
X
রেলওয়ে স্টেশনে মানুষের ঢল
যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে নাড়ির টানে মেঠোপথের ঘ্রাণ নিতে শুরু হয়েছে এক পশলা ছুটাছুটি। সামনেই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর, আর এই উৎসবকে ঘিরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারগুলোতে এখন বইছে প্রিয়জনের কাছে ফেরার এক অন্যরকম জোয়ার।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে তিল ধারণের ঠাঁই নেই অবস্থা। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে হাজারো মানুষের পদচারণা আর ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা। ট্রেনের একেকটি হুইসেল যেন অপেক্ষারত যাত্রীদের কানে বেজে উঠছে শেকড়ের ডাক হয়ে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে রাত নামলেও স্টেশনের এই চিরচেনা কোলাহল থামবার কোনো লক্ষণ নেই।
ট্রেন একের পর এক স্টেশনে আসছে আর যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে, তবুও স্টেশনে জমা হওয়া মানুষের ভিড় যেন কোনোভাবেই কমছে না। প্রতিটি ট্রেনের দরজায়, জানালায় এবং এমনকি বগির ভেতরেও মানুষের উপচে পড়া ভিড় বলে দিচ্ছিল, প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আকুতি কতটা তীব্র।
সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং সড়কপথের যানজট এড়াতে সিংহভাগ মানুষই এবার রেলভ্রমণের দিকে ঝুঁকেছেন। একদিকে ট্রেনের সাশ্রয়ী ভাড়া আর অন্যদিকে যানজটমুক্ত যাত্রার প্রত্যাশা—এই দুই মিলিয়েই রেলওয়ে স্টেশনে জমা হয়েছে হাজারো মানুষ।
স্টেশনের প্রতিটি ইঞ্চি যেন মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে। ঘরমুখো মানুষের রেলযাত্রা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এরই অংশ হিসেবে গত রোববার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের সার্বিক কার্যক্রম ও প্রস্তুতি সরজমিন পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, যাত্রী বিশ্রামাগার এবং ট্রেনের কারিগরি সক্ষমতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শন শেষে মহাব্যবস্থাপক উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলাতে এবং যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে বদ্ধপরিকর। তিনি টিকিট কালোবাজারি রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ট্রেনের শিডিউল বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। যাত্রীদের সুবিধার্থে স্টেশনে পর্যাপ্ত আলো, বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশনা প্রদান করেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার বাংলাদেশ বুলেটিনকে জানান, গতকাল সোমবার থেকেই চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে একটি ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালু হয়েছে। এছাড়া প্রবাল, সৈকতসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনে যাত্রী চাপ কমাতে দুই থেকে তিনটি বাড়তি বগি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে এবারের ঈদে যাত্রীরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে কেবল রেলওয়ে স্টেশন নয়, একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে নগরীর বাস কাউন্টারগুলোতেও। অলঙ্কার, এ কে খান ও দামপাড়া এলাকার প্রতিটি কাউন্টারেই ছিল টিকিটপ্রত্যাশী ও যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। তপ্ত রোদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি থাকলেও সবার চোখে-মুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। একজন যাত্রী হাসিমুখে বলছিলেন যে, সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি আর শহরের একঘেয়েমি দূর হয়ে যায় যখন বাড়ির উঠোনে পা রাখা যায়। তাই পথের এই অসহনীয় ভিড় কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা যেন কোনোভাবেই তাদের আনন্দকে ম্লান করতে পারছে না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যাত্রীর এই প্রবল চাপের মুখে হিমশিম খেতে হলেও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন সবাইকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। দিন-রাত এক করে চলছে ট্রেনের চাকা আর বাসের ইঞ্জিন, তবুও মানুষের এই জনসমুদ্রের কাছে তা যেন অনেক সময়ই অপ্রতুল মনে হচ্ছে। তবুও সব কষ্ট আর ভোগান্তি উপেক্ষা করে দিনশেষে এই ভিড় কেবল যাত্রীদের নয়, বরং এটি হাজারো স্বপ্নের ঘরে ফেরার এক মহামিছিল। যান্ত্রিক শহর ছেড়ে সবাই ছুটছে সেই চিরচেনা গ্রাম্য মমতা আর মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ নিতে। সব বাধা আর ক্লান্তি পেরিয়ে সবাই যেন সুস্থভাবে আপনজনদের কাছে পৌঁছাতে পারে, স্টেশনে অপেক্ষারত প্রতিটি মানুষের চোখে এখন কেবল সেই প্রার্থনাই ফুটে উঠছে।