
X
কেউ বলেন, তিন গম্বুজ মসজিদ, লাল মসজিদ, জোড়া মসজিদ, আবার কারো কাছে জ্বীনের মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। বলছি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজী খাজা শাহবাজ খান মসজিদের কথা। বাংলা একাডেমি ও হাইকোর্টের মাঝামাঝি এলাকায় হালকা লাল রঙা তিনটি গম্বুজ নিয়ে ৩৪৬ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে হযরত হাজী খাজা শাহবাজ রহ. মসজিদ ও মাজার কমপ্লেক্স। ঐতিহাসিক ঢাকা গেট পেরিয়ে জাতীয় তিন নেতার মাজারের পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে আছে রমনা এলাকার প্রথম স্থাপনা, অনুপম নিদর্শন, সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।
মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে (১০৮৯ হিজরি), মোগল সুবাহদার শাহজাদা মুহম্মদ আজমের শাসনামলে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ঢাকার একজন অভিজাত ধনী ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট সুফি সাধক হাজী খাজা শাহবাজ, যিনি কাশ্মির থেকে সুবা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে তিনি জীবিত থাকাকালেই এই মসজিদ এবং নিজের সমাধি নির্মাণ করেন।
অনেকেই মনে করেন, শাহবাজের মসজিদটিই রমনা এলাকার প্রথম স্থাপনা। বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লাগোয়া এই মসজিদের কাছেই ঢাকাগেট, যার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল মসজিদ নির্মাণের ২০০ বছর পর।
উত্তর ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে গড়ে ওঠা এই মসজিদ বহন করছে মোগল আমলের স্মৃতি। শিল্পী বেঁচে না থাকলেও শিল্পের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে শত শত বছর আগের এই মসজিদ। দৈর্ঘ্যে মসজিদটি ৬৮ ফুট ও প্রস্থে ২৬ ফুট। এতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। একমাত্র এই তিনটি গম্বুজ ছাড়া মসজিদটির আর কোনো স্থাপত্যশৈলী এখন আর টিকে নেই।
এই আয়তাকার মসজিদটির অভ্যন্তরভাগ দুটি প্রশস্ত বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান দ্বারা তিনটি সমান বর্গাকার অংশে বিভক্ত এবং প্রতিটি অংশের উপরে একটি করে মোট তিনটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলি পদ্ম ও কলস চূড়া দ্বারা সজ্জিত। পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে, যার কেন্দ্রীয় মিহরাবটি বড়। মিম্বর ও চৌকাঠ কালো পাথরের তৈরি। আড়াআড়িভাবে স্থাপিত খিলানগুলোর ভার বহনের জন্য জোড়া-স্তম্ভের ব্যবহার এই মসজিদকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে, যা উত্তর ভারতের মোগল রীতির অনুকরণ।
মসজিদ চত্বরের উত্তর-পূর্ব কোণেই রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা হাজী খাজা শাহবাজের সমাধিসৌধ। এই সমাধিসৌধটি ’মাজার‘ বা ’দরগা‘ নামে পরিচিত। সমাধিসৌধটিও দেখতে অনেকটা মসজিদের মতোই।
বর্তমানে ঢাকায় যত মোগল মসজিদ আছে তাদের মধ্যে সংরক্ষণের দিক থেকে খান শাহাবাজ মসজিদ সম্ভবত সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে সামনের তিন নেতার মাজার মসজিদের সৌন্দর্য অনেকটাই আড়াল করে ফেলেছে, সামনের দিক থেকে বোঝাই যায় না পিছনে কোনো স্থাপত্য রয়েছে।
প্রায় ৩৪০ বছর ধরে শেখ শরিয়ত গোষ্ঠী বংশপরম্পরায় এই মসজিদ ও মাজার কমপ্লেক্সের সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করে আসছে। মোগল আমল থেকেই এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
এটি শত শত বছরের ইতিহাস ও স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত দলিল। ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন নিদর্শনটি মোগল স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী।