একুশের চেতনা: আত্মপরিচয়ের দীপ্ত শপথ

খোন্দকার শাহিদুল হক

ফিচার

মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মূল ভিত্তি।মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখার

2026-02-20T15:26:47+00:00
2026-02-20T15:26:47+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
একুশের চেতনা: আত্মপরিচয়ের দীপ্ত শপথ
খোন্দকার শাহিদুল হক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:২৬ পিএম   (ভিজিট : ৩০৬)
X

মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মূল ভিত্তি। 

মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য ভাষা শহীদদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। 

এই দিনটি শুধু শোকের নয়, গৌরবের, আত্মসম্মানের এবং জাতীয় চেতনার এক অনন্য প্রতীক।

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস বিশ্ব দরবারে মর্যাদা লাভ করে। ফলে দিবসটি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক আন্তর্জাতিক উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম অর্জন:
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলার বাঙালিরা নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সেই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঢাকার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। তারা দাবি তোলে—বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা। এই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার নির্বিচারে গুলি চালায়। শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে।
এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথম শিখে প্রতিবাদ করতে, শিখে অধিকার আদায় করতে, শিখে বুকের রক্ত দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সাহস অর্জন করতে।

একুশের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা:
ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবি ছিল না; এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম সোপান। একুশের চেতনাই পরবর্তীতে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হয়ে ওঠে।
একুশ আমাদের শিখিয়েছে—নিজের পরিচয় রক্ষার জন্য মাথা নত করা যাবে না। ভাষার জন্য যে জাতি জীবন দিতে পারে, সে জাতি স্বাধীনতার জন্যও লড়তে পারে। তাই একুশের পথ ধরেই আমরা অর্জন করেছি মহান স্বাধীনতা।

একুশের বইমেলা: সংস্কৃতির জীবন্ত স্পন্দন:
একুশের চেতনাকে আরও সম্মানিত ও বিস্তৃত করেছে অমর একুশে বইমেলা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে বইমেলা আজ বাঙালির সংস্কৃতির এক বিশাল মিলনমেলা। এটি শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়; এটি ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও জাতিসত্তার এক জীবন্ত প্রতীক।
প্রতি ফেব্রুয়ারিতে বইমেলার মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন নতুন করে জেগে ওঠে। ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম এখানে পরিণত হয় জ্ঞানের আন্দোলনে।

নতুন ষড়যন্ত্র ও একুশের চেতনার প্রাসঙ্গিকতা:

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাঙালির আত্মপরিচয় বারবার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। একুশের চেতনা, মহান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস—সবকিছু কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা থেমে নেই।
সম্প্রতি ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ আবারও জাতিকে ত্যাগ ও সংগ্রামের নতুন স্বপ্ন দেখালেও ভেতরে ভেতরে চলে আত্মপরিচয় মুছে দেওয়ার নতুন চক্রান্ত। তবে বাঙালি জাতি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে জানে। যেমন একুশে মাথা নত করেনি, তেমনি এবারও ফেব্রুয়ারিতে বাঙালি সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। কারণ একুশের চেতনা কখনো মরে না—এটি বেঁচে থাকে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।

উপসংহার:
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে শুধু একটি দিবস নয়, এটি একটি চেতনার নাম। এটি আত্মত্যাগের নাম, প্রতিবাদের নাম, আত্মপরিচয়ের নাম। ভাষা শহীদদের রক্তে লেখা এই ইতিহাস আজ বিশ্ব দরবারে সম্মানিত।
আমাদের কর্তব্য হলো এই চেতনাকে ধারণ করা, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা, শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস জানানো।

একুশ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা বাঁচলে জাতি বাঁচবে, আত্মপরিচয় বাঁচবে, স্বাধীনতা বাঁচবে।





Loading...
Loading...


ফিচার এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy