
X
পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলা (স্বরূপকাঠী) আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ নার্সারি সমৃদ্ধ উপজেলা হিসেবে পরিচিত।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় দুই হাজারের মতো নার্সারি গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষ। বছরে এখানে প্রায় ১০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা ।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পৌর শহরের পার্শ্ববর্তী উত্তর শর্ষিনা, অলংকারকাঠী ও কৃষ্ণকাঠী গ্রামের অংশজুড়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়কের দুই ধারে গড়ে উঠেছে বিশাল নার্সারি পল্লী। যদিও তিনটি গ্রামের সমন্বয়ে এই পল্লী বিস্তৃত, তবুও এটি এখন “অলংকারকাঠী নার্সারি” নামেই সারাদেশে অধিক পরিচিত।
অলংকারকাঠী নার্সারি পল্লী এখন সারা দেশের চারা সরবরাহের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র। অলংকারকারী বেইলি ব্রিজ থেকে উত্তর শর্ষিনা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে শতাধিক নার্সারিতে ফুল ও ফলের চারা উৎপাদন ও বেচাকেনা জমজমাট। প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার ফুল, ফল ও বনজ চারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প, ঠিকাদারি কাজ এবং ব্যক্তিগত বাগান তৈরির জন্য এখান থেকে ব্যাপক হারে চারা সংগ্রহ করা হয়।
যেভাবে শুরু:
২০০২ সালে অলংকারকারী বেইলি ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে কৃষ্ণকাঠী গ্রামের এক খণ্ড জমিতে মো. শাহাদাৎ হোসেন প্রতিষ্ঠা করেন ‘বৈশাখী নার্সারি’। পরবর্তীতে জাহিদুল ইসলাম পলাশ গড়ে তোলেন ‘ছারছীনা নার্সারি’ এবং একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তৌহিদের আশা নার্সারি’। ধীরে ধীরে ওই সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠে বিয়াদ নার্সারি, কহিনুর নার্সারি, আশা নার্সারি, নিরব নার্সারি, রুবেল নার্সারি, নেছারাবাদ নার্সারি, আদর্শ নার্সারি, ফারিয়া নার্সারি, নেছারিয়া নার্সারিসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।
ফুলের সমারোহে রঙিন গ্রাম
পিরোজপুরের নেছারাবাদ সড়ক ধরে বরিশালের দিকে যেতে অলংকারকারী বেইলি ব্রিজ পার হলেই চোখে পড়ে সারি সারি হলুদ, লাল, কমলা ও সাদা রঙের ফুলের সমাহার। বিশেষ করে শীত মৌসুমে বিক্রি হয় প্রধানত ফুলের চারা। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি ফুল চাষের মূল সময়, আর অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত থাকে ভরা মৌসুম।
এখানে গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, জিনিয়া, সালভিয়া, ডেইজি, গ্যাজোনিয়া, স্নোবলসহ বহু প্রজাতির ফুলের চারা পাওয়া যায়। উন্নতজাতের নাইট কুইনসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রজাতিও রয়েছে। চারার দাম মান ও প্রজাতিভেদে ২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।
ফলজ ও বনজ চারায় সমৃদ্ধ নেছারাবাদের নার্সারিগুলো দেশীয় ও বিদেশি নানা জাতের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন করে। দেশি আমের ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, হিমসাগর, হাড়িভাঙ্গাসহ বিভিন্ন জাতের পাশাপাশি বিদেশি আম, বারোমাসি আম, হাইব্রিড নারিকেল, অ্যাভোকাডো, মিসরীয় ডুমুর, মালবেরি, ব্ল্যাকবেরি, চেরি প্রভৃতি গাছের চারা এখানে সহজলভ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বৃক্ষমেলায় নেছারাবাদের চারার চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র:
প্রতিটি নার্সারিতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। নারী-পুরুষ উভয়েই এ কাজে যুক্ত। নারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৫০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকদের ৬০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। অনেক নার্সারিতে স্থায়ী কর্মচারীও রয়েছেন।
নার্সারি মালিকদের মতে, এক একর জমিতে ফুলের চারা উৎপাদন করে সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা আয় সম্ভব। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজতলা, চারা প্রতিস্থাপন, পরিচর্যা ও বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মালিকদের নিজস্ব বিনিয়োগ থাকে।
সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র:
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, যদিও নার্সারিতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা নেই, তবে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং সহজশর্তে ঋণের সুপারিশ করা হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় এই নার্সারি পল্লীকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
সব মিলিয়ে নেছারাবাদ আজ শুধু একটি উপজেলা নয়, বরং ফুল-ফলের চারায় গড়া এক সম্ভাবনার নাম। দেশের সবুজায়ন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এগিয়ে চলেছে এই নার্সারি জনপদ।