
X
শৈশবে পন্ডিত মশায়ের কাছে শিখেছিলাম, বাংলা ভাষার প্রকারভেদ দুটো- সাধু রূপ ও চলিত রূপ। ভাষার এই প্রকারভেদের আলোকে প্রথমত আলোচনা করা যেতে পারে। পরবর্তীতে ভাষার প্রায়োগিক রূপ নিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে।
‘বর্ষার সন্ধ্যায় আকাশের অন্ধকার যেন ভিজিয়া ভারী হইয়া পড়িয়াছে। বর্ণহীন বৈচিত্রহীন মেঘের নিঃশব্দ শাসনের নিচে কলিকাতা শহর একটা প্রকান্ড নিরানন্দ কুকুরের মত লেজের মধ্যে মুখ গুঁজিয়া কুণ্ডলি পাকাইয়া চুপ করিয়া পড়িয়া আছে।’
উপরের এই উদ্ধৃতিটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “গোরা”উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে। এটি সাধু ভাষার একটি সঠিক রূপ। উদ্ধৃতিটির বিশ্লেষন করলে বাংলা ভাষার মৌলিক ব্যাকরণগত উপাদান সমূহের প্রয়োগ আমরা দেখতে পাবো। একথা বলা মূলত অত্যুক্তি হবে না যে, সাধু ভাষার এই রূপ প্রকৃত বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত নেই । বস্তুতঃ কোলকাতার বাবুরা বাংলা ভাষার সাধুরূপের কিয়দাংশ বজায় রাখতে স্বচেষ্ট হলেও, শব্দগত অনেক বিকৃত রূপ প্রকাশ পায়। কোলকাতাবাসীদের মুখে তাই আজও আমরা শুনতে পাই-
‘নারায়ণ কহিল, ধম্ম-কম্ম বুঝিনা ।’
এখানে বলিল-এর জায়গায় ‘কহিল’ এবং ধর্ম-কর্ম জায়গায় ‘ধম্ম-কম্ম’ ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার হরিদাসদের মুখে শোনা যায়-
‘রাজধানীতে গিয়েছিলুম ।’
এখানে গিয়েছিলাম-এর জায়গায় ‘গিয়েছিলুম’ ব্যবহৃত হয়েছে।
অনুতাপের বিষয় বাংলা ভাষার মৌলিকত্ব পুরোপুরি কোথাও প্রচলিত নেই। আমাদের দেশে বাংলা ভাষায় চলিত রূপটিই অক্ষুণ আছে। বলা বাহুল্য, চলিত রূপটির দ্বারাই আমাদের কৃষ্টির মানদন্ড বিচার করা হয়।
‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভেতর যে আকাশ- পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকরা নিজে খেলা না করে পরের জন্য খেলনা তৈরী করতে বসেন।‘
উল্লেখিত উদ্ধৃতিটি সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর “সাহিত্যে খেলা”প্রবন্ধ থেকে নেয়া হয়েছে, এখানে আমরা চলতি রূপের প্রয়োগিক রূপ দেখতে পাচ্ছি। মূলতঃ চলিত ভাষার প্রয়োগ শুধুমাত্র বর্তমান সাহিত্যেই অথবা ক্ষেত্রবিশেষে শহরের কৃষ্টিতে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করছে। বর্তমানে চলিতভাষার যে রূপ তাকে আর বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গরূপ বলা চলে না। কারণ আমাদের প্রচলিত ভাষার অভ্যন্তরে অন্যান্য অনেক ভাষার প্রতিশব্দগুলোর অনুপ্রবেশ হওয়াতে আমরা মুল বাংলা ভাষা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। যেমন-
• Sunrise Pre-cadet এ ভর্তি চলছে।
• প্রাথীকে অবশ্যই সুদর্শন ও Smart হতে হবে।
• Show room-এর জন্য যোগাযোগ করুন।
উপরের এই তিনটি বাক্যের মধ্যে প্রথম বাক্যে আমরা দেখতে পাই Sunrise Pre-cadet দ্বিতীয় বাক্যে Smart এবং তৃতীয় বাক্যে Show room এই তিনটি ইংরেজী শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাক্য তিনটি এই আধুনিক যুগে আজ আমাদের কাছে স্বাভাবিক। সচরাচর এই বাক্যগুলি তথা এমন অজস্র বাক্য আমরা মুখে বলছি অথবা রাস্তাঘাটে অহরহ দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টির একটু গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখতে পাব, উল্লেখিত বাক্য তিনটি আর বাংলা ভাষার কোন রূপ বজায় রাখতে পারেনি, হয়ে গেছে সংমিশ্রিত ভাষা। তাহলে দৃশতঃ বিষয়টা দাঁড়াল আমরা একটি সংমিশ্রিত ভাষাকে আমাদের ভাষার চলিত রূপ হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছি। এখন যদি আমরা বাক্য তিনটিকে বিপরীত ভাবে সাজাই তাহলে কি দাঁড়াবে -
• ভর্তি is going on Sunrise Pre-cadet.
• প্রার্থী will be handsome & smart.
• যোগাযোগ for show room.
এই তিনটি বাক্য কি আমরা ইংরেজী কোন গ্রন্থে দেখতে পাব ? বাক্য তিনটি কি শুদ্ধ ? ইংরেজ জাতি কি এগুলো মেনে নেবেন ? সবগুলো প্রশ্নেরই উত্তর আসবে নেতিবাচক। কিন্তু আমরা আমাদের নেতিবাচককে মেনে নিলাম কোন যুক্তিকে ? এ জিজ্ঞাসা কর্তাব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে। ডাঃ হুমায়ুন আজাদ ‘বাংলা ভাষার শত্রু মিত্র’গ্রন্থে এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। চলিত ভাষার এই রূপে, শুদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ বাংলা ভাষার কোন রূপ নেই, সে স্থান দখল করে নিয়েছে এক অবাঞ্চিত সংমিশ্রিত ভাষা। পন্ডিত মশাই ভাষার যে প্রকারভেদ করেছিলেন, সেই শ্রেণীবিভাগে ভাষার আর একটি রূপ সংযোজন করা যেতে পারে- তাহলো আঞ্চলিক রূপ। একজন মনীষীর উক্তি প্রাসঙ্গিকভাবে না বলে পারছি না। তিনি বলেছিলেন, প্রতি দশ কিলোমিটার অন্তর মানুষের ভাষা পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিচার করলে আমরা তাই দেখতে পাই। প্রতিটি অঞ্চল ভেদে ভাষা পরিবর্তিত হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলের ভাষার সাথে ঢাকা অঞ্চলের ভাষার যেমন কোন সাদৃশ্য নেই তেমনি চট্টগ্রামের সাথে খুলনার বৈসাদৃশ্য বিদ্যামন। এমন কি ঢাকার অদূরে নরসিংদীর ভাষার সাথেও ঢাকার ভাষার কোন নিরঙ্কুশ সাদৃশ্য নেই। অথচ সব অঞ্চলগুলোই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, আঞ্চালিক ভাষাতেও বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বক্তব্যটিকে যথার্থ ও যুক্তিনির্ভর করার প্রয়াসে এবারে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার দৃষ্টান্ত বিশ্লেষণ করে বিষয়টাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।
চট্টগ্রামের জনৈক মোহসীন মিয়া তার আঞ্চলিক ভাষায় বলেন,
‘তুই এত্ক্কন আইসো দে? তোর লাই আই বসতে বসতে আই তারপরে বাজার গিয়ে। তুই আসছো দে আরে আস্তাতে ন দেখ? তুই এককিনি বইনি আই এক্কিনি গোছল করি আই।‘
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
তুমি এতক্ষণে এসেছ? তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করে তারপর বাজার চলে গেলাম। তুমি আসার সময় আমাকে রাস্তাতে দেখ নাই? একটু অপেক্ষা করো আমি গোসলটা সেরে আসি।
নোয়াখালীর জনৈক শাজাহান মিয়া তার আঞ্চলিক ভাষায় বলেন,
'তাহের সাব বাইত নাই, হের হোর বাড়িতে গেছে। হের হোর বড্ডা বড়লোক, কত্ত জাগা জমির মালিক হে নিজেও কইতে পারবো না। হোর তো হারাদিন রাজনীতি করে, গ্রামের মাইনসে হেরে কয় বড্ডা রাজনীতিবিদ। গ্রামের্ত্যে তার বহুত নাম ডাক, হগগলে হেরে মান্য করি চলে।‘
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
তাহের সাহেব এখন বাড়িতে নেই, তার শ্বশুর বাড়িতে গেছে। তার শ্বশুর বিরাট বড়লোক, কত জায়গা-জমির মালিক সে নিজেও বলতে পারবে না। তার শ্বশুর সারাদিন রাজনীতি করে, গ্রামের মানুষ তাকে বড় রাজনীতিবিদ মনে করে। গ্রামে তার বহু নাম-ডাক, সকলে তাকে মান্য করে চলে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনৈক তাপস খন্দকারের ভাষায়,
'এই বেডারা দাশটারে শ্যাষ কইরা ফালাইব। দ্যাশ নিয়ে মাতা খারাপ কেল্লাইগা করে আমরা লাভ হতি কোনডাই বুঝি না। হামাকা হারাদিন আকামের ফেছাল নিয়া হুদু হুদু আমগাছ তলাডারে পেরেস কেলাবের মত বানাইলা।‘
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
এই লোকগুলো দেশটা শেষ করে ফেলেবে। দেশ নিয়ে মাথা খারাপ কি জন্য করে আমরা লাভ ক্ষতি কোনটাই বুঝি না। শুধু শুধু সারাদিন অপ্রয়োজনীয় কথা বলে আমগাছের তলাটাকে প্রেসক্লাব বানিয়ে ফেলছে।
কিশোরগঞ্জের জনৈক মসলেহ উদীনের ভাষায়,
'বাজন কইছে তুমি অকনে বাইত যাইতা। বাজান বাজারতে আমার লাইগ্যা একটা গিলাফ আইনা দিও। নানা, মার শইল ভালা না, তুমারে কইছে তাড়াতাড়ি যাইতা। দাদা, আমারে কয়ডা টেহা দাও, মিষ্টি খাইতাম। এই ব্যাডা কেমনে কাম করছ ? কাম ভালা না অইলে টেহা দিতাম না।'
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
বাবা বলেছেন, তোমাকে এখনি বাড়িতে যেতে। বাবা, আমার জন্য বাজার থেকে একটা চাদর এনে দিয়ো। নানা, মার শরীর ভাল না, তোমাকে তাড়াতাড়ি যেতে বলেছেন। দাদা, আমাকে কিছু টাকা দিন, মিষ্টি খাব। এই ছেলে কিভাবে কাজ করছো ? কাজ ভাল না হলে টাকা দেব না।
রংপুরের জনৈক কছিমুদ্দিনের ভাষায়,
‘মোর নাম কছিমুদ্দি, মোর বাড়ি অমপুর। চাইর বছর আগত ঢাকাত.আসছো, এটে আসি মোর কপাল ফাটছে। বাড়িত থাকাত যাও একনা খাবার পাইছিনু, এটে আসি তাও জোটে না। যত টাউট বাটপারের আড্ডা এই শহরত। সবাই দু’নাম্বার ধান্ধাত আন্ধা, কাম কাজ দেখি মুই ফিরি যাবার লাগছে।‘
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
আমার নাম কছিম উদ্দিন, আমার বাড়ি রংপুরে। চার বছর আগে আমি ঢাকায় এসেছি, এখানে এসে আমার কপাল ফেটেছে। বাড়িতে থকতে যাও কিছু খেতে পেতাম, এখানে এসে তাও জোটে না। যত টাউট বাটপারের আড্ডা এই শহরে। সবাই দু'নম্বরে কাজে ব্যস্ত, কাজ কর্ম দেখে আমি ফিরে যাচ্ছি।
ঢাকার জনৈক বাসিন্দার ভাষায়,
‘চেয়ারম্যান ভাববার লাগছে, মাগার আমারে ভোট না দিয়া যাইবা কই চান্দুরা ? আমি অইলাম গিয়া এই এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয়। এলাকার উন্নয়নের লাইগা জীবনডারে হুকনা পাতার নাহাল উড়াইবার লাগছি। তোমাগো চোখ দুইডা কি আন্ধা ? দেখবার পাওনা আমার কাজ কাম কেমন টগবগ টগবগ করতাছে? আমি বুঝবার পারছি তোমরা আমারেই ভোট দিবা।‘
ভাষাটির চলিত রূপ দাঁড়ায়-
চেয়ারম্যান ভাবছে, আমাকে ভোট না দিয়ে সবাই যাবে কোথায় ? আমি হলাম গিয়ে এই এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয়। এলাকার উন্নয়নের জন্য জীবনটাকে শুকনা পাতার মতো উড়িয়ে যাচ্ছি । তোমাদের চোখ কি অন্ধ ? দেখতে পাও না, আমার কাজ কর্ম কেমন টগবগ করছে ? আমি বুঝতে পারছি, তোমরা আমাকেই ভোট দেবে ।
আমরা এতক্ষণ বাংলা ভাষার প্রচলিত তিনটি রূপ নিয়ে আলোচনা করলাম। আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি- উল্লেখিত তিনটি রূপের মধ্যে সাধুরূপের প্রচলন বা ব্যবহারিক প্রক্রিয়া কোলকাতার বাবুরা কিয়দাংশ বজায় রাখতে স্বচেষ্ট হলেও, তাতে অনেক বিকৃত রূপ প্রকাশ পায়। অন্যদিকে, চলিত রূপের ব্যবহার যদিও প্রচলিত আছে, কিন্তু তা ভাষার স্বকীয় সত্তা বজায় রাখতে পারছে না। বিভিন্ন ভাষার প্রভাব তথা বিদেশী শব্দের অনুপ্রবেশে তার রূপ হয়েছে সংমিশ্রিত। তাছাড়া যে আঞ্চলিক রূপের উল্লেখ করলাম, সেটাতেই বাংলা ভাষার কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বক্তব্যটিকে সংক্ষিপ্ত করলে বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে এই যে, আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা আজ আর আমাদের ভাষা ও কৃষ্টিতে অবস্থান করছে না, আমাদের জাতির জন্য বিষয়টা খুবই লজ্জাজনক। অথচ আমরা ঐতিহাসিকভাবে ভাষা আন্দোলন করেছিলাম, এ দেশের হাজার হাজার ভাষা শহীদেরা রক্ত ঝড়িয়েছেন ভাষার জন্য। তাদের মূল্যবান ঋণ বহন করে তাদের কতটুকু প্রাপ্য পূরণ করব তা বিচার্য বিষয় হলেও, এটাই সর্বশেষ কথা নয়। আমাদের দায়িত্ববোধ কি শুধুই তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ? শহীদ দিবস এলেই আমরা দায়ভার দায়িত্ব পালন করি- প্রভাত ফেরী, মিনারে পুষ্পস্তবক অথবা স্বরণীয় একটি কবিতা। এটাই কি আমাদের করণীয় ? এ জিজ্ঞাসা সকলের প্রতি রইল।