দীর্ঘ ৬ বছরের প্রতীক্ষা, আইনি জটিলতা আর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখল বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত ‘গোমা সেতু’। আজ ১৭ই মার্চ (মঙ্গলবার) বেলা ১২ ঘটিক আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
ফলক উন্মোচন করে সেতুর উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এমপি। এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, এমপি , পটুয়াখালী ০১ আসনের সংসদ সদস্য এয়ার ভাইস মার্শাল অবঃ) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এমপি, এবং স্থানীয় (বাকেরগঞ্জ) সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খান, এমপি, বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুমানা আফরোজ বাকেরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান মিজান মিয়া, পৌর বিএনপির সভাপতি নাসিরউদ্দিন জোমাদ্দার, সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাহাবুদ্দিন তালুকদার শাহিন, কবাই বিএনপির সভাপতি মোঃ কামরুল হাসান রুবেল, উপজেলা বিএনপির সদস্য এইচ এম সোহাগ প্রমূখ।
বরিশাল-লক্ষ্মীপাশা-দুমকি আঞ্চলিক সড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই সেতুর কিছু বিশেষ দিক হলো: দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬০ মিটার (২,৫৪০ ফুট)। এটি একটি দুই লেনের প্রশস্ত সেতু, যা ভারী যান চলাচলের উপযোগী করে নির্মিত।
বিশেষ প্রযুক্তি: মাঝের ৪ ও ৫ নম্বর পিলারে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক 'স্টিল ট্রাস্ট স্প্যান' (Steel Truss Span) প্রযুক্তি। ফলে সাধারণ স্প্যানের চেয়ে এটি ৯.১৪ মিটার বেশি উঁচু, যা বড় জাহাজ চলাচলে সহায়ক।
নির্মাণ ব্যয়: ২০১৭ সালে শুরুতে প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৫৭ কোটি টাকা থাকলেও নকশা পরিবর্তন ও স্টিল স্প্যান যুক্ত হওয়ায় সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
পেছনের ইতিহাস: ২০১৮ সালের মে মাসে এম খান গ্রুপের মাধ্যমে এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তবে ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ এবং সওজ-এর মধ্যে সেতুর উচ্চতা নিয়ে তৈরি হয় আইনি জটিলতা। বিআইডব্লিউটিএ-র দাবি ছিল, রাঙামাটি নদী দ্বিতীয় শ্রেণির নৌপথ হওয়ায় সেতুর উচ্চতা ১২.২০ মিটার হতে হবে। এই উচ্চতা সংকটে প্রায় দুই বছর কাজ বন্ধ থাকে, যা স্থানীয় মানুষের মাঝে চরম ভোগান্তি তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে একনেক সভায় সংশোধিত নকশা অনুমোদনের পর কাজে পুনরায় গতি ফেরে।
আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব ও গণমানুষের উচ্ছ্বাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, "গোমা সেতু কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্ন। এই সেতুটি চালুর ফলে বাকেরগঞ্জ, দুমকি ও পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি যন্ত্রণার অবসান ঘটল।"
সেতুটি চালু হওয়ায় এখন থেকে মুমূর্ষু রোগী পরিবহন এবং স্থানীয় কৃষিপণ্য সরাসরি বরিশাল বা ঢাকায় পৌঁছানো সহজ হবে। উদ্বোধনের খবরে দুই তীরের চরাদি ও দুধল ইউনিয়নের মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা। আজ ফিতা কাটার মধ্য দিয়ে খুলে গেল দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের এক নতুন দুয়ার।