প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:০১ পিএম (ভিজিট : ৩৬)

X
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি কক্ষটি বুধবার যেন পরিণত হয়েছিল অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়ে। জীবনের নানা সংকট, অভাব আর অনিশ্চয়তার গল্প নিয়ে একে একে হাজির হন ভুক্তভোগীরা। মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শোনেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কারও চোখে দুশ্চিন্তা, কারও কণ্ঠে দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট—সবার প্রত্যাশা একটাই, কেউ যেন পাশে দাঁড়ান।
নগরের হালিশহর থানার বড়পোল এলাকার হাফেজ মোহাম্মদ আবুল হোসাইন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি ও রমজানে খতম তারাবির নামাজ পড়িয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। পাশাপাশি একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। হঠাৎ মাদ্রাসার চাকরি চলে যাওয়ায় সেই স্বপ্নে ধস নামে। চরম আর্থিক সংকটে পড়ে একমাত্র ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফি ও টেস্ট পেপার কেনার সামর্থ্যও হারান।
গণশুনানিতে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরলে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন। কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আবুল হোসাইনের কণ্ঠে ছিল স্বস্তি—এত ব্যস্ততার মাঝেও স্যার আমার কথা শুনেছেন। মনে হয়েছে, আমরা একা নই।
লোহাগাড়া থানার উত্তর কলাউজান গ্রামের মো. ইছহাক দুর্ঘটনায় বাম হাত হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারান। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁর বৃদ্ধা মা জটিল রোগে ভুগছেন। অর্থাভাবে চিকিৎসা শুরু করাও সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ ভরসা হিসেবে গণশুনানিতে এসে সহায়তা পান তিনি। ইছহাক বলেন, ডিসি স্যার আমার কষ্ট বুঝেছেন। এখন অন্তত মায়ের চিকিৎসা করাতে পারব।
নগরের কোতোয়ালী থানার আশকারদিঘীরপাড় এলাকার সীমা দে স্বামীহারা। তাঁর ছেলে সিদ্ধার্থ দে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। দুই মেয়ে স্কুলে পড়াশোনা করছে, আর প্রতিবন্ধী সন্তানের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার কারণে নিয়মিত কাজও করতে পারছেন না তিনি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আর্থিক সহায়তা পেয়ে সীমা দে বলেন, এই সাহায্য আমার সন্তানের চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে।
এছাড়া রাউজান উপজেলার পবন বড়ুয়া জটিল লিভার সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা ব্যয় বহনে অক্ষম হয়ে পড়েন। গণশুনানিতে আবেদন জানালে তাঁর প্রতিও মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকারি তহবিল সীমিত। তবে মানুষের অসহায় গল্প শুনলে চুপ করে থাকা যায় না। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। চাহিদার তুলনায় সহায়তা কম হলেও সরকার যে মানুষের পাশে আছে—সে বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই। এই গণশুনানি তাই কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।