
X
বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা
একসময় ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার গ্রামবাংলার আকাশ-বাতাসে ছিল বাবুই পাখির কিচিরমিচির ডাক। তাল, খেজুর ও নারকেল গাছের ডালে ঝুলে থাকা তাদের নিপুণ হাতে বোনা বাসা যেন ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব শিল্পকর্ম।
গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে গেলে দূর থেকেই চোখে পড়ত ঝুলন্ত সেই বাসাগুলো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই পরিচিত দৃশ্য ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
কালের বিবর্তনে ভালুকার গ্রামগুলো থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র শিল্পী—বাবুই পাখি।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে সেই দিনগুলোর কথা।
তারা জানান, একসময় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অসংখ্য তাল ও খেজুর গাছে বাবুই পাখির সারি সারি বাসা দেখা যেত। বাতাসে দুলতে থাকা সেই বাসা আর পাখিদের ব্যস্ত উড়াউড়ি গ্রামীণ পরিবেশকে করে তুলত প্রাণবন্ত। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে শোনা যেত বাবুই পাখির সুরেলা ডাক, যা যেন গ্রামবাংলার এক স্বাভাবিক সঙ্গীত ছিল।
কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্য খুবই বিরল। দ্রুত নগরায়ন, নির্বিচারে গাছপালা কাটা এবং পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে বাবুই পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থল ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেখানে একসময় উঁচু তাল, খেজুর ও নারকেল গাছ ছিল বাবুই পাখির নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে এখন গড়ে উঠছে বসতবাড়ি, কারখানা কিংবা অন্যান্য স্থাপনা।
ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে এলাকায় গাছপালা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে বাবুই পাখি পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে তাদের বংশবৃদ্ধিতেও।
উপজেলার এক প্রবীণ বাসিন্দা শাহাব উদ্দিন মাষ্টার আক্ষেপ করে বলেন, “ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের গ্রামের তালগাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা ঝুলে থাকত। বাতাসে দুলতে থাকা সেই বাসা দেখতে খুব ভালো লাগত। এখন অনেক বছর হয়ে গেল, তেমন দৃশ্য আর চোখে পড়ে না।”
পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছে, বাবুই পাখির হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি আমাদের গ্রামীণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও একটি অশনিসংকেত। কারণ বাবুই পাখি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রামাঞ্চলে আবারও তাল, খেজুর ও নারকেল গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে অযথা গাছ কাটা বন্ধ করা এবং পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, ঐতিহ্য আর প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাবুই পাখি আজ যেন নীরবে বিদায় নিচ্ছে। এখনই যদি প্রকৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বাবুই পাখির নিপুণ বোনা বাসা শুধু গল্প কিংবা বইয়ের পাতায় দেখবে—বাস্তবের গ্রামবাংলায় আর নয়।