
X
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান। এর আগে, গতকাল ২৩ জানুয়ারি ধামরাই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ১২ জানুয়ারি দিবাগত রাতে এ ওই এলাকায় শান্তি মনি দাস নামে এক নারীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এরপর ২২ জানুয়ারি ধামরাই থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ ও মামলা (নম্বর-৪১) করেন ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক।
গ্রেপ্তাররা হলেন- জিয়োস চন্দ্র মনি দাস (৩০), শ্রী চরণ (৫০), সুভন (৩০) ও দিপু চন্দ্র মনি দাস (৪৫)। তারা ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ জানায়, গতকাল রামরাবন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আসামি জিয়োস চন্দ্র মনি দাসের কাছ থেকে ১৫০০ টাকা, শ্রী চরণের কাছ থেকে ২২৫০ টাকা, শুভনের কাছ থেকে ২৩২০ টাকা ও দিপু চন্দ্র মনি দাসের কাছ থেকে ২৫৬০ টাকাসহ মোট ৮,৬৩০ টাকা উদ্ধার করা হয়। তদন্তে তারা এই ঘটনায় জড়িত বলে জানা যায়। এরমধ্যে শ্রী চরণের বিরুদ্ধে ধামরাই থানায় পূর্বের মাদক মামলা রয়েছে।
ছিনতাইকাণ্ডে করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক ধামরাইয়ের নান্দেশ্বরি এলাকায় এনডিই ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের ড্রাম ট্রাক চালক। গত ১২ জানুয়ারি দুপুরের দিকে তার বান্ধবীসহ (৩৫) মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানে বেড়ানোর পর রাত হওয়ায় নিজের ও বান্ধবীর নিরাপত্তার জন্য রাত্রিযাপন করতে তিনি তার সহকর্মী কৃষ্ণ মনি দাসকে ফোন করে দুজনের রাত থাকার ব্যবস্থা করতে বলেন। রাত ৮টার দিকে দুজন কৃষ্ণ মনি দাসের বাড়ি যান। তবে সেখানে থাকার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কৃষ্ণ তাদের তার বোন শান্তি মনি দাসের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেন। রাত ১০টা ১৫'র দিকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাদের দরজায় ধাক্কা দিয়ে দরজাটি খুলতে বলেন। দরজা খুলে দিলে ওই ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ’আপনারা কারা’?। তিনি তাকে ’এই বাড়ির মেহমান’ বলে পরিচয় দিলে ওই ব্যক্তি চলে যান।
রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে ফের অজ্ঞাত ৩-৪ জন ব্যক্তি এসে দরজা খুলতে বলেন ও বলেন, ’দরজা খোলেন, আমরা ডাকাত না’। সরল বিশ্বাসে দরজা খুলে দিলে অজ্ঞাত ৩-৪ জন ব্যক্তি ওই ঘরে ঢুকে তাদের ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। একপর্যায়ে তারা তাকে মারধর করে তার কাছে থাকা একটি ভিভো মোবাইল ফোন, একটি আইটেল বাটন মোবাইল ফোন ও প্রায় ১৪০০ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তার বান্ধবীকে ঘরের বারান্দায় নিয়ে তার কাছে থাকা নগদ ২১ হাজার টাকা, ১২ আনা ৫ রতি ওজনের এক জোড়া কানের দুল, একটি নাক ফুল ও একটি চেইন এবং তার কাছে থাকা একটি ভিভো ফোনসহ দুজনের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল ছিনিয়ে নেয়। এরপর রাত ১টা ৩৫ এর দিকে তারা দ্রুত মালামালসহ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এর পরপরই তিনি দ্রুত সহকর্মী কৃষ্ণ মনি দাসকে বিষয়টি জানালে তিনি ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে এলে বিষয়টি তাদের বিস্তারিত জানান ভুক্তভোগীরা।
এজাহারে তার উল্লেখ, জড়িতদের দেখলে তিনি চিনতে পারবেন। ওই ঘটনার পর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাতে ঘুমিয়ে থাকার সময় তারা দরজায় ধাক্কা দেয়। দরজা খুলে দেওয়ার পরপরই তারা বারান্দার লাইট বন্ধ করে দেয় এবং ঘরের ভেতরে ঢুকে ভেতরের লাইটও বন্ধ করে দেয়। আমি পরে আবার একটি লাইট জ্বালাই। তখন তারা আমার মানিব্যাগে থাকা মোবাইল ফোন ও বেতনের টাকা নিয়ে নেয়। আমার কাছে আনুমানিক ২১ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা ছিল। টাকা-পয়সা নেওয়ার সময় তারা আমাকে মারধর শুরু করে। ভয়ের কারণে আমি বলি যে আমার বান্ধবী আমার স্ত্রী। তখন তারা আমার বান্ধবীকে বলে, “তুই কি তোর স্বামীকে চাস, না এগুলো চাস?” তখন আমার বান্ধবী বলে, “আমি আমার স্বামীকেই চাই।”
এরপর তারা আমার বান্ধবীকে ঘরের বাইরে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বলে, “তোর স্বামীকে যদি চাস, তাহলে এগুলো খুলে দে।” তখন তারা আমার বান্ধবীর নাকফুল, কানের দুল, প্রায় আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন এবং তার ব্যবহৃত ভিভো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেয়।
সবকিছু নিয়ে তারা চলে যাওয়ার পর আমি কৃষ্ণদাসকে ডাকতে যাই। পরে কৃষ্ণদাস এলে তাকে বিস্তারিত জানাই। এরপর আমি ও আমার বান্ধবী কৃষ্ণদাসের বাড়িতে যাই। পরদিন সকালবেলা আমরা যার যার গন্তব্যে চলে যাই।
তবে সেখানে ধর্ষণ ও খুঁটিতে বেঁধে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি। এছাড়া অভিযুক্তরা কোন ধর্মের সেটিও তিনি জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, আমি কাউকেই চিনি না। তবে দেখলে চিনতে পারবো। যেহেতু চিনি না, তারা কোন ধর্মের তাও জানি না।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, রামরাবন এলাকার ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত ও অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।
ছিনতাই কাণ্ডে ধর্ষণ গুজব
১২ জানুয়ারি দিবাগত রাতের ওই ছিনতাইকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ পরে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে হিন্দু বাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক মুসলিম গৃহবধূ।
এই ঘটনায় মূলত দুটি অভিযোগ তোলা হয় সংবাদমাধ্যমে। প্রথমটি, বেড়াতে এসে ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মুসলিম গৃহবধু। আর দ্বিতীয় অভিযোগ, ছিনতাই ও ধর্ষণকারীরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
এই খবর প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। ‘একদল হিন্দু পুরুষ দ্বারা একজন মুসলিম গৃহবধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’- এই বয়ানে অনলাইন এক্টিভিস্টদের অনেকে ঘটনাটিকে নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তবে সংবাদপত্রের ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করা দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওইদিন সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ জানেন না। এমনকি যে নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে তার ‘স্বামী’ বলে পরিচয় দেয়া ব্যক্তিটিও দ্য ডিসেন্টকে বলেন, তার ‘স্ত্রী’ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তার জানা নেই এবং এমন কথা তিনি কাউকে বলেননি। এছাড়া ঘটনার অল্পক্ষণ পরই প্রতিবেশি যারা ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন তাদের কেউও ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটেছে বলে জানেন না। ভুক্তভোগী স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদ্বয়ও তখন তাদেরকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো তথ্য দেননি। এবং তাকে খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার যে তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে তা অস্বীকার করেন আব্দুর রাজ্জাক। স্থানীয়রাও খুঁটিতে বেঁধে মারধরের কোনো ঘটনা শোনেননি বলে সংবাদমাধ্যমটিকে জানান।
দ্য ডিসেন্টকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও (ওসি) ছিনতাইয়ের ঘটনা নিশ্চিত করেন। তবে ধর্ষণের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে তিনি কোনো তথ্য নিশ্চিত করেননি।