-১৪ ও বিনা-১০ জাতের সরিষার চাষ বেশি হয়েছে।
উপজেলার খানমরিচ ইউপির পুকুর পাড় গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম ফকির ও সুলতানপুর গ্রামের কৃষক সুলতান মাহমুদ জানান, প্রতি বিঘা সরিষা চাষে খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। এ ফসলের বাজারে চাহিদা ভালো থাকে এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। বর্তমান সরিষার গাছ, ফুল-ফল ভালো হয়েছে। আশা করছি বাম্পার ফলন হবে। গত বছরের মতো এবারও লাভবান হতে পারব।
উপজেলার দিলপাশার ইউপির আদাবাড়িয়া গ্রামের মৃতঃ রজব আলী খানের ছেলে প্রশিক্ষিত কৃষক সহকারী অধ্যাপক মো.গোলাম হাচনাইন খান, কৃষক সোনাউল্লাহ খান ও পার্শ্ববর্তী চকলক্ষ্মীকোল গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, সরিষার চাহিদা ভালো থাকাতে এবং চাষে ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকাতে প্রতি মৌসুমে আমরা সরিষার চাষ করি। আশা করছি এবারও দাম ভালো পাওয়া যাবে। এ বছর উপযুক্ত দাম পেলে আগামী বছর সরিষা চাষে আরও অনেকেই ঝুঁকে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শারমীন জাহান বলেন, কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় বারি-৮, বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বিনা-৪, বিনা-৯, বীজ সরবরাহ ও বিতরণ করা হয়েছে। বারি-১৪ সহ অন্যান্য জাতের সরিষা বপনের মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। এ সরিষা উত্তোলন করে বোরো আবাদ করতে পারেন বলে কৃষকরা একে ‘লাভের ফসল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। স্থানীয় বাজারে গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা সরিষা চাষে অধিক আগ্রহী হয়েছেন বলে মনে করছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর সরিষার ভালো আবাদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরো জানান, বারি-১৪ সরিষার গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা মাটিতে ঝরে পড়ে জৈব সারের কাজ করায় জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ে। অপরদিকে চলতি মৌসুমে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মধুব্যবসায়ীরা সরিষা ক্ষেতে মৌবক্স স্থাপন করে মধু উৎপাদন করে দেশের মধুর চাহিদা মেটাচ্ছে। এ জাতের সরিষা আবাদের পর ওই জমিতে বোরো আবাদে সারের পরিমাণ কম লাগে। তাই এ জাতের সরিষা চাষের জন্য আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিভিন্ন উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।