
X
ফাইল ছবি
নওগাঁর রাণীনগরে কৃষি অফিসের মাঝে মাঝে অভিযানেও থামছে না সার সিন্ডিকেট, কমছে না দাম। তাই কঠোর পদক্ষেপের অভাবে সার ব্যবসায়ীরা বাড়তি দাম নেওয়া থেকে পিছপা হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষি কার্ড দিয়েও মিলছেনা রাসায়নিক সার। অভিযোগ কৃষি কার্ড নিয়ে গেলেও সার দিচ্ছেনা সংশ্লিষ্ট ডিলার। তবে বেশি দাম দিলেই মিলছে রাসায়নিক সার। আর সাধারণ কৃষক তো ডিলারের কাছে যেতেই পারছেনা। বিভিন্ন অজুহাতে ঘুরে দেওয়া হচ্ছে।
এমনই ভয়াবহ অভিযোগ পাওয়া গেছে উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের কৃষকদের কাছ থেকে।
আর এভাবেই চলছে খাদ্য উদ্বৃত্ত কৃষি প্রধান জেলা নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় ব্যবসায়ীদের সার সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য। ইরি-বোরো কিংবা আমন এই দুই মৌসুম এলেই শুরু হয় সারের অবৈধ মজুদ করে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কৃষকের পকেট কাটতে ব্যস্ত হয়ে যায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
এ উপজেলায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তা প্রতি আড়াই’শ থেকে তিন’শ টাকা অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে রাসায়নিক সার।
কৃষক, স্থানীয় সচেতন ব্যক্তির অভিযোগ, ডিলাররা সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন এবং বেশি লাভের আশায় সিন্ডিকেট তৈরি করছেন। এছাড়া খুচরা দোকানে বেশি দামে সার বিক্রি তো ওপেন সিক্রেট। কৃষি অফিসের জোরালো পদক্ষেপের অভাবে তারা এমন করার সাহস পাচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি খরচের কবলে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।
কাশিমপুর ইউনিয়ন এলাকার এক কৃষকের আছে কৃষি কার্ড। এই কার্ড নিয়ে সে রয়েছে বিপাকে। কোথাও গিয়ে পায়নি এক বস্তা সার। প্রতিকার পাওয়ার আশায় জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক ব্যক্তির কাছে গেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তাই অভিযোগের সুরে জানালানে, এই কৃষি কার্ড থেকে তাহলে লাভটা কি হলো? এই কার্ড পছন্দের নাকি অপছন্দের? এক বস্তাও সার পাবো না-প্রশ্নের সুরে তিনি বলেন, গত বছরও পাইনি, এবারও পেলাম না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি এক ডিলারের কাছে গিয়েছিলাম। মুখের উপর বলে দিলো কোনো সার নেই। এই কার্ডের নাকি কোনো মূল্য নেই তার কাছে। তার কাছে সার নাই জানিয়ে এক বস্তাও দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে বাজারের এক দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। চায়না ডিএপি ১৬০০টাকা আর বিএডিসির ডিএপি ১৩৫০ থেকে ১৩৭০ টাকায় কিনতে হয়েছে। আর কোনো দিন কারো কাছে যাবনা অভিমানের সুরে তিনি বলেন, আমি প্রতি বছর গম, শরিষা আলু করি। এছাড়া প্রতি বছর প্রায় ১৩-১৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করি। তবে নিজের জমি নেই। কিস্তিতে টাকা তুলে জমা নিয়ে এসব করি। তাই সারগুলো বাঁকি নিই। মোটামুটি ৩০বস্তা সার লাগে।
একই এলাকার আরেক কৃষক বলেন, এক বস্তা সার হলে আমার ধানই উঠে যাবে। দুই বস্তুা করে টিএসপি ও পটাশ কিনেছি। ডিএপি ১৩৫০ টাকা ধরেছে বাজারের ওই দোকানদার। এবং চায়না ডিএপি ১৬০০ টাকা।
ওই দুই কৃষকের মতো আরেক কৃষক বলেন, ডিলাররা সিন্ডিকেট করছে। আমাদের মতো কৃষকদের কাছে বিক্রি না করে ব্ল্যাকে বিক্রি করছে সার। আমিও সরকারি এক ডিলারের কাছে ৫বার গিয়েও সার পাইনি। আমার সার কেনা লাগলেও ওই ডিলারের কাছে আর যাবোনা ক্ষোভের সহিত বলেন তিনি।
তিনি জানালেন, আমি প্রায় ২০ বিঘা জমি চাষ করছি। ডিলারের কাছে গত পরশুও গিয়েছিলাম। বারবার বলেছে তার কাছে বাংলাদেশী কোনো ডিএপি সার নেই। অথচ বাজারের আনাচে কানাচে বেশি দাম দিলেই মিলছে সার। পরে বাধ্য হয়ে তার কাছ থেকেই চায়না সার নিতে হয়েছে ১৫০০ টাকায়। আর বিএডিসির ডিএপি সার ১৩৫০-১৩৮০ টাকা নিচ্ছে বাজারের অন্য সব দোকানদার। তবে তারা কেউ মেমো দিচ্ছেনা।
আরেক কৃষক জানালেন, এক রকম সার দেওয়ার কথা বলে আরেকটা দিতে চায়, তাই রশিদ কেটেও চলে এসেছি ডিলারের কাছ থেকে। পরে বাহির থেকে ডিএপি কিনতে হয়েছে ১৩৫০ টাকায়।
তারা সকলেই একমত হয়ে বলেন, সারের কোনো অভাব নেই, এটা তাদের সিন্ডিকেট।
এদিকে কীটনাশক কোম্পানির চাকরি করেন এক যুবক। চাকরির সুবাদে উপজেলার প্রতিটি বিসিআইসি, বিএডিসিসহ খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে যেতে হয় তার। সারের দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা জুড়ে পুরো সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছে সারের ডিলাররা। তাদের কারণেই বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি। কৃত্তিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বৃদ্ধি করছে। যার কারণে কৃষককে ২৫০-৩০০টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
রাণীনগর উপজেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাত্তার শাহ ক্ষিপ্ত হয়ে মুঠোফোনে বলেন, আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজিনা। তোমার যা ইচ্ছে তাই লেখো। তোমার যতো লেখার থাকে তুমি লেখো। একসময় হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, তুমি রাণীনগর আসো, তারপর দেখছি।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, এরকম করার কোনো সুযোগ নেই। কৃষক আসবে আর সার পাবে না এরকম হবার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া আমার কাছে বারবার জানতে হবে কেন? কৃষি অফিসারের কাছে জিজ্ঞেস করেন।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি অফিসার মোস্তাকিমা খাতুন মুঠোফোনে বলেন, কারা এসব করছে, সেটা নির্দিষ্ট করে বললে আমরা ব্যবস্থা নিবো।