প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ৫:৩৯ পিএম (ভিজিট : ৩৮৬)

X
শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘানিশিল্প
কালের বিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘানিশিল্প। একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গরু দিয়ে চালিত কাঠের ঘানির মাধ্যমে সরিষা ভেঙে খাঁটি তেল তৈরির দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রনির্ভর কারখানা ও সস্তা ভোজ্য তেলের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প বিলুপ্তির পথে।
দুই দশক আগেও দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে গরুর ঘানি দিয়ে সরিষা, তিল ও ভেরেন্ডা থেকে তেল উৎপাদন করা হতো। এই ঘানির মালিকরা ‘ঘানি’ বা ‘শাহাজী’ নামে পরিচিত ছিলেন। গরুর চোখ বেঁধে কাঠের ঘানির চারপাশে ঘুরিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরিষা মাড়াই করা হতো। ঘানির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর সরিষার ঝাঁঝালো গন্ধে মুখর থাকত গ্রামের পরিবেশ। ফোঁটা ফোঁটা করে বের হওয়া সেই তেল ছিল স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ।
গ্রামের মহিলারা সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘানিতে সরিষা দিয়ে যেতেন। অন্যদিকে পুরুষরা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সরিষা সংগ্রহ ও তেল বিক্রি করতেন। সরিষা ভাঙানোর পর যে খৈল পাওয়া যেত, তা গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে এই শিল্পটি ছিল গ্রামীণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় এই পেশার মানুষের বসবাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ধীতপুর ইউনিয়নের অনেক গ্রামেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঘানি দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নানা প্রতিকূলতার কারণে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
ঘানিতে তেল প্রস্তুতকারী দুলাল (৫০) বলেন, “বাপ-দাদারা এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বলা যায় পৈত্রিক সূত্রে আমি এই পেশা পেয়েছি। তাদের আয়েই আমাদের বড় করা হয়েছে। এখনো এই পেশা ধরে রেখে সংসার চালানোর চেষ্টা করছি। তবে ভালো সরিষা পাওয়া যায় না, দামও বেশি। ফলে আগের মতো লাভ নেই।”
জানা যায়, ঘানি তৈরিতে শক্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে গরুকে জোয়ালে বেঁধে ঘানির চারপাশে ঘোরানো হয়। জোয়ালের গোড়ায় ভারী পাথর থাকায় ঘানির ভেতরে চাপ সৃষ্টি হয় এবং সেই চাপে সরিষা থেকে তেল বের হয়ে পাত্রে জমা হয়। তবে বর্তমানে বৈদ্যুতিক মোটরচালিত লোহার ঘানি ও আধুনিক তেল কারখানার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় বিয়ে, ঈদ, আকিকা, পূজা-পার্বণসহ নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঘানির সরিষার তেল ছিল অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে মেশিনে তৈরি তেলের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে মানুষ সেই দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
উপজেলার সচেতন মহল মনে করছেন, গ্রাম বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে একসময় ইতিহাসের পাতায় স্থান নেবে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘানিশিল্প।