
X
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে বড় চমক দেখিয়েছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, সংগঠনিক শক্তি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বহু পরিচিত মুখ এবার জয়মাল্য গলায় তুলতে পারেননি। ফলে রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে নতুন বার্তা।
খুলনা অঞ্চলে বড় ধাক্কা খেয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৮। ১৫১টি কেন্দ্রের এ আসনে হিন্দু ভোটারদের বড় অংশ এবং আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। খুলনা-২ আসনে বিএনপির সাবেক নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং খুলনা-১ আসনে জামায়াতের আলোচিত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীও হেরেছেন।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট পেয়ে ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে বিএনপির মো. নাছির চৌধুরী পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। জামায়াতের মোহাম্মদ শিশির মনির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬—দুই আসনেই পরাজিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম। বরিশাল-৫-এ বিএনপির অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট, সেখানে ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। বরিশাল-৬-এ বিএনপির আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট, আর ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মাত্র ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। এখানে বিএনপির মীর শাহে আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট এবং জামায়াতের মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট।
পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ ভোট। তবে বিএনপির নওশাদ জমির ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ ভোট পেয়ে ৮ হাজার ৩০৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট; বিএনপির মির্জা আব্বাস পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট; বিএনপির হাবিবুর রশিদ পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট।
ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৮৫১ ভোট; বিএনপির ববি হাজ্জাজ পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৯৪ ভোট। ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত রাশেদ খান পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট এবং তৃতীয় হয়েছেন। এখানে জামায়াতের আবু তালিব ১ লাখ ৪ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।
ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৭ ভোট; জামায়াতের আব্দুল বাতেন পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৮২৮ ভোট। রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট। এখানে জামায়াতের মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল) ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি-সমর্থিত সাইফুল হককে হারিয়ে জামায়াতের সাইফুল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ হারুন ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট পেলেও জামায়াতের নুরুল ইসলাম বুলবুল পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩ ভোট।
নরসিংদী-২ আসনে বিএনপির আবদুল মঈন খান পেয়েছেন ৯২ হাজার ৩৫২ ভোট। জামায়াতের মো. আমজাদ হোসাইন পেয়েছেন ৫৫ হাজার ১৬৮ ভোট এবং এনসিপির গোলাম সারোয়ার তুষার পেয়েছেন ১৯ হাজার ২৩৬ ভোট।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত বহু নেতা পরাজিত হয়েছেন। ভোটাররা যে নতুন সমীকরণ ও ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন—তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ফলাফলের চিত্রে।