বিএ পাস করার পর মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার শিমুলতলা গ্রামের নাজিম উদ্দীন একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রায় চার বছর শিক্ষকতা করার পর হঠাৎ বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তার আয়ের একমাত্র উৎস বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি।
অবশেষে গ্রামের কুলচাষি আব্দুল বাকীর পরামর্শে নাজিম উদ্দীন প্রথমে ১০ কাঠা জমিতে কাশ্মিরী জাতের কুল চাষ শুরু করেন। ফলন ও লাভ ভালো হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি তিন বিঘা জমিতে কুল চাষ সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে তিনি কাশ্মিরী ও বলসুন্দরী জাতের কুল চাষ করছেন এবং নিজেই বাগানের পরিচর্যা করেন। কুল গাছে রোগবালাই তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও কম। বাগান থেকেই ব্যবসায়ীরা কুল সংগ্রহ করেন। প্রতিকেজি কুল ১০০ টাকা দরে বিক্রি করে চলতি মৌসুমে অন্তত সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় করবেন বলে তিনি আশাবাদী।
শুধু নাজিম উদ্দীনই নন, তার মতো এলাকার অনেক শিক্ষিত ও বেকার যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা বিদেশমুখী না হয়ে কুল চাষে ঝুঁকছেন। এতে পরিশ্রম তুলনামূলক কম এবং লাভ বেশি হওয়ায় আগ্রহ বাড়ছে। অনেক চাষি আবার কুলের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে বিভিন্ন সবজি আবাদ করছেন। কুল চাষ সম্পর্কে পরামর্শ নিতে প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যোক্তারা আসছেন এবং উপজেলা কৃষি অফিস থেকেও দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
গাংনী উপজেলার অন্যতম বড় কুলচাষি কসবা গ্রামের বিপ্লব জানান, তিনি বর্তমানে ১২ বিঘা জমিতে কুল চাষ করছেন। শুরুতে তিন বিঘা জমিতে কুল চাষ করে লাভবান হওয়ায় ধীরে ধীরে বাগানের পরিমাণ বাড়িয়েছেন। তিনি কাশ্মিরী, আপেল ও বলসুন্দরী জাতের কুল চাষ করছেন। বিপ্লব বলেন, “খরচ তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু লাভ বেশি। পাখির উপদ্রব থাকলেও কামলা রেখে পাখি তাড়িয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।” তিনি শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের কুল চাষে আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান।
আরেক কুলচাষি মাহাবুব ইসলাম জানান, বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর দেশে ফিরে তিনি তিন বিঘা জমিতে কুল চাষ শুরু করেন। কুল বাগানে সাথি ফসল হিসেবে তিনি বেগুন ও মুলা চাষ করছেন এবং মাঝে মাঝে লিচু গাছও রোপণ করেছেন। এতে এক খরচেই তিন ধরনের ফসল উৎপাদন করে ভালো লাভ করছেন তিনি। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকার কুল বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি একই জমি থেকে লক্ষাধিক টাকার সবজিও বিক্রি করেছেন।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, বর্তমানে উপজেলায় ২৬৫ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হচ্ছে। তিনি বলেন, “কুল চাষে রোগবালাই অত্যন্ত কম এবং অল্প খরচে বেশি লাভ হওয়ায় দিন দিন চাষির সংখ্যা বাড়ছে। এ উপজেলায় বিভিন্ন জাতের কুল আবাদ হলেও কাশ্মিরী ও বলসুন্দরী জাতের কুল চাষ বেশি হচ্ছে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে কুল চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি গাংনী উপজেলার শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য একটি টেকসই কর্মসংস্থানের বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে।