ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে প্রথম ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সে সময় ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তাঘাট উন্নত করা হয়। প্রথমদিকে ইংরেজ শাসকরাই ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি এবং পরে সাধারণ মানুষও এই বাহন ব্যবহার শুরু করেন। দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ঘোড়ার গাড়ি।
একসময় গ্রামগঞ্জে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি। ব্রিটিশ আমলে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, মালামাল ও ডাক পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহৃত হতো। ঢাকা-আরিচা সড়কে একসময় ঘোড়ার গাড়িই ছিল প্রধান বাহন। মানিকগঞ্জের শিবালয়ের মহাদেবপুর এলাকার মুখার্জি আগূরী বাবু তখন অর্ধশতাধিক ঘোড়ার গাড়ির মালিক ছিলেন। তার গাড়িতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতায়াত করতেন।
বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বৌকে বাপের বাড়ি নেওয়া-আনা, জামাই-আত্মীয়দের আপ্যায়ন—সবখানেই ছিল ঘোড়ার গাড়ির রাজকীয় উপস্থিতি। সেইসব গল্প আজও বয়স্করা তাদের নাতি-নাতনিদের শোনান। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি এখন যেন শুধুই স্মৃতি।
বর্তমানে রাজধানীর গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চলাচলকারী কিছু টমটম ছাড়া শহরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির দেখা মেলে না। তবে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, ঘিওর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে এখনও সীমিত পরিসরে ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করছে। এসব এলাকায় যাত্রী পরিবহনের চেয়ে মালামাল পরিবহনেই ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
গ্রামাঞ্চল থেকে বড় বড় গাছের গুড়ি স’মিলে আনা-নেওয়া, হাটে ধান ও অন্যান্য শস্য পরিবহন এবং ভারী মালামাল বহনে এখনও ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহৃত হয়। চরাঞ্চলের মেঠোপথে ঘোড়ার গাড়িই অনেক সময় সবচেয়ে কার্যকর বাহন।
ঘোড়ার গাড়ির চালকরা জানান, বর্তমানে এই পেশায় তেমন আয় নেই। ঘোড়া কেনা ও লালন-পালনের ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই পৈতৃক পেশা হিসেবে বাধ্য হয়েই এ কাজে যুক্ত রয়েছেন। খাদ্য সংকট ও আধুনিকতার চাপে ঘোড়া পালনের হারও কমে গেছে।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই বাহন টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা জরুরি। যথাযথ পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঘোড়ার গাড়ি শুধু ঐতিহ্য নয়, পর্যটন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।