
X
নেত্রকোনার নারী জাগরণ ও সমাজ উন্নয়ন আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক বেগম রোকেয়া আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তিনি শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সময় দুপুর ২ টা ৪০ মিনিটে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন।
স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার পাল তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বেগম রোকেয়ার ইন্তেকালে নেত্রকোনাসহ দেশজুড়ে সমাজ উন্নয়নকর্মী, নারী নেত্রী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়ন সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আজীবন মানবকল্যাণে নিবেদিত জীবন
বেগম রোকেয়া আজীবন সমাজের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, মানবিকতা ও আত্মনিবেদিত কর্মপ্রয়াস স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতিকে একটি সুদৃঢ় ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। তাঁর অবদান কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সমাজ উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
প্রায় চার দশক ধরে তিনি আত্মিক, অর্থনৈতিক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার একটি সংগতিপূর্ণ সমাজ গঠনে নেত্রকোনাকে নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করেছেন। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বারবার বদলেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেছেন এবং শিক্ষা, মানবমুক্তি ও নারী জাগরণের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষিত সমাজ গঠন ও নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
স্বাবলম্বীর জন্ম ও বিকাশ
১৯৮৬ সালে তিনি বেসরকারি সংস্থা স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির বিকাশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে পুরোপুরি নিবেদিত করতে তিনি ১৯৯০ সালে শিক্ষিকার চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। শিল্পকারখানাবিহীন নেত্রকোনায় স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে কর্মসংস্থানের এক বড় ভরসা। তাঁর নেতৃত্বে শত শত তরুণ-তরুণী এই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন, আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছেন এবং জীবনের দিশা খুঁজে পেয়েছেন।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেগম রোকেয়ার ব্যক্তিত্বের মূল শক্তি ছিল তাঁর স্নেহ ও মাতৃত্ব। সেই বিশাল হৃদয়ের আশ্রয়ে নেত্রকোনার অসংখ্য তরুণ-তরুণী বেড়ে উঠেছেন, সমৃদ্ধ হয়েছেন জ্ঞান ও মানবিকতায়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, স্থানীয় প্রয়োগ
কর্মসূত্রে তিনি সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, কেনিয়া, ব্রাজিল, ভারত, চীন, নেপাল, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জীবনধারা ও মন-মানসিকতা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা তিনি স্বাবলম্বীর কার্যক্রমে প্রয়োগ করে একটি বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছিলেন।
শোক ও শ্রদ্ধা
বেগম রোকেয়ার মৃত্যুতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, বেগম রোকেয়া ছিলেন সমাজ পরিবর্তনের এক আলোকবর্তিকা–যাঁর কর্ম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
নেত্রকোনার নারী জাগরণ ও মানবিক সমাজ নির্মাণে বেগম রোকেয়ার অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।