
X
প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে জীবনসংগ্রামে এগিয়ে চলা মানুষের গল্প সবসময়ই অনুপ্রেরণার। তেমনি এক দৃষ্টান্ত মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাওট গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আকরামুল ইসলাম। দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও থেমে যাননি তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আকরামুল সবার ছোট। মাত্র তিন বছর বয়সে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। শৈশবে দু’চোখের আলো নিভে গেলেও জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাজ মনোযোগ দিয়ে শেখেন। সেই শেখা হাতের কাজই আজ তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
বর্তমানে বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করেন আকরামুল। ঝুড়ি তৈরির পাশাপাশি তিনি গাছে উঠে নারকেল পাড়েন, পুকুরে নেমে মাছ ধরেন এবং সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজও নিজ হাতে সম্পন্ন করেন। এমনকি নিজেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনেন।
আকরামুলের মা ছানোয়ারা খাতুন জানান, ছোটবেলায় হামজ্বর ও তীব্র পেটব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তার চোখের সমস্যা শুরু হয়। পরে সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। বাবার কাছ থেকেই হাতেকলমে কাজ শেখেন আকরামুল। বর্তমানে চার সদস্যের সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপরই। তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
বড় ভাই আনারুল ইসলাম বলেন, “আকরামুল ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। চোখে না দেখলেও স্বাভাবিক মানুষের মতোই সব কাজ করতে পারে। একটু দেখিয়ে দিলেই দ্রুত শিখে নেয়। তবে সংসারের ব্যয়ভার বহন করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি জানান, প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া অন্য কোনো সরকারি সহায়তা এখনো পাননি আকরামুল।
স্ত্রী শাহারবানু বলেন, “অন্ধ মানুষকে বিয়ে করলেও এখন তাকে নিয়ে গর্ব হয়। সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। একটি ঝুপড়ি ঘরে আমাদের বসবাস। সরকার যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করত, তাহলে পরিবারটি স্থায়ী আশ্রয় পেত।”
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরশাদ আলী বলেন, আকরামুলের বিষয়টি তার জানা আছে এবং তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ভিক্ষাবৃত্তি বা অনৈতিক পথে না গিয়ে আকরামুল যেভাবে আত্মসম্মান বজায় রেখে কাজ করছেন, তা প্রশংসনীয়।”
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি দেখবেন এবং আকরামুলের জন্য সম্ভাব্য সহযোগিতা প্রদান করবেন।
অন্ধত্ব তাকে থামাতে পারেনি দম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমেই জীবনের লড়াইয়ে এগিয়ে চলেছেন আকরামুল ইসলাম। তার এই সংগ্রামী জীবন নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।