
দিনাজপুর-৫ (ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম—চা-স্টলের আড্ডা থেকে শুরু করে বাজার-ঘাট সর্বত্র চলছে ভোটের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এবার ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কোন দল সরকার গঠন করার সম্ভাবনা রাখে—এমন ধারণা। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সেই দিকেই ঝুঁকছেন অধিকাংশ ভোটার।
এদিকে ভোটারদের সমর্থন পেতে দিন-রাত বাড়ি বাড়ি ছুটছেন প্রার্থীরা। দলীয় ইশতেহারের পাশাপাশি দিচ্ছেন স্থানীয় উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি।
এ আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি ও জোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান জামান। শাপলা কুঁড়ি প্রতীকে ১০দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপি নেতা ডা. আব্দুল আহাদ। লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী পার্বতীপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কাজী আব্দুল গফুর। মটরসাইকেল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রভাষক রোস্তম আলী এবং হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হযরত আলী বেলাল।
এছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে তালা প্রতীকে ভোটে লড়ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক এবং কলস প্রতীকে পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য এস এম জাকারিয়া বাচ্চু। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিএনপি তাদের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করলেও ভোটের মাঠে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাও আলোচনায় রয়েছেন।
এদিকে দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক অবস্থান। অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রচারণার কেন্দ্রে ব্যক্তির চেয়ে দলীয় মার্কা ও নীতিগত অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের প্রচারে, পোস্টার, ব্যানার ও সমাবেশে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয়ের তুলনায় দলীয় প্রতীক, ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু এবং দলীয় প্রধানদের প্রতিশ্রুতিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভোটারদের মধ্যে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে সামনে রেখে তাদের কেন্দ্রীয় বার্তা নির্ধারণ করেছে। ফলে প্রচারণায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বদলে দলীয় সিদ্ধান্ত, অতীত কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই তুলে ধরা হচ্ছে।
নির্বাচনী এলাকায় দেখা যাচ্ছে, পোস্টারে প্রার্থীর ছবি তুলনামূলক ছোট হলেও দলীয় মার্কা ও স্লোগান বড় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। দলীয় নেতারা বলছেন, এই প্রবণতা ভোটারদের দলভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে। তাদের মতে, ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতি বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, আর মার্কা ও নীতিনির্ভর প্রচারণা ভোটারদের নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। এ কারণে তরুণ ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ডিজিটাল সেবার মতো বিষয়গুলো প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলীয় প্রার্থীরা জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে দলীয় কর্মসূচি ও প্রতীককে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এতে একদিকে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, অন্যদিকে বার্তা পৌঁছানোও সহজ হচ্ছে।
তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা ও স্থানীয় সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা জানার অধিকার ভোটারদের আছে। শুধুমাত্র মার্কাকেন্দ্রিক প্রচারণায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে বলেও তারা মনে করেন।
ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ খুরশিদ আলম মতি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সরকার গঠিত হয়, তাই দলীয় প্রতীকই বেশি গুরুত্ব পায়। তার মতে, সারা দেশে বিএনপির যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব এ আসনেও পড়বে এবং ধানের শীষের জয় সহজ হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ফুলবাড়ী শাখার আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান জানান, তারা জোট প্রার্থী এনসিপির ডা. আব্দুল আহাদকে নিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন। একইভাবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এ জেড এম রেজওয়ানুল হকসহ অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও জনগণের সমর্থন নিয়ে জয়ের আশা প্রকাশ করেছেন।
দিনাজপুর-৫ আসনটি দুই উপজেলায় দুটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার ৪ লাখ ৭১ হাজার ২২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩০ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৮৭ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন। এর মধ্যে ফুলবাড়ী উপজেলায় একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নে মোট ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ২১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৭৭ হাজার ৮৯৬ জন, মহিলা ৭৮ হাজার ৬১৩ জন এবং হিজড়া ১ জন। পার্বতীপুর উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৪ জন, মহিলা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ জন এবং হিজড়া ২ জন।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিকভাবে পার্বতীপুর উপজেলা বড় হলেও ভৌগোলিক কারণে ফুলবাড়ী এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বেশি। পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর, হরিরামপুর ও মোস্তফাপুর ইউনিয়ন ফুলবাড়ী শহরের নিকটবর্তী হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যোগাযোগ ও কেনাকাটা ফুলবাড়ীকেন্দ্রিক। ফলে রাজনৈতিক যোগাযোগও তুলনামূলকভাবে ফুলবাড়ীমুখী।
এ কারণেই অতীতের জাতীয় নির্বাচনে বারবার ফুলবাড়ী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার নজির রয়েছে। এবারের নির্বাচনে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে কেবল বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানের বাড়ি ফুলবাড়ীতে। বাকি ছয়জন প্রার্থী পার্বতীপুর উপজেলার বাসিন্দা, এছাড়া দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি।
সব মিলিয়ে দিনাজপুর-৫ আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যক্তি নয়, দলীয় মার্কার প্রাধান্য একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে। এই ধারা ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলে, তা জানতে অপেক্ষা এখন শুধু নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।