
X
সংগৃহীত ছবি
অশ্রু, ফুল আর নীরব প্রার্থনার ছায়ায় ঢাকা এক শোকাবহ সকালে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নেত্রকোনার নারী জাগরণের অগ্রপথিক, স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সমাজ বদলের সাহসী কণ্ঠ বেগম রোকেয়া (মস্তুরা) (৭৯)।
স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে যিনি সারাজীবন হেঁটেছেন অবহেলিত মানুষের পাশে–তাঁর বিদায়ে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় নেত্রকোনা জেলা সদরের সাতপাই পৌর কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। মায়ের পাশে শেষ আশ্রয় নেওয়ার মধ্য দিয়েই যেন জীবনের বৃত্তটি সম্পূর্ণ হলো–যে মা তাঁকে জন্ম দিয়েছিলেন, সেই মায়ের সান্নিধ্যেই তিনি ফিরে গেলেন চিরনিদ্রায়।
ভোরের আলো ফুটতেই তাঁর মরদেহ আনা হয় স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির কার্যালয়ে। সকাল ৭টায় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সহকর্মী, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী–কারও চোখে অশ্রু, কারও হাতে ফুল, কারও হৃদয়ে নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতা। কারণ তিনি ছিলেন কেবল একজন সংগঠক নন, ছিলেন আশ্রয় ও অনুপ্রেরণার নাম।
সকাল ৮টায় মরদেহ নেওয়া হয় জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সেখানে শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে যায় তাঁর কফিন। নাগরিক সমাজ, উদীচী, সিপিবি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একে একে জানায় শেষ শ্রদ্ধা। শহিদ মিনার তখন শুধু স্মৃতির স্তম্ভ নয়, হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞ মানুষের নীরব সাক্ষ্য।
এরপর সকাল ৯টায় চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-তরুণ–সবাই যেন একজন মানুষকে নয়, একটি যুগকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন। জানাজার সারিতে দাঁড়িয়ে অনেকের চোখ ভিজে উঠেছিল নিঃশব্দে।
স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার পাল জানান, পৌর শহরের নিখিলনাথ সড়কের বাসিন্দা বেগম রোকেয়া গত ৩০ জানুয়ারি সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি দুই কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৪৭ সালের ১৩ মার্চ নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কাউরাট গ্রামে জন্ম বেগম রোকেয়ার। সামাজিক রক্ষণশীলতার দেয়াল ভেঙে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালেই তাঁর বিয়ে হলেও জীবন তাঁকে দেয় কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। দুই কন্যার জননী হয়ে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং দুঃখকে শক্তিতে রূপ দিয়ে আবার পড়াশোনায় ফিরে যান। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজের নির্যাতিত, অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কিছু করার অদম্য বাসনা থেকেই ১৯৮৬ সালে তিনি গড়ে তোলেন স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি। তাঁর নেতৃত্বে এই সংস্থা বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে হাজারো নারীকে দিয়েছে স্বপ্ন দেখার সাহস ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি।
তিনি পিকেএসএফ, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এবং গ্রামীণ ইলেক্ট্রিফিকেশন বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নারী অধিকার আন্দোলনে রেখেছেন দৃঢ় পদচিহ্ন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নারীসমাজের কাছে বেগম রোকেয়া ছিলেন কেবল একজন সংগঠক নন–তিনি ছিলেন ভরসার নাম, সাহসের ভাষা, স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। তাঁর প্রয়াণে একটি জীবন থেমে গেলেও থেমে যায়নি তাঁর দেখানো পথ। স্বপ্ন বুনে যাওয়া এই নারীর স্মৃতি হয়ে থাকবে সংগ্রাম, ভালোবাসা আর মানবিকতার বাতিঘর। স্বাবলম্বিতার যে প্রদীপ তিনি জ্বালিয়ে গেছেন, তা আলো ছড়াবেই। নারী জাগরণ ও মানবিক উন্নয়নের পথে তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত, গণমাধ্যমকর্মী